আজ উনিশে এপ্রিল, কাদম্বরীদেবীর মৃত্যুদিন

ঠাকুরবাড়িতে এসে কাদম্বরীর হারিয়ে গেল বাপ-মায়ের দেওয়া নাম মাতঙ্গিনী

মেয়েটির নাম ছিল মাতঙ্গিনী। ধনী শ্বশুরবাড়িতে এসে উঁচু উঁচু ঘর, দালান, বিখ্যাত মানুষজনের ভিড়ে প্রথমেই যেটা হারিয়ে গেল, সেইটি ওই মাতঙ্গিনী নাম। তখনকার দিনের অত্যন্ত সুপুরুষ, বহুমুখী  প্রতিভার অধিকারী, নাট্যকার জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী হওয়ার জন্য পরিবারের লোকজন ‘কাদম্বরী’ নামটিই ঠিক করলেন। মুহূর্তে মিলিয়ে গেল, বাবা শ্যামলাল গাঙ্গুলি আর মা ত্রৈলোক্যসুন্দরীর দেওয়া আদরের নামটি। এই বদলে যাওয়াই তো মেয়েদের ভবিতব্য। কাদম্বরীর জীবনের শুরুতেই তাঁর সত্তাকে নতুন এক নামের মোড়কে ঢেকে দেওয়া হল। রবির নতুন বৌঠান  কাদম্বরীর জীবনের গল্পটা পাতাঝরা মরশুমের মনকেমন করা শুকনো ডালের মতো, যে ডালে ঝড় নেমেছে, কিন্তু ফুল ফোটেনি। অথচ অন্তর্মুখী এই শ্যামলা মেয়েটির ভিতর আগুন ছিল। রবীন্দ্রনাথের প্রতিভা যার স্পর্শে আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। ভাইদের মধ্যে সবচেয়ে চাপা রঙের দেওরটি নাকি বিহারীলালের মতো লিখতে পারে না— লেখার আগুন উসকে দেওয়ার জন্য এই শব্দকটি যথেষ্ট ছিল আর সারাজীবন জীবনের ধ্রুবতারা হয়ে কবিকে আলোর পথ দেখিয়ে যাবার জন্য দৈব নির্দিষ্ট ছিল একটি মৃত্যু। কাদম্বরীর মৃত্যু।

অথচ কত উচ্ছ্বল ছিল কাদম্বরীর জীবনের সূচনালগ্ন। ঠাকুরবাড়ি তো সেই আমলের মেয়ে এবং পুত্রবধূদের শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত করেনি কখনও। তাই ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলে শুধু রামায়ণ মহাভারত নয়, সবরকম আধুনিক বইপত্তর, পত্রিকা আসত নিয়মিত। কাদম্বরীকে বই পড়ে শোনাতেন রবীন্দ্রনাথ। সাহিত্য নিয়ে তর্কবিতর্ক চলত পুরোদস্তুর। কাদম্বরীর তৈরি করা রান্না খেতে খেতে খুনসুটি আর খেলায় একই সঙ্গে বড়ো হয়েছিলেন কাদম্বরী, রবীন্দ্রনাথ। যেন দুটি স্যাঙাত। তেতলার ছাদে কাদম্বরীর উদ্যোগেই তৈরি হয়েছিল নন্দনকানন। সারি দিয়ে পাম, গন্ধরাজ, রজনীগন্ধা, করবী, দোলনচাঁপা ফুলের সৌরভে, ঠান্ডা শরবতের স্বাদে, গুণীজনের সমাবেশে জোড়াসাঁকো তখন জমজমাট। অক্ষয় বড়াল, বিহারীলালের তখন নিত্য আসা যাওয়া। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ গান করছেন, নাটক লিখছেন, সভা তৈরি করছেন। রবীন্দ্রনাথও তখন মুখচোরা কিশোর থেকে হয়ে উঠছেন জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব। এই সবের অন্তরালে অনস্বীকার্য কাদম্বরীর প্রেরণা। ঠাকুরবাড়ির নাটকের আসরেও কাদম্বরী অংশগ্রহণ করতেন। বসন্ত উৎসব, মানময়ী, বসন্ত উৎসব, অলীকবাবু নাটকে নজরকাড়া অভিনয় করেছিলেন কাদম্বরী। নিজে ছিলেন সেকালের গায়ক জগন্মোহন গঙ্গোপাধ্যায়ের পৌত্রী। সুন্দর গান গাইতেন। ঠাকুরবাড়িতে তাঁকে গ্রীকদেবী হেকেটির নামে ডাকা হত। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, বিহারীলাল ও রবীন্দ্রনাথের উপর তাঁর প্রভাবের কথা মনে করে।

তেতলার ছাদে কাদম্বরীর উদ্যোগেই তৈরি হয়েছিল নন্দনকানন। সারি দিয়ে পাম, গন্ধরাজ, রজনীগন্ধা, করবী, দোলনচাঁপা ফুলের সৌরভে, ঠান্ডা শরবতের স্বাদে, গুণীজনের সমাবেশে জোড়াসাঁকো তখন জমজমাট। অক্ষয় বড়াল, বিহারীলালের তখন নিত্য আসা যাওয়া। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ গান করছেন, নাটক লিখছেন, সভা তৈরি করছেন।

অত্যন্ত আধুনিক, রুচিসম্পন্ন, ব্যক্তিত্বময়ী এই মেয়েটিকে প্রথমে পছন্দ ছিল না। সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও তাঁর স্ত্রী জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের জন্য  কর্মচারী শ্যামলালের নয় বছরের শ্যামলা মেয়েটিকে মোটেই মনে ধরে নি তাঁদের। সেই বিরাগ বরাবর ছিল। অথচ কী আপ্রাণ প্রয়াসে ওই মেয়েটি নিজেকে, নিজের ব্যক্তিত্বকে উজ্জ্বল ও বিশিষ্ট করে তুলবেন, সেই ইতিহাস কোনো স্মৃতিচারণে বা পারিবারিক দিনলিপিতে লেখা নেই। শুধু রবীন্দ্রনাথ তাঁর লেখার সঙ্গে বীণার তারের মতো জড়িয়ে নিয়েছিলেন কাদম্বরীকে। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ, গলায় পলার হার, বড়ো বড়ো কাজল নয়নের যে মেয়েটি ছিল তাঁর খেলার সাথী, কথা বলার সঙ্গী আর সাহিত্যের বড়ো সমালোচক — তাঁকে কখনো ভোলেননি রবীন্দ্রনাথ। পরে প্রবীণ বয়সের স্মৃতিচারণায় রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘ভাগ্যিস নতুন বৌঠান মারা গিয়েছিলেন, তাই আজও তাঁকে নিয়ে কবিতা লিখছি— বেঁচে থাকলে হয়তো বিষয় নিয়ে মামলা করতাম।’ কাদম্বরীর মৃত্যু রবীন্দ্রনাথের মনে স্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল। ‘জীবনস্মৃতি’-তে লিখেছিলেন, ‘চব্বিশ বছর বয়সের সময় মৃত্যুর সঙ্গে যে পরিচয় হইল তাহা স্থায়ী পরিচয়।’

রবীন্দ্রনাথ আর কাদম্বরীর সখ্য সে যুগেও আলোচনার কেন্দ্র ছিল, এ যুগেও মুখরোচক গল্প। তাই কাদম্বরীর আত্মহত্যার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ -মৃণালিনীর বিয়ের গল্পটা জুড়ে যায় অনায়াসে। অথচ উনিশ শতকের একটি মেয়ের মনেও যে অন্য বিভিন্ন কারণে ডিপ্রেশন তৈরি হতে পারে, একথা কেউ ভাবে না। কাদম্বরীর মধ্যে এই বিষণ্ণতা আগে থেকেই ছিল। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল জ্যোতিরিন্দ্রনাথের অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততা আর কাদম্বরীর প্রতি উদাসীনতা। রবীন্দ্রনাথও ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন নিজের পৃথিবীতে। অন্দরমহলের মেয়েদের সঙ্গে তেমন অন্তরঙ্গতা ছিল না কাদম্বরীর। হতে পারে সন্তানহীনতার কারণে সকলের থেকে দূরে দূরেই থাকতেন তিনি। স্বর্ণকুমারীদেবীর মেয়ে উর্মিলা কাদম্বরীর খুব স্নেহের ছিল। সেই মেয়ের আকস্মিক মৃত্যুতে প্রবল বিষণ্ণতা গ্রাস করে কাদম্বরীকে। একটা সময় ঠাকুরবাড়ির মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন কাদম্বরী। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সঙ্গে ঘোড়ায় চড়ে গড়ের মাঠে বেরিয়েও এসেছেন। রবীন্দ্রনাথের লেখার সমালোচনা করেছেন অকপটে। বিহারীলালকে মুগ্ধ করেছেন নিজের আচরণ দিয়ে। একটা সময় প্রবল ব্যস্ততায় জীবনের কষ্টগুলোকে উপেক্ষা করেছেন তাচ্ছিল্যভরে। তারপর হঠাৎ সকলে ব্যস্ত হয়ে গেল নিজে নিজের মতো করে।  ঝুপ করে নেমে আসা অন্ধকারের মতো চরম একাকিত্ব কাদম্বরীর আত্মহত্যাপ্রবণ মনটাকে জাগিয়ে তোলে। কোনো একটি বিশেষ কারণ নয়, অনেক বিষণ্ণতা জমাট বেঁধে কাদম্বরীর মৃত্যুচিন্তাকে জাগিয়ে তুলেছিল। 

১৮৮৪ সালের ১৯ এপ্রিল নিজের মনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে পরাজিত সৈনিকের মতো মৃত্যুকেই বেছে নেন কাদম্বরী। সেদিন ছিল জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সরোজিনী জাহাজের উদ্বোধন অনুষ্ঠান। কথা ছিল, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ এসে নিয়ে যাবেন তাঁকে। সারা সন্ধে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের জন্য প্রতীক্ষা করার পর, যখন কেউ এল না, তখন আফিম খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন কাদম্বরী। সফলও হন। অনেকে বলেন, ২১ এপ্রিল তাঁর মৃত্যু হয়। দেবেন্দ্রনাথের পরামর্শে সরিয়ে ফেলা হয় আত্মহত্যার সমস্ত চিহ্ন। বাড়িতে আলোচনা করে, সংবাদপত্রকে অর্থ দিয়ে চাপা দেওয়া হয় অভিমানী এই মেয়েটির মৃত্যুর প্রকৃত কারণটিকে। নয়ন সমুখে না থাকলেও রবীন্দ্রনাথের  নয়নের মাঝখানে ঠাঁই পেলেন কাদম্বরী, তাঁর সমস্ত স্মৃতির ঝাঁপি নিয়ে। হয়ে উঠলেন রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যজীবনের চালিকা শক্তি, জীবনের ধ্রুবতারা। আর জ্যোতিরিন্দ্রনাথ? তাঁর জীবনের সব দীপ নিভে গেল। ঐশ্বর্য, বৈভব, যশের দুনিয়া ছেড়ে যেন স্বেচ্ছা নির্বাসন নিলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথও অভিমানে তেমন ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখতে পারেননি তাঁর জ্যোতিদাদার সঙ্গে। রাঁচির মোরাবাদ পাহাড়ে, শান্তিধামে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ শেষ জীবন কাটিয়ে দেন। তাঁর ঘরে কাদম্বরীর একটিমাত্র পেন্সিল স্কেচ ছিল। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের লক্ষ্মীছাড়া, বর্ণহীন জীবনের অনুশোচনার প্রতীক হয়ে। 

_____________________
সহায়ক গ্রন্থ:

কবিমানসী, প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড, জগদীশ ভট্টাচার্য
কাদম্বরীর মৃত্যু এবং একটি প্রশ্ন (প্রতিবেদন), বঙ্গদর্শন.কম, ২৫ এপ্রিল, ২০১৮

Developed by DXDasia