“নিশানে তিনটে রং, শুধু কি ‘নেশনী’ ঢং?” প্রশ্ন তুলেছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র

প্রশ্নটি তিনি উত্থাপন করেছিলেন একটি কিশোর-পত্রিকায়

চিত্তপ্রসাদ ভট্টাচার্য, আনটাইটেলড্‌ (১৯৫২)

স্পেনের সিভিল ওয়ার, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, পারমানবিক ধ্বংসলীলা চলছে। তারই পাশাপাশি চলছে দুর্ভিক্ষ, মহামারি ও দাঙ্গা—ধাঙড় ও ট্রাম ধর্মঘট, রশিদ আলি ও ভিয়েতনাম দিবসে ছাত্র-হত্যার ঘটনা, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের উত্তুঙ্গ অধ্যায়। ভয়াবহ যুদ্ধ, নড়বড়ে সামাজিক পরিকাঠামো, অসংখ্য মৃত্যু সবচেয়ে বেশি আঘাত করছিল শিশুমনে। মানব-সভ্যতার এই নিদারুণ সংকট-পর্বে বারো বছর ধরে জ্বলেছিল কিশোর-পত্রিকা ‘রংমশাল’। এই কিশোর-পত্রিকাটিকে সামাজিক ইতিহাসের অন্যতম দলিলের মর্যাদা দিয়েছিলেন যাঁরা, তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র

‘রংমশাল’ নামটি নিয়ে বিভ্রান্তি কাটাতে বলে নেওয়া প্রয়োজন, ‘রংমশাল’ নামে একটি সংকলন-গ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৯২০-তে। প্রেমাঙ্কুর আতর্থী ও চারুচন্দ্র রায় ছিলেন তার সম্পাদক। একই বছরে ওই নামেই বাংলার প্রথম দীর্ঘায়ু বার্ষিক পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়। প্রথম সম্পাদক মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায়। আমার আলোচ্য, মাসিক কিশোর-পত্রিকা রংমশাল, ১৩৪৩ (১৯৩৬)-এর কার্তিক থেকে যাত্রা শুরু করে। খগেন্দ্রনাথ সেনের পর পত্রিকাটির বারো বছরের জীবনে চারবার সম্পাদক বদল হয়েছে। প্রথম পর্বে প্রেমেন্দ্র মিত্র, হেমেন্দ্রকুমার রায়, সতীকান্ত গুহ ও তারপরে আরেকবার হেমেন্দ্রকুমার হাল ধরেন। আর শেষ পর্বে, প্রায় চার বছর কামাক্ষীপ্রসাদ ও দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় ভ্রাতৃদ্বয় পত্রিকাটির দায়িত্ব নেন এবং কিছু দুঃসাহসিক কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেন।

কামাক্ষীপ্রসাদ ও দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের ছাত্র ও শ্রমিক রাজনীতি সম্বন্ধে আরো খোলা দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। সাম্প্রদায়িকতা ও প্রাদেশিকতার সঙ্গে যুঝতে তাঁরা গড়ে তোলেন ‘রংমশাল কিশোর-সংঘ’, যা কালক্রমে ‘শান্তি বাহিনী’র আদর্শের সঙ্গে মিলেমিশে যায়। ভিয়েতনাম ও রশিদ আলি দিবসে নিহত শহিদদের নামগুলি যেমন রংমশালের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল, তেমনই রশিদ আলি দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত কবিতা সংকলন ‘ঘুম তাড়ানি ছড়া’-রও সূত্রপাত হয় এই পত্রিকাতেই। বাংলা পত্রিকার মধ্যে সর্বপ্রথম ‘সুকুমার রায়’ সংখ্যা প্রকাশ, রবীন্দ্রনাথের নামে প্রথম সাহিত্য-পুরস্কার প্রবর্তনের সম্মানও তাঁদেরই প্রাপ্য। সম্পাদকীয় নীতি রূপায়ণের দৃষ্টিকোণ পরিবর্তন সত্ত্বেও অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রেমেন্দ্র মিত্র, বুদ্ধদেব বসু, শিবরাম চক্রবর্তী, সুকুমার দে সরকার ও কামাক্ষীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় প্রমুখই শুধু লিখতেন এমনটা নয়, আদর্শের মূল ধারাটিও সেখানে ছিল অক্ষুণ্ণ।তৃতীয় বছর থেকে শুরু হয় আরো চারটি ধারাবাহিক। অবনীন্দ্রনাথের ‘চটজলদী কবিতা’, সুকুমার দে সরকারের ‘মৃত্যুহীন দেশ’, ‘অমরলতা’র দ্বিতীয় পর্ব ও রজত সেনের ‘মাকড়সা’। ১৩৪৬-এর পর যুদ্ধের আঁচ লাগে পত্রিকায়। পুঁজির অভাব, প্রকাশও অনিয়মিত। ১৩৪৬-এর চৈত্র মাসে একসঙ্গে তিনটি পত্রিকা প্রকাশ করা হয়। সংবাদের জানলা ‘চলন্তিকা’ নামে বিভাগটি দিয়েই রংমশাল-এ মহাযুদ্ধের খবরাখবর দেওয়া শুরু হয়। অল্প বিস্তর রাজনৈতিক প্রসঙ্গ উঠে আসতে থাকে। পৃথিবীর মানচিত্র দ্রুত পালটে যাচ্ছিল। চিন ও স্পেনের উপর বিদেশি আক্রমণের তীব্র নিন্দা ও গণতন্ত্র বনাম ডিকটেটরশিপের ভয়ংকর সংঘর্ষের ভবিষ্যদ্বাণীও করে ‘চলন্তিকা’। হিটলারের হাতে পড়ে সে-দেশের শিক্ষাব্যবস্থার কী হাল হয়েছে, তার দৃষ্টান্ত দেওয়া হয় জার্মানির একটি স্কুলের অঙ্কের প্রশ্নপত্র থেকেঃ

কোনো এরোপ্লেনে যদি ৪৫ টা বোমা থাকে আর প্রত্যেকটা বোমার ওজন হয় দেড় কিলোগ্রাম তবে বোমাগুলির সামগ্রিক ওজন কত? বোমাগুলির এক-তৃতীয়াংশ যদি লক্ষ্যভেদ করে ও তার মধ্যে শতকরা কুড়িটি অগ্নিসংযোগ করে, তাহলে কতগুলি বোমা অগ্নিসংযোগের সহায়ক হয়েছে?

এর আগে আন্তর্জাতিক প্রসঙ্গের তুলনায় দেশের কথা তখনো সেভাবে প্রকাশ হতে শুরু হয়নি। উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম, স্পেনের সিভিল ওয়ার-এর কালে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক যুব সঙ্ঘের কনিষ্ঠতমা প্রতিনিধি, মারগারিটা রোবলস-এর একটি চিঠি প্রকাশ। সেখান থেকেই জানা যায় ভারতে মহিলা-প্রতিনিধি রূপে তারা বসু স্পেনে গিয়েছিলেন। ‘চলন্তিকা’য় উঠে আসতে থাকে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রসঙ্গ। ১৩৪৭-এ জার্মানির ডেনমার্ক ও নরওয়ে দখলের খবরের সঙ্গে প্রকাশিত হয় কলকাতার ধাঙড় ধর্মঘটের বিবরণঃ

‘ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় এই কলিকাতা নগরীর এক কুৎসিত রূপ বেরিয়ে পড়ল। …কর্পোরেশন ইলেকশন নিয়ে যে বাবুরা ব্যস্ত ছিলেন ইলেকশন মিটে গেলে তাঁরা এই ধর্মঘট নিয়ে লাগলেন।’দশমবর্ষ রংমশাল-এ প্রথম কবিতা ছাপা হয় বিমলচন্দ্র ঘোষ, সুকান্ত ভট্টাচার্য ও মঙ্গলাচরণ চট্টপাধ্যায়ের। সুকান্ত লেখেন, ‘অতি-কিশোরের ছড়া’ ও ‘রেশান কার্ড’। মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায় লেখেন, ‘ঘুম তাড়ানি গান’। রংমশাল-এ অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত-র প্রথম কবিতা ছাপা হয়, ‘বাজার গরম’। এই বছরেই কয়েকটি অভিনব বিভাগ খোলা হয়। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘আমার বাংলা’, রাধামোহন ভট্টাচার্যের ‘সেদিন কি হল’, হৈমন্তী চক্রবর্তীর ‘তোমরাও পারো’, অমিয় চক্রবর্তীর বিদেশ ভ্রমণ বিষয়ক ‘চলো যাই’ এবং দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের বিজ্ঞানের পাতা—‘কেন?’।

১৩৫০-এর জ্যৈষ্ঠয় প্রকাশিত হয় ‘যুদ্ধ সংখ্যা’। এ ছাড়া, শেষ বছর প্রকাশিত হয় ‘স্বাধীনতা সংখ্যা’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রত্যক্ষ আঁচ ভারতের গায়ে না লাগলেও, লেগেছিল তার অন্যবর্তী দুর্ভিক্ষ ও দাঙ্গার। আর দাঙ্গা ও দেশভাগের অমানুষিক দিনগুলোয় স্বাধীনতা প্রাপ্তির উৎসব-মিছিল ম্লান হয়ে যায় ছিন্নমূল মানুষের বিহ্বল স্রোতে। সেসব কথা প্রসঙ্গে প্রেমেন্দ্র মিত্র লিখেছিলেন ‘নিশান’, দেবীপ্রসাদ চট্টপাধ্যায় লেখেন ‘তিলক ব্রিজের ওপর’ এবং মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লেখেন ‘পনেরই আগস্টের কবিতা’।

‘নিশান’-এ প্রেমেন্দ্র লিখেছিলেনঃ

নিশানে তিনটে রং

শুধু কি ‘নেশনী’ ঢং?

পুচ্ছের মতো উচ্চে নাচানো

জাতীয় ফাঁকা অহং!

সবুজ হবে কি দেশটা?

মিটবে কি ক্ষিদে ও তেষ্টা!

কিষাণের হাতে কাস্তে না যেন

তারই গলা কাটে শেষটা!

রূপকথা, ননসেন্স, রাজনীতি-সমাজ সচেতনতা অথবা বৈজ্ঞানিক কল্পনা, জীবনকে রুল-টানা খাতার নিরাপদ চৌহদ্দির বাইরে টেনে আনার জন্যই যত চেষ্টা ছিল রংমশাল-এর পরিচালকবর্গের। সেই পত্রিকাও আজ নেই, নেই সেই পরিচালক-লেখকবর্গ। কালের প্রবাহে ইতিহাসে কিশোরদের ভূমিকা বদলেছে, তেমনই বদলেছে তাদের মনের গঠন। আজ এত বছর পর আমাদের দেশ এবং দেশের শৈশব যে মেরুকরণে দাঁড়িয়ে রয়েছে, সেখানে বোধহয় বড্ড প্রয়োজন হয়ে পড়ছে আরও একটা ‘রংমশাল’ জ্বালানোর।

গ্রন্থঋণঃ

প্রবন্ধ সংগ্রহ, সিদ্ধার্থ ঘোষ।

 

 

Developed by DXDasia