উত্তরবঙ্গের আদিবাসীদের ক্যারাটে শেখাচ্ছেন উদিল কারজী

ছাত্রছাত্রী হিসাবে যোগ দিয়েছেন পৃথিবীর অন্যতম ক্ষুদ্র জনজাতি হিসাবে চিহ্নিত টোটোরাও

আত্মরক্ষার্থে এ এক অন্যরকম প্রয়াস। উত্তরবঙ্গের আদিম জনজাতিদের অনেকেই এখন তাঁদের প্রাচীন নাচগানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ক্যারাটে ও বক্সিং শিখছেন। পিছিয়ে পড়ার যন্ত্রণা থেকে বেরিয়ে আসতে সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে যেমন তাঁরা এগিয়ে যেতে চাইছেন তেমনই শত্রুর আক্রমণ থেকে নিজেদের বাঁচাতে ক্যারাটে ও বক্সিং শিখছেন তাঁরা। আর এই শেখার তালিকায় ছাত্রছাত্রী হিসাবে পৃথিবীর অন্যতম ক্ষুদ্র জনজাতি হিসাবে চিহ্নিত টোটোরাও যোগ দিয়েছেন।

গত নভেম্বর মাসের ১৯, ২০ ও ২১ তারিখে ডুয়ার্সের বানারহাট থানার গারো বস্তিতে এমনই এক ক্যারাটে প্রশিক্ষণ শিবির হয়ে গেল। নর্থবেঙ্গল স্পোর্টস ক্যারাটে এসোসিয়েশন সেই শিবিরের আয়োজন করে। আর সেখানে সব শেখানোর ভার ছিল শিলিগুড়ি মহকুমার মাটিগাড়া থানার তালুকজোতের মেচ শিক্ষক উদিল কারজী-র ওপর। শিলিগুড়ি থেকে ডুয়ার্সের জঙ্গলের ধারে গিয়ে একসঙ্গে বিভিন্ন আদিম উপজাতির পনেরজনকে ক্যারাটে শেখালেন উদিল। শিবিরে রাভা জনজাতির সাত জন, মেচ পাঁচজন, টোটো দুইজন ছাড়া অন্য আদিবাসী ও নেপালিরা উপস্থিত ছিলেন ছাত্রছাত্রী হিসাবে। যারা শিখছেন তাঁদের মধ্যে শালকুমারের সেভক কারজী, পূর্ণিমা কারজী, শ্যামলী রাভা, পরিমল কারজী ছাড়া আরও কয়েকজন রয়েছেন। তাঁরা কেউ মেচ নাচ ও গানের সাহায্যে ক্যারাটে শিখছেন, কেউ আবার রাভা গান ও নাচের সঙ্গে। 

নর্থবেঙ্গল স্পোর্টস ক্যারাটে এসোসিয়েশনের সভাপতি উদিল জানালেন, জঙ্গলের ধারেই বেশি থাকে এই আদিম জনজাতিরা। জঙ্গলে প্রায়ই বন্য জন্তু বের হয়। তাছাড়া অনেক মানুষও আদিম জনজাতির মেয়েদের ওপরও আক্রমণ করছে। তাঁদের সম্মান নষ্ট করছে। তাই তাঁরা আত্মরক্ষার্থে বেশি করে ক্যারাটে ও বক্সিং শেখার ওপর জোর দিচ্ছেন। এর মাধ্যমে তাঁদের আদিম সংস্কৃতি ও নতুন প্রজন্মের মধ্যে যেমন বাঁচছে তেমনি তাঁরাও আরও শক্তিমান হয়ে উঠছেন। শিখছেন কুংফু, মার্শাল আর্ট সহ আরও অনেক রকম আত্মরক্ষার কায়দা। চলতি ডিসেম্বরেই শেষের দিকে শালকুমারহাটের মেচ বস্তিতে এরকম আর একটি শিবির বসবে। তারপর জানুয়ারি মাসে টোটোপাড়ায় আবার একটি শিবির বসবে বলে জানালেন উদিল। 

৪৭ বছর বয়স্ক উদিল কারজী বেনারস থেকে ফিফথডন ব্ল্যাক বেল্ট পাশ করে এসেছেন ২০১৫ সালে। তার বাইরে ক্যারাটে ও বক্সিং-এর তালিম তাঁর অনেক জায়গা থেকে নেওয়া আছে। উদিল আসলে মেচ সম্প্রদায়ের। বেশ কয়েক বছর আগে মেচদের সংস্কৃতি বিকাশে একটি টিম গঠন করেছিলেন। নাম দিয়েছিলেন বরো ডেভেলপমেন্ট এসোসিয়েশন। ছাত্র হয়েছিল ২০০ জন মেচ সম্প্রদায়ের মানুষ। শিক্ষক ছিলেন চার জন। কিন্তু কিছুদিন চলার পর টাকার অভাবে তা বন্ধ হয়ে যায়। মেচ ভাষায় ভালো গানও গাইতে পারেন উদিল। কিন্তু টাকার অভাব ও উপযুক্ত ছাত্রের অভাবে তা বন্ধ করে দিতে হয়। তারপর উদিল পাশ্চাত্য সংস্কৃতি নিয়ে মেতে ওঠেন। তার সঙ্গে ক্যারাটে ও বক্সিং। তবে এখন আদিম জনজাতিদের নাচগানের সঙ্গে ক্যারাটে ও বক্সিং শেখাচ্ছেন। উদিল জানালেন, টোটোপাড়ার বকুল টোটো, অশোক টোটো, ভবেশ টোটোরা তাঁর কাছ থেকে ক্যারাটে তালিম নিয়েছেন। তাঁরা এখন মিউজিকেল ক্যারাটের ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছেন।

Developed by DXDasia