সারাদিন বঙ্গদর্শনের সঙ্গে শহরের বিভিন্ন পরিবহনে ভ্রমণ
“কলিকাতা চলিয়াছে নড়িতে নড়িতে” – কলকাতা চলছে। সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে মেলাতে কলকাতা ছুটে চলেছে তার সমস্ত ঐতিহ্যকে মাথায় করে। কখনও দু-চাকা, তিনচাকা; কখনও চারচাকা-ছয়চাকা – কলকাতা ছুটছে। ঠিক ধরেছেন! কথা বলছি কলকাতার পরিবহন নিয়ে। কী না নেই এই শহরে! প্রায় ১২-১৩ রকমের যানবাহন প্রতিনিয়ত আমাদের সঙ্গে নিয়ে ছুটছে মহানগর। এত যান চলাচলের শহর ভারতে প্রায় হাতে গোনা। আকাশপথ থেকে পাতালপথ, জলপথ থেকে সড়কপথ – কী না নেই এই শহরে! আর প্রায় সবকিছুই বাজেট ফ্রেন্ডলি। আজ বঙ্গদর্শন.কম-এর ভ্লগ কলকাতার পরিবহন নিয়ে।

বাস: কলকাতার বাসের ইতিহাস প্রায় ২০০ বছরের পুরনো। ১৯১৮ সালে প্রথম বেসরকারি উদ্যোগে বাস চালু হয় কলকাতায়। ১৯২২ সালে মোটরচালিত যাত্রীবাস চলে মহানগরে। শুরুর দিকে অবশ্য বাসের কোনও নম্বর ছিল না। পথের বন্ধু, চলে এসো, মেনকা, কিন্নরী এমনই সব বাহারি নামে চলত বাস। স্বাধীনতার পর ১৯৪৮ সালে আসে সরকারি বাস। তৈরি হয় CSTC ও WBSTC। বেঁধে দেওয়া হয় নির্দিষ্ট ভাড়া। এরপর ১৯৮০ সালে আসে মিনিবাস। তবে ২০০৫ সালে বন্ধ হয়ে যায় ঐতিহ্যবাহী ডবল ডেকার বাস। ২০১৬ সালে, তিনটি সরকারি বাস কোম্পানি একত্রিত হয়ে গঠন করে পশ্চিমবঙ্গ পরিবহন নিগম।

ট্রাম: ১৮৭৩ সালে কলকাতার আর্মেনিয়া ঘাট থেকে শিয়ালদহ পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম ট্রাম চালু হয়। ১৯০২ সালে ট্রাম পরিষেবার বৈদ্যুতিকরন শুরু হয়; যেটি ছিল এশিয়ার প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রাম পরিষেবা। একটি ট্রামের সর্বাধিক যাত্রী ধারণ ক্ষমতা প্রায় ৩০০, যেখানে একটি বাস সর্বাধিক ৬০ জন যাত্রীকে বহন করতে পারে। ট্রাম পরিষেবা অত্যন্ত সুলভ, সহজ ও স্বাস্থ্যকর। যেহেতু ট্রাম বিদ্যুতের মাধ্যমে চলে, তাই ট্রাম দূষণমুক্ত ও পরিবেশবান্ধব। বর্তমানে অত্যন্ত সংকটে রয়েছে কলকাতার ট্রাম। এখনও কয়েকটি রুটে ট্রাম চলে, তবে কমেছে যাত্রীসংখ্যা।

হলুদ ট্যাক্সি: হলুদ ট্যাক্সি কলকাতার ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডার। ১৯০৯ সালে এই শহরে প্রথম ট্যাক্সি আসে। বর্তমানে যেখানে এখন ফ্র্যাঙ্ক রস কোম্পানির ওষুধের দোকান রয়েছে চৌরঙ্গী রোডে, সেখানেই ছিল ফরাসি শেভিজাঁ কোম্পানির অফিস। তারাই কলকাতার পথে প্রথম ট্যাক্সি চালু করে। তখন চৌরঙ্গী থেকে মিটারওয়ালা দেওয়া গাড়ি পৌঁছে যেত দমদম, ব্যারাকপুর, বজবজ। তবে এখন, পরিবেশের দিকে নজর দিতে গিয়ে ১৫ বছরের বেশি পুরোনো প্রায় ২,৫০০ ট্যাক্সিকে রাস্তায় নামার অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে সরকারি তরফে। বিভিন্ন ধরনের ক্যাব সংস্থা, যেমন ওলা, উবার, ইনড্রাইভার এসে হলুদ ট্যাক্সির কিছুটা হলেও ক্রেজ কমেছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হয়, অতিরিক্ত ভাড়া আর ড্রাইভারদের খারাপ ব্যবহার।

টানা রিক্সা: আজও শহরের হার্টথ্রব রিক্সাওয়ালারা। কলকাতার এই হাতে টানা রিকশার উত্তরাধিকার শিমলা থেকে, যা ব্রিটিশ ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তাদের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী ছিল। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে, হাতে টানা রিক্সা শহরের অবিচ্ছেদ্য অংশ। হাতে টানা রিক্সা নিষিদ্ধ ঘোষণা করার দাবি উঠেছিল একসময়, কিন্তু শহরের মায়ায় জড়ানো মানুষরা আজও ছাড়তে পারেননি রিক্সা ঐতিহ্যকে।

ফেরি: ১৮২৩ সালের ১৩ জুলাই খিদিরপুরে কিড অ্যান্ড কোম্পানির জাহাজঘাটা থেকে যাত্রা শুরু করে এক বাষ্পীয় জলযান। অনুমান করা হয়, সেটাই ছিল কলকাতায় প্রথম জলপথে যাত্রা। ঐতিহাসিকদের মতে, জাহাজ শিল্পই ছিল কলকাতা তথা ব্রিটিশ ভারতের প্রথম ভারী শিল্প। ১৭৬৯ সালে প্রথম জাহাজ তৈরি হয়। কিন্তু জাহাজ আজ অতীত। তবে এখনও হাওড়া-কলকাতার যোগাযোগ ব্যবস্থাকে বেঁধে রেখেছে স্টিমার। হুগলি নদীতে ভাসতে ভাসতে বাগবাজার থেকে হাওড়া চলে যাওয়া যায় অত্যন্ত স্বল্প মূল্যে।

বিমান: কলকাতার বিমানের ইতিহাস প্রায় একশো বছরের পুরনো। ১,৬৪১ একর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত কলকাতা বিমানবন্দর দেশের মধ্যে পঞ্চম ব্যস্ততম বিমানবন্দর হিসেবে উঠে আসে। ২২ মিলিয়ন যাত্রী পরিবহনের রেকর্ড নিয়ে দিল্লি, মুম্বই, বেঙ্গালুরু ও চেন্নাইয়ের পরেই স্থান করে নেয় নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। উনবিংশ শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে ভারতীয় বিমান পরিবহন শিল্পে জেট এয়ারওয়েজ ও এয়ার সাহারার মতো নতুন বিমান সংস্থাগুলির আগমনের ফলে কলকাতা বিমানবন্দর নতুন ভাবে প্রাণ পায়। ২০০৫ সালে, বিমানসংস্থা স্পাইসজেট, ইন্ডিগো এবং কিংফিশার এয়ারলাইন্স-সহ স্বল্পমূল্যের বিমান সংস্থাগুলির ব্যাপ্তি ঘটলে, বিমানবন্দরে যাত্রী সংখ্যা বৃদ্ধি পায় বহু সংখ্যক।

মেট্রো/পাতালরেল: ১৯৮৪ সালের ২৪ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এসপ্ল্যানেড – ভবানীপুর (নেতাজি ভবন) রুটে ভারতের প্রথম তথা এশিয়ার পঞ্চম মেট্রো পরিষেবা কলকাতা মেট্রোর উদ্বোধন করেন। কলকাতা মেট্রো ভারতের একমাত্র পাতালরেল পরিষেবা। কলকাতা মেট্রোয় বর্তমানে চালু রয়েছে চারটি লাইন; অর্থাৎ নীল, সবুজ, পার্পেল ও কমলা। এই চার রুটে মোট ৫০টি স্টেশন রয়েছে।

অটো: কলকাতায় একটা প্রবাদ আছে জানেন তো? উত্তর থেকে দক্ষিণ, অটোর ইচ্ছেয় শেষ কথা। শহরে চটজলদি সফরে অটোর কোনো বিকল্প নেই। ইদানীং বলা হয়, কলকাতায় যদি কেউ রাজত্ব করে, সেটা হচ্ছে অটো। নিত্যযাত্রীদের সঙ্গে অটো চালকদের বচসা প্রতিদিনের সঙ্গী। আবার এ-ও ঠিক অটো ছাড়া অধুনা কলকাতাকে ভাবাই যায় না।

রেল: নিঃসন্দেহে গোটা দেশের অন্যতম ব্যস্ততম রেল স্টেশন হাওড়া। ভারতীয় রেলের এই স্টেশনটি প্রতিদিন সাক্ষী থাকে লক্ষ লক্ষ মানুষের যাতায়াতের। ট্রেন যাত্রীদের জীবন জড়িয়ে গিয়েছে এই হাওড়া স্টেশনের সঙ্গে। হাওড়া-হুগলি মেইন লাইনে প্রথম পাবলিক ট্রেন ছেড়েছিল ১৫ অগাস্ট ১৮৫৪ সালে। অন্যদিকে, শিয়ালদহ স্টেশন চালু হয় ১৮৬৯ সালে। দেশভাগের সময় পূর্ববঙ্গীয় রেলের শিয়ালদহ বিভাগ ভারতের পূর্ব রেলের আওতাভুক্ত হয়। ভারতের অন্যতম দুই ব্যস্ততম স্টেশন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে হাওড়া ও শিয়ালদহ। এছাড়াও কলকাতার শহরতলির ট্রেনপথ হিসেবে উল্লেখযোগ্য চক্ররেল। এই চক্র রেলপথের দৈর্ঘ্য ৩৬.২ কিমি। স্টেশন রয়েছে মোট ২০টি।
এছাড়াও পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতোই ব্যক্তিগত যান হিসেবে চারচাকার পাশাপাশি রয়েছে বাইক এবং সাইকেল। সাইকেল পরিবেশবান্ধব যান, স্বাস্থ্যের জন্যেও ভালো। সম্প্রতি কলকাতার নিউটাউনে আলাদা করে সাইকেল লেনও তৈরি করা হয়েছে।
_______
পরিকল্পনা, সঞ্চালনা, সম্পাদনা : সুমন সাধু | চিত্রগ্রহণ সহযোগিতা : মৌনী মণ্ডল
