পাহাড়ে গাড়ি চালিয়ে নজির গড়ছেন এই মহিলা

ছিরিং ডোমা শেরপা এখন সিকিমে একটি পরিচিত নাম

পর্যটকরা সিকিমে বেড়াতে আসেন। পর্যটকদের নিয়ে গাড়ি চালানোর সময় গাড়ি দেখেশুনে চালানো উচিৎ। কেউ গাড়ি চালানোর সময় যেন মদ্যপান না করেন। কারো মুখে যেন না থাকে নেশার ট্যাবলেট। সিকিমের রাজধানী গ্যাংটকে এভাবেই গাড়ি চালানোর ফাঁকে চালকদের মধ্যে নেশার বিরুদ্ধে প্রচার শুরু করে দিয়েছেন এক মহিলা। ৩৩ বছর বয়স্কা ঐ মহিলাকে নিয়ে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের পর্বে বেশ আলোচনা শুরু হয়েছে। মহিলাদের নিয়ে নানারকম সামাজিক কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘সিনি’র কর্মকর্তা শেখর সাহা এই মহিলার এই রকম কাজকে কুর্নিশ জানান।

মহিলার নাম ছিরিং ডোমা শেরপা। বাড়ি গ্যাংটকের গুরুতুক হেলিপ্যাডের কাছে। বহুদিন ধরে ছিরিং স্বামী পরিত্যক্তা। তাঁর এক সন্তান আছে। তাঁকে তিনি স্কুলে পড়ান। অষ্টম শ্রেণী পাশ করা ছিরিং সাত-আট বছর আগে স্বামী পরিত্যক্তা হওয়ার পর বেশ মুষড়ে পড়েন। ঐ বিদ্যা নিয়ে কোথায় কী কাজ করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। শেষে সিদ্ধান্ত নেন, গাড়ি চালানো শিখবেন। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গ্যাংটকের একটি মোটর ট্রেনিং স্কুলে দুই মাস গাড়ি চালানো শেখেন। আর তারপর গাড়ি নিয়ে নেমে পড়া।

সিকিম মানেই পর্যটন। আর পর্যটকদের সঙ্গে ভাল ব্যবহার করে তাদের অতিথিরূপে সুন্দর মর্যাদা দিয়ে তিনি চার চাকার গাড়ি চালানো নিয়ে মেতে পড়েন। ন্যায্য ভাড়া তিনি নেন পর্যটকদের কাছ থেকে। গ্যাংটক থেকে শিলিগুড়ি বা বাগডগরা বিমানবন্দরে পর্যটকদের নামিয়ে আবার গ্যাংটকে ফিরে যাওয়া। শুধু গ্যাংটক থেকে শিলিগুড়ি পর্যন্ত পর্যটকদের নিয়ে আসা নয়, সিকিমের বাবা মন্দির বা ছাঙ্গু লেক পর্যটকদের ঘুরিয়ে চলেছেন তিনি। হাসিমুখে এই কাজ দিনের পর দিন চালিয়ে দেশ বিদেশের পর্যটকদের কাছেও তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে। উত্তরবঙ্গের ভ্রমণ ব্যবসায়ী বাপন মণ্ডল বলেন, ছিরিং শেরপার এই ধরনের গাড়ি ড্রাইভিং ও সামাজিক সচেতনতার প্রচার নারী দিবসে সত্যি একটি দৃষ্টান্ত।

এখন ওয়াগনার গাড়ি চালান ছিরিং। মাসে রোজগার ত্রিশ হাজার টাকা। তাঁর কথায়, স্বামী ছেড়ে চলে গেছে বলে মেয়েদের হেরে গেলে চলবে না। নিজেরা লড়াই করলেই মেয়েরা নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে। নিজের সম্মান বাঁচিয়ে সততার সঙ্গেই মেয়েরা তাদের কাজ করতে পারে।

পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তায় গাড়ি চালানো যে কোনো চালকের পক্ষে রীতিমতো সতর্কতা এবং ঝুঁকির বিষয়। চারদিকে নারী ধর্ষণ চলতে থাকায় অপরিচিত যাত্রীদের সঙ্গে মহিলা চালকের একা বেরিয়ে যাওয়া ভয়ের বিষয় নয় কি, প্রশ্ন করলে ছিরিং বলেন, ভয়ের কী আছে? দুই একবার দুই একজন যাত্রী একটু বিরক্ত করেছে। তাছাড়া কখনও অসুবিধে হয়নি তেমন। যদিও নিরাপত্তার স্বার্থে এবারে তিনি একটু ক্যারাটে শিখে নিতে চান। তবে তাঁর কাছে চিন্তার হল, কিছু চালক পর্যটকদের কথা চিন্তা না করে গাড়ি চালানোর সময় মদ্যপান করে। নেশার ট্যাবলেট খেয়ে থাকে। এর বিরুদ্ধে ছিরিং সচেতনতার প্রচার করেন। ছিরিং আরও বলেন, শিক্ষিত কোনও মহিলা যদি কাজ না পান আর তার কাছে গিয়ে গাড়ি চালানো শিখতে চান তবে তিনি বিনে পয়সায় তাঁদের তা শেখাতে চান। তাঁর বোনের স্বামী মারা গেলে বোনকেও গাড়ি চালানো শিখিয়ে রীতিমতো গাড়ি কিনে দিয়েছেন তিনি। আজ তাঁর বোনও স্বনির্ভর। ছিরিং-এর বক্তব্য, মেয়েরা বিমান চালাতে পারলে চারচাকার গাড়ি কেন চালাবে না? প্রথমে অনেক পুরুষ চালকরা তাঁকে বিরক্ত করেছে। বলেছে, মেয়েরা আবার কেন গাড়ি চালাবে? কিন্তু তিনি সেসবে পাত্তা না দিয়ে গাড়ি চালিয়ে গিয়েছেন। সিকিমের মুখ্যমন্ত্রী সিকিমে তাঁকে গাড়ি চালানোর স্বাধীনতা দেওয়ায় তিনি তাঁকেও ধন্যবাদ জানাতে ভোলেননি।

Developed by DXDasia