
শিলিগুড়ি মহকুমার বিধাননগর মুরালিগঞ্জ হাই স্কুলএর এই বিস্ময়কর অগ্রগতি সত্যিই প্রশংসনীয়
চা বাগান এলাকার মধ্যে, পিছিয়ে পড়া অঞ্চলে থাকা একটি সরকারি স্কুল। আর সেই স্কুলই রাজ্য ছাড়িয়ে দেশের কাছেও উঠে এসেছে একটি উদাহরণ হিসেবে। শিলিগুড়ি মহকুমার বিধাননগর মুরালিগঞ্জ হাই স্কুল। আর এই স্কুলের সাফল্যের কারণ হিসেবে সেখানকার প্রধান শিক্ষক সামসুল আলম একটাই কারণ তুলে আনছেন – সদিচ্ছা।

চারপাশে চা বাগান। আদিবাসীদের বাস সেখানে। চা বাগানের আশপাশে গ্রাম এলাকাতেও পিছিয়ে পড়া মানুষজনের বসবাস। বহু পরিবারের প্রধানদের কাছে পড়াশোনা করাটা একটা বিলাসিতা ছাড়া আর কিছু নয়। সেই এলাকায় দুই একটি বেসরকারি মিশনারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুল আছে। কিন্তু তাতে সকলের জায়গা হয় না। তবে এই রকম মধ্যে থাকা একটি সরকারি স্কুলকে গোটা রাজ্যে মডেল স্কুল হিসাবে গড়ে তোলা যায়? যায় যে, প্রমাণ করল বিধাননগর মুরালিগঞ্জ হাই স্কুল।
বর্তমান প্রধান শিক্ষক সামসুল আলম ২০০৪ সালে স্কুলটিতে প্রধান শিক্ষক হিসাবে কাজে যোগ দেন। স্কুলটি তৈরি হয় ২০০০ সালে। তখন ছিল ভাঙাচোরা। কেউ সেখানে পড়তে চাইত না। এমনকি প্রধান শিক্ষক হিসাবেও কেউ সেখানে যোগ দিতে চাইতেন না। ২০০৪ সালে সামসুলবাবু সেখানে কাজে যোগ দেওয়ার আগে দুজন প্রধান শিক্ষকের সেখানে নিয়োগ হলে ওই স্কুলে যেতে আগ্রহ দেখাননি তাঁরা। কিন্তু শিলিগুড়ির একটি সাধারণ স্কুলের সহ শিক্ষক হিসাবে কাজ করতে থাকা সামসুলবাবু মুরালিগঞ্জ স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসাবে দায়িত্বকে চ্যালেঞ্জ হিসাবে নেন। সেই সময় স্কুলটিতে কাগজ কলমে ১৬৫ জন ছাত্রছাত্রী থাকলেও নিয়মিত ৮০জন মাত্র যাতায়াত করত। ২০১০ সালে স্কুলটি উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে উন্নীত হয়। আজ সেখানে ছাত্রছাত্রীদের সংখ্যা ১৯০০। শুধু ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা যে সেখানে বেড়েছে তা কিন্তু নয়, শিক্ষার গুণগত মান, নিয়ম সহ আরও বহু কারণে সেই স্কুল আজ গোটা রাজ্যে একটি মডেল। গোটা দেশের বহু শিক্ষানুরাগী মানুষের কাছেও এই স্কুল আলোচ্য বিষয়। জার্মানি সহ পৃথিবীর ১৩ দেশের শিক্ষানুরাগী মানুষ এই স্কুল পরিদর্শন করে তারিফ করে গিয়েছেন। তাঁরা তাদের দেশের স্কুলেও এই স্কুলের কিছু নিয়ম চালু করার আগ্রহ প্রকাশ করে গিয়েছেন।

স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের হাত ধোয়ার বিশেষ পদ্ধতি আছে। ছেলেমেয়েরা প্রত্যেকে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকে। স্কুলের শৌচালয় সঠিক নিয়ম মেনে তৈরি করা হয়েছে। নিয়ম মেনে প্রার্থনা সভা বসে। শিক্ষক শিক্ষিকারা কেউ প্রাইভেট টিউশন করেন না। স্কুলই তাঁদের ধ্যানজ্ঞান। স্কুলে আছে সুন্দর একোয়ারিয়াম। মাছের পুকুর। জৈব পদ্ধতিতে চাষবাসের ব্যবস্থাও রয়েছে এই স্কুলে।
প্রধান শিক্ষকের কথায়, স্কুলকে তাঁরা চাইল্ড ফ্রেন্ডলি করেছেন। স্কুলে এলে বন্ধু পাওয়া যাবে – এই নেশায় ছাত্রছাত্রীদের টেনে এনেছেন তাঁরা। রাজ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষাতেও এই স্কুল নজর কাড়তে শুরু করেছে। যাদের পড়ার বই নেই তাদের জন্য স্কুল আছে। বইয়ের অভাবে কারো পড়া আটকে যায় না। স্কুল থেকে প্রত্যেকের বইয়ের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। তার জন্য বিশেষ ফান্ডের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। এত সব ব্যবস্থাপনার জন্য এই স্কুল যামিনী রায় পুরস্কার এবং শিশু মিত্র পুরস্কারও পেয়েছে। জাতীয় শিশু বিজ্ঞান উৎসবেও এই স্কুল বিশেষ সুনাম অর্জন করেছে। আদর্শ স্কুলের জন্য সরকারিভাবে এই স্কুলের ওপর তথ্যচিত্র তৈরি হয়েছে।

স্কুল থেকে পাশ করা অনেকেই এখন ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে। কেউ বা কলকাতায় নামী বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর পাঠরত। প্রধান শিক্ষক জানান, শীঘ্রই স্কুলে হস্টেল চালু করতে চাইছেন তাঁরা। বিভিন্ন মানুষ আজ এই স্কুলের কর্মকাণ্ড দেখে সহযোগিতার জন্য এগিয়ে এসেছেন। আশা করা যায়, ভবিষ্যতেও অমলিন থাকবে এই স্কুলের অগ্রগতি।
