
ভারতের প্রথম ডাক পরিষেবা শুরু হয় কলকাতা জিপিও-র হাত ধরে
রবি ঠাকুরের ‘শিশু’ কাব্যগ্রন্থের ‘ব্যাকুল’ কবিতাটা মনে পড়ে? মায়ের উদাসীন ভাব দেখে ছোট্ট ছেলেটা প্রশ্ন করে, “আজকে বুঝি পাসনি বাবার চিঠি”? টেলিফোন, ইন্টারনেট পূর্ববর্তী যুগে প্রবাসী প্রিয়জনের খবর পাওয়ার অন্যতম মাধ্যম ছিল চিঠি। কাগজের গায়ে আবেগ মাখানো অক্ষর ঘরে ঘরে পৌঁছে দিত সুখ দুঃখের খবর, আর খবর পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পালন আজও পালন করে চলেছে যে সরকারি দপ্তর আজ সে আড়াইশো বছরের মহীরুহ। ইন্টারনেট শাসিত দুনিয়ায় যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হিসাবে না থাকলেও আড়াইশো বছর ধরে ভারতীয় ডাক ব্যবস্থা ভারতের ঐতিহ্য। চিঠি এখনও অগণিত মানুষের অনুভূতির সাক্ষী।
পূর্ব মেদিনীপুরের খেজুরিতে গড়ে উঠেছিল দেশের প্রথম ডাকঘর
আড়াইশো বছরের ঐতিহ্যকে সর্বসাধারণের কাছে তুলে ধরতে ডাক বিভাগের পক্ষ থেকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। প্রর্দশনী, হেরিটেজ ওয়াকের পাশাপাশি আড়াইশো বছরের ঐতিহ্যপূর্ণ এই অনুষ্ঠানের শরিক করা হচ্ছে কলকাতার আরেক ঐতিহ্য ট্রামকে।
ভারতের প্রথম ডাক পরিষেবা শুরু হয় ১৭৭৪ সালের ৩১ মার্চ ওয়ারেন হেস্টিংসের সময়কালে কলকাতা জিপিও (Kolkata GPO)-র হাত ধরে। যদিও তখনকার জিপিও বলতে আজকের বিশালাকৃতি সাদা গম্বুজওয়ালা বাড়িটির চিত্র পাওয়া যাবে না। কলকাতার অফিসপাড়ায় সেই সময় ছিল ব্রিটিশদের পুরোনো কেল্লা ফোর্ট উইলিয়াম। সেখানেই প্রথম সরকারি ভাবে জেনারেল পোস্ট অফিসের কাজ শুরু হয়। এরপর বহুবার ঠিকানা বদল হয়েছে এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের। ১৮৬৮ সালের ২ অক্টোবর থেকে লালদীঘির পাড়ের সাদা বাড়িটি থেকে শুরু হয় জেনারেল পোস্ট অফিসের কাজ। তারপর থেকে আজও এই বাড়ি থেকেই ডাক ব্যবস্থার বিশাল কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। তবে শুরুর দিকে কলকাতা থেকে ওড়িশার গঞ্জাম, পাটনা, কলকাতা থেকে দিনাজপুর ও রাজমহল হয়ে ঢাকা এবং পাটনা থেকে বারানসী পর্যন্ত এই চারটি শাখায় চিঠিপত্র আদানপ্রদান হত কলকাতার জিপিও থেকে। পরে ধাপে ধাপে গোটা দেশে চিঠিপত্র দেওয়া নেওয়া শুরু হয়। গ্রিক স্থাপত্য রীতিতে নির্মিত এই ভবনের নকশা তৈরি করেছিলেন ওয়াল্টার.বি.গ্রেনভিল।
সর্বসাধারণের ব্যবহার্য ডাক ব্যবস্থার বয়স আড়াইশো বছর হলেও ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় ভারতে ডাক ব্যবস্থা শুরু হয়েছিল আরও আগে। তবে তা ছিল শুধুই সরকারি কাজকর্মের জন্য। পূর্ব মেদিনীপুরের খেজুরিতে তখন গড়ে উঠেছিল বন্দর, ওই বন্দর এলাকাতেই সরকারি কাজকর্মের জন্য গড়ে উঠেছিল ভারতের প্রথম ডাকঘর।
কলকাতার যোগাযোগ ভবনে আলো করে আছেন কিংবদন্তি ভারতীয়রা
আন্তর্জাল নির্ভর এই দুনিয়ায় পোস্ট অফিসের গুরুত্ব কতখানি? এই প্রসঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ সার্কেলের পোস্টমাস্টার জেনারেল নীরজ কুমার বঙ্গদর্শন.কম-কে জানালেন, “সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমের পরিবর্তন হলেও ডাক পরিষেবা আজও প্রাসঙ্গিক। সরকারি চিঠিপত্র আদান প্রদানের ক্ষেত্রে আজও প্রধান ভরসা ভারতীয় ডাক পরিষেবা। এছাড়াও পোস্ট অফিসের ব্যাঙ্কিং পরিষেবার মাধ্যমেও অনেক মানুষ উপকৃত হচ্ছেন। এমনকি বয়স্কদের জন্য Doorstep pension delivery-র ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।” তিনি আরও বলেন “যোগাযোগ মানুষের অধিকার। এই অধিকারকে ভারতীয় ডাক ব্যবস্থা আড়াইশো বছর ধরে সুনিশ্চিত করে চলেছে। স্বল্পমূল্যের ডাক টিকিটের বিনিময়ে আজও অনেক মানুষ চিঠি পাঠান। এখনও পোস্টকার্ডে চিঠি লেখেন অনেকে।” তাঁর কথায়, “গঙ্গার তীরবর্তী দুই শহরে দুটি প্রাচীন বটগাছ আছে। একটি হাওড়ার শিবপুরে বোট্যানিকাল গার্ডেনে, অন্যটি কলকাতায় লালদীঘির পাড়ে সাদা জিপিও। যার ছায়ায় শুধু ডাককর্মীদের নয়, ভবনটির পাশে খাম, আঠা প্রভৃতি বিক্রি করা ছোটো ব্যবসায়ীদের পরিবারও প্রতিপালিত হচ্ছে।”
আড়াইশো বছরের ঐতিহ্যকে সর্বসাধারণের কাছে তুলে ধরতে ডাক বিভাগের পক্ষ থেকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। প্রর্দশনী, হেরিটেজ ওয়াকের পাশাপাশি আড়াইশো বছরের ঐতিহ্যপূর্ণ এই অনুষ্ঠানের শরিক করা হচ্ছে কলকাতার আরেক ঐতিহ্য ট্রামকে। ডাক বিভাগের আধিকারিক তুষার কান্তি চৌধুরী বঙ্গদর্শন.কম-কে জানাচ্ছেন, “এই ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠানে সাধারণ মানুষকে শরিক করতে আয়োজন করা হয়েছে বিভিন্ন প্রতিযোগিতার। ফলে আগ্রহী অনেকেই এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহন করে সাক্ষী থাকতে পারবেন এই ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানের।” এছাড়াও ডাক বিভাগ সম্পর্কিত বিভিন্ন স্পেশাল কভারের উদ্বোধন করা হবে ১৪ মার্চ থেকে ১৯ মার্চ পর্যন্ত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে।
যোগাযোগ ভবনের দেওয়ালে সেকালের পোস্টম্যানরা, কাঠখোদাই শিল্প
ডাক ব্যবস্থার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত ডাক টিকিট। ১৮৫৪ সালে ডাক ব্যবস্থার সংস্কার সাধন করে ভারতে ডাক টিকিটের প্রচলন করেন লর্ড ডালহৌসি। রানি ভিক্টোরিয়ার ছবি সম্বলিত সেই ডাক টিকিট প্রচলিত ছিল প্রায় ১৯০০ সাল পর্যন্ত। স্বাধীনতার পর সেই বছরেই প্রকাশিত হয় স্বাধীন ভারতের প্রথম ডাক টিকিট, যেখানে ছিল জাতীয় পতাকার ছবি ও জয় হিন্দ স্লোগান। ১৯৬২ সাল থেকে হিন্দি হরফে ‘ভারত’ এবং ইংরেজিতে ‘INDIA’ লেখা ডাক টিকিট প্রকাশিত হয়ে চলেছে। বিভিন্ন সময় ভারতের ভিন্ন ভিন্ন ঐতিহ্যকে সম্মান জানিয়ে ভারত সরকার ডাক টিকিট প্রকাশ করেছে। পশ্চিমবঙ্গ সার্কেলের পোস্ট মাস্টার জেনারেল নীরজ কুমার জানালেন, পৃথিবীর নানা প্রান্তে ভারতের সুগন্ধকে পৌঁছে দেওয়ার জন্য রয়েছে বিশেষ সুগন্ধি ডাক টিকিট। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, জিপিওর আড়াইশো বছর (250 Years of GPO) উপলক্ষ্যেও প্রকাশিত হয়েছে বিশেষ ডাক টিকিট।
এই ভবনের নকশা তৈরি করেছিলেন ওয়াল্টার.বি.গ্রেনভিল
যুগ বদলেছে, বদলেছে যোগাযোগের মাধ্যম। তবু বৃদ্ধ ডাক ব্যবস্থা বনস্পতির ছায়া দিয়ে চলেছে দেশ জুড়ে। শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, ব্যাঙ্কিং পরিষেবা, বিভিন্ন আর্থিক প্রকল্প, আধার কার্ড সংক্রান্ত কাজ প্রভৃতি আজ ডাক ব্যবস্থার অন্তর্গত। প্রিয়জনকে উপহার স্বরূপ তার ছবি সম্বলিত ডাক টিকিট তৈরি করে দেওয়া যায় My Stamp প্রকল্পে। ডাক বিভাগের ব্যবস্থাপনায় জিপিওতে শুরু হয়েছে পার্সেল ক্যাফে। এভাবেই ইতিহাসের ভূমিতে দাঁড়িয়ে জিপিও নামক প্রাচীন বটগাছ বিস্তার করে চলেছে আধুনিকতার ঝুরি, যা পোক্ত করছে ঐতিহ্যের শিকড়কে।
