জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুদিনে একজন বৃদ্ধ, ন্যুব্জ, শোকসন্তপ্ত মানুষের গল্প
গল্পের শুরুটা দেখে শেষটা আন্দাজ করা যায় না কোনোভাবেই। জীবন কিন্তু অদৃশ্য কোনো কথকের কথকতা। মৃত্যুর যতিচিহ্ন জীবনের প্লটকে স্পষ্ট করে। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনের প্লটটির কথা আজ বলি। ঠাকুর পরিবারের অভিশপ্ত রাজপুত্রের গল্পটা বিধাতা পুরুষ লিখেছিলেন আশ্চর্য মুন্সিয়ানায়। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের জীবনের শুরুটা বড়ো উজ্জ্বল। ঠাকুরবাড়িতে তখন একের পর এক সৃজনশীল কাজ চলছে। নাট্যচর্চা থেকে স্বদেশীয়ানা— সব উদ্যোগের প্রাণপুরুষ তখন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ। প্রতিভা এবং তার সার্থক প্রয়োগে সেই সময় তিনি সংস্কৃতিবান বাঙালির আদর্শ। কিশোর রবীন্দ্রনাথের জীবনে তাঁর ভূমিকা অন্তহীন। তরুণ রবীন্দ্রনাথের বন্ধু সখা প্রভু তখন শুধুই জ্যোতিদাদা। জীবনের প্রথম কিছু বছর বিপুল কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া এই প্রতিভাবান মানুষটির ব্যক্তিগত জীবনে সময় ছিল না। স্ত্রী কাদম্বরীর অভিমানের সংবেদনশীল লক্ষ্যে তিনি ছিলেন উদাসীন পুরুষ হয়ে। সত্যি তখন সময় কোথায়? নাটক রচনা, অভিনয়, নাট্যসাহিত্যের সংস্কার, শিল্প ও বাণিজ্য, শিকার, নীলের চাষ, স্টিমার পরিচালনা, ভারতীয় সংগীত সমাজ প্রতিষ্ঠা, ঠাকুরবাড়ির সদস্যদের নিয়ে নাটকীয়ভাবে সভা সমিতি তৈরি— সব কিছুর দায়িত্ব তাঁর উপর। একসঙ্গে এত কাজ করতে যতখানি প্রতিভা প্রয়োজন তার চেয়ে বেশিই হয়তো ছিল তাঁর। সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছে যাওয়ার কথা যে মানুষটির, তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল নির্মম অপযশ এবং একাকিত্ব। এই প্রবল বৈপরীত্যই জ্যোতিরিন্দ্রনাথের জীবনের গল্পটিকে ট্র্যাজিক করে তুলেছে। আদ্যন্ত রঙিন মানুষটির সাদা কালো প্রচ্ছদের বর্ণহীন জীবনের অন্ত্যপর্বটি বড়ো করুণ।
জ্যোতিরিন্দ্রনাথ বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। বোম্বাই থেকে এমন সুন্দর সেতার বাজানো শিখে এসেছিলেন যে সকলে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। পিয়ানো, হারমনিয়াম সবকিছুই তাঁর ছোঁয়ায় সুরতরঙ্গ তুলতো অনায়াসে। কিন্তু বাইরের জগতের সুর অন্দরমহলে তাঁর দাম্পত্যের সুরটিকে এলোমেলো করে দিচ্ছিল। কাদম্বরীদেবী যখন প্রথম ঠাকুরবাড়িতে এলেন, তখন তাঁর নয় বছর বয়স। সত্যেন্দ্রনাথ ও জ্ঞানদানন্দিনীর কাদম্বরীকে পছন্দ ছিল না একেবারেই। অথচ কাদম্বরী নিজেকে ধীরে ধীরে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের যোগ্য করে তুলেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের মস্ত বড়ো অবলম্বন ছিলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, কাদম্বরী। কিন্তু হঠাৎ করেই কাদম্বরীর অভিমানী পদক্ষেপ শুধু জ্যোতিরিন্দ্রনাথকে ভেঙে দিল না ভিতরে ভিতরে, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের ভিত আলগা করে দিল আজীবনের মতো। জ্যোতিরিন্দ্রনাথে জীবনে যে লক্ষ্মীছাড়া দশা তার সূচনা হল, তা কাদম্বরীর আত্মহত্যার পর থেকেই।
জ্যোতিরিন্দ্রনাথ নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নিলেন সবরকম উজ্জ্বল আলোয় আলোময় পরিবেশ ছেড়ে। ১৮৪৯। সালের ৪ মে জন্ম হয়েছিল যে উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের, ১৯২৫ সালের ৪ মার্চ না ফেরার দেশে চলে যান তিনি। তার আগে অপযশ, নিঃসঙ্গতা আর গভীর বেদনা ঘিরে ছিল তাঁকে। কাদম্বরীর মৃত্যু এবং রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি একইরকম আঘাত তৈরি করেছিল তাঁর মনে। তিনি যেন এক অভিশপ্ত গন্ধর্ব। এত যে প্রতিভা, তার কোনো ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সিদ্ধিলাভ সম্ভব হয়নি। সত্যি কী আশ্চর্য! নাট্যকার, বহুভাষাবিদ, গীতিকার, স্বরলিপিকার, চিত্রশিল্পী ছিলেন তিনি। জমিদারি পরিচালনা থেকে স্বদেশি স্টিমার চালানো, হিন্দুমেলা, বিদ্বজ্জন সমাগম, সারস্বত সমাজ, সঞ্জীবনী সভা প্রভৃতির তিনিই ছিলেন প্রধান উদ্যোক্তা। ‘ভারতী’ পত্রিকা তাঁরই পরিকল্পনায় প্রকাশিত হত। কেমন ছিলেন এই মানুষটি রাঁচির মোরাবাদী পাহাড়ের ‘শান্তিধাম’-এ? কর্মচঞ্চল জীবন থেকে থেকে এই স্বেচ্ছা নির্বাসন একরকমভাবে নিজেকে দেওয়া নিজেরই শাস্তি। কাদম্বরীর যে অভিমান জীবনের ব্যস্ত প্রহরে তিনি পরম ঔদাসীন্যে উপেক্ষা করেছিলেন, নিজের জীবনের অপরাহ্ণবেলায় সেই কাদম্বরীর একটিমাত্র প্রতিকৃতি ছাড়া তাঁর ঘরে আর কোনো শৌখিনতা ছিল না।
তখন তিনি সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিবারের সঙ্গে থাকতেন। এই কর্মীপুরুষের আদ্যন্ত ঘরোয়া এক পুরুষ হয়ে যাওয়ার গল্পটাই আসল ট্র্যাজেডি। এই স্বেচ্ছা নির্বাসন পর্বে, ১৯০৮ সালে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের লেখা একটি ডায়ারি পাওয়া যায়। ইন্দিরাদেবী ‘জ্যোতিকাকা’-র লেখা এই ডায়ারিটি সযত্নে রেখেছিলেন নিজের কাছে। ডায়ারির পাতায় পাতায় খুঁজলেও কোনো কর্মী পুরুষকে খুঁজে পাওয়া যায় না। সংসারী হয়ে ওঠার এই যে আপ্রাণ প্রচেষ্টা — তার কারণ কী? একসময়ের সংসার বিমুখ হয়ে থাকার অনুশোচনা? কিন্তু এই প্রয়াসে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ তো ফিরে পেলেন না তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড়ো সম্পদ কাদম্বরীকে। রাঁচিতে যাওয়ার আগে তিনি বালিগঞ্জে ১৯ নং স্টোর রোডে থাকতেন সত্যেন্দ্রনাথের পরিবারের সঙ্গে। সত্যেন্দ্রনাথ, জ্ঞানদানন্দিনী, সুরেন্দ্রনাথ, সংজ্ঞাদেবী, ইন্দিরাদেবী, প্রমথ চৌধুরী— এঁরাই ছিলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথের প্রিয়জন। আর একজনের কথায় ভরাট ছিল ডায়ারির পাতা—সুরেন্দ্রনাথের বড়ো ছেলে সুবীরেন্দ্রনাথ। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের আদরের খোকা। ভাবলে খুব অবাক লাগে একদিন যাঁর উদ্যোগে বসেছে গুপ্তসভা, বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে স্টিমার চালিয়েছেন, যাঁর লেখা নাটকে মুগ্ধ ছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ, তিনি সব ভুলে ছোট্ট একটি ছেলের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। তাঁর শেষজীবনে এই শিশুটিই ছিল একমাত্র অবলম্বন, তাঁর সব শোকের উপশম।
কাদম্বরীকে হারিয়ে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ এক নিঃসঙ্গ বিপত্নীক পুরুষ হয়েই গোটা জীবন কাটিয়ে দেন। আত্মীয় পরিজনদের কথায় তিনি শুধু বলতেন — ‘তাঁকে ভালোবাসি’। আত্মীয় পরিজনদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলতেন তিনি। তাঁর ডায়ারির পাতা থেকে সেকথাই অনুমান করা যায়। দেশ ও সমাজের থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করাই ছিল আত্মনির্যাতন। অথচ, ডায়ারির পাতায় ধরা পড়ছে মনের দ্বিধা। একদিকে খোকার রুপোর তাবিজের কথা আছে, অন্যদিকে সামাজিক, সাংস্কৃতিক নানা অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার কথা। মানুষের মন বড়ো সংবেদনশীল আর জটিল। বাংলার সংস্কৃতির জন্য পরিবারবিমুখ হয়েছিলেন যে প্রবাদপ্রতিম পুরুষ, শেষজীবনে অন্যের সংসারে অতিথির মতো থেকে কি তিনি দেখতে চাইছিলেন বাংলার সাংস্কৃতিক ক্ষেত্র তাঁকে মনে রেখেছে কীনা! তাঁর তরফে আন্তরিকতার অভাব ছিল না। বারবার ছুঁয়ে এসেছেন জোড়াসাঁকোর জন্মভিটে। নিত্য যোগাযোগ রেখেছেন স্বর্ণকুমারী, বর্ণকুমারী, হেমেন্দ্রনাথের কন্যা প্রতিভা, আশুতোষ চৌধুরী, যোগেশ চৌধুরী, ইন্দিরাদেবী, প্রমথ চৌধুরী ইত্যাদি আরো অনেকের সঙ্গে। কিন্তু তাঁর অন্তরের শোকের দাহ সম্পর্কগুলিকেও দগ্ধ করেছিল অনেকটা। ওই ভাঙা মন নিয়েই তিনি ঘুরেছেন ডেয়ার্কিনের দোকানে, মার্কেটে থাকা বইয়ের দোকান, উইলসনের হোটেলে। কিন্তু খ্যাতি আর ফিরে আসেনি। তাই রাঁচির মোরবাদী পাহাড়ে জীবনের অন্ত্যপর্ব কাটিয়েছিলেন উপেক্ষিত রাজপুত্রের মতো।
সেইসময় নেশা ছিল প্রতিকৃতি আঁকা। রাঁচিতে যার সঙ্গেই পরিচিত হয়েছেন,তাঁরই প্রতিকৃতি এঁকেছেন — উকিল, ডাক্তার, মুনসেফ, ইঞ্জিনিয়ার, ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, পোস্টমাস্টার, পুলিশ অফিসার আরো কত কারো! কিন্তু একটি প্রতিকৃতিই নির্জন ঘরের শোভা হয়েছিল — কাদম্বরী দেবীর। অপরাধবোধ না ভালোবাসা? বলতে পারবো না ঠিক! ডায়ারির পাতায় মাঘোৎসব, রাখিবন্ধন, দেবেন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্রের জন্মদিনের বর্ণনা, বৃষ্টির বর্ণনা, যতীন্দ্রমোহনের মৃত্যু, নরেন গোঁসাইকে গুলি করে মারার ঘটনা, খোকার কথা, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিবারের কথা, সুবীরেন্দ্রনাথের জন্য খেলনা, মেজো বৌঠানের জন্য হালুয়া আনার কথা তো আছেই আর আছে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাজার করা কথা। দ্বারকানাথের পৌত্রের বাজার করার ঘটনা আশ্চর্য বটে।
রাঁচিতে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়ি শান্তিধাম
রাঁচিতে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের বাড়ির নাম ছিল শান্তিধাম। ফটকের উপর একটি ধ্যানীবুদ্ধের মর্মর মূর্তি। এটি শীতল স্নিগ্ধ গুহা আর একটি লতামণ্ডপ ছিল শান্তিধামের বৈশিষ্ট্য। আসলে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ শান্তিই তো খুঁজে চলেছেন জীবনের দীর্ঘ সময় ধরে। বসন্তরঞ্জন চট্টোপাধ্যায় জ্যোতিরিন্দ্রনাথের কথা শুনেই লিখেছিলেন, ‘জ্যোতিরিন্দ্রনাথের জীবনস্মৃতি’! আশ্চর্যজনকভাবে সেখানে কাদম্বরীর মৃত্যু রহস্য নিয়ে খুব বেশি কিছু বলা নেই। প্রকৃত শোক ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। বুকের গহীনে থাকে, কথায় ধরা দেয় না।
১৯২৫ সালের ৪ মার্চ জ্যোতিরিন্দ্রনাথের মৃত্যু হয়। এই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ বৃদ্ধ, ন্যুব্জ, শোকসন্তপ্ত এক মানুষ। কিন্তু প্রকৃত জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, বাংলা সংস্কৃতির এক জ্যোতির্ময় কাণ্ডারির মৃত্যু হয়েছিল সেই ১৮৮৪ সালের ১৯ এপ্রিল, যেদিন তাঁর স্ত্রী কাদম্বরী অভিমান করে আত্মহত্যা করেছিলেন। ঠাকুরবাড়ির এই অভিশপ্ত গন্ধর্ব সেদিনের পর এক নিষ্প্রাণ পুতুল হয়ে আয়ুরেখা ধরে এগিয়ে গিয়েছিলেন মাত্র।
সহায়ক গ্রন্থঃ
বসন্ত কুমার চট্টোপাধ্যায় প্রণীত ‘জ্যোতিরিন্দ্রনাথের জীবনস্মৃতি’
রবীন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথ, পূর্ণানন্দ চট্টোপাধ্যায়