
তীব্র গ্রীষ্মের দাবদাহে মৃতপ্রায় অজয় নদ ধীর লয়ে বয়ে চলেছে। বালিয়াড়ির আস্তরণ সাদা চাদরের মতো তাকে ঢেকে রেখেছে। উজ্জ্বল নীলাভ আকাশ তলে উন্মুক্ত ধানক্ষেতের কোণে দাঁড়িয়ে থাকা নাম না জানা গাছের নিচে এক কৃষক বিশ্রাম নিচ্ছে। তার পাশ দিয়ে টুকটুক করে এগিয়ে চলেছে টোটো। এমন আবহে দূর থেকে ভেসে আসা মেঠো সুরে এক সাধক গেয়ে চলছেন, “আজ বনের ও বনের ফুল তুলে গো, রাধা-কৃষ্ণের গলে বনমালা।” সাধকের কণ্ঠে সম্মোহিত মরমী মায়া গ্রীষ্মের অপরাহ্নকে যেন শ্রাবণের বারিধারায় শীতল করে দিয়ে যায়। সাধকের নাম লাল্টু পটুয়া (Laltu Patua)। বয়স ৬৪। বিগত ৪৭ বছর ধরে বীরভূম জেলার বুকে পটচিত্রের গান-এর ঐতিহ্যকে নিজের কণ্ঠে ধরে রেখেছেন। মূলত আজও বাড়ি বাড়ি গিয়ে পট দেখিয়ে ও গান গেয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন তিনি। তাঁর অনুপম তুলির টানে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে শ্রীকৃষ্ণ থেকে মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য। শিল্পসত্তার মধ্যে দিয়ে পৌরাণিক ভগবানেরা রূপকল্পে লোকজ হয়ে মনের মানুষ হয়ে ওঠেন।
বর্তমান সময়ে পটচিত্রের কথা উঠলেই অবিভক্ত মেদিনীপুরের পিংলার নয়া আমাদের মানসপটে ভেসে ওঠে। বিশ্বমঞ্চেও নয়া নিজের উজ্জ্বলতা ছড়িয়ে চলেছে। কিন্তু একটা সময় ছিল যখন অবিভক্ত বঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে পটচিত্র শিল্প সাড়ম্বরে বিরাজ করত। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল কলকাতার কালীঘাটের পটচিত্র শৈলী। কিন্তু কালের করাল গ্রাসে সেসব এখন ইতিহাসের পাতায় স্থান পেয়েছে। বর্তমানে বিক্ষিপ্তভাবে মেদিনীপুরের অন্যত্র, রাঢ় অঞ্চল ও অবশিষ্ট বাংলার হাতে গোনা কয়েকটি জায়গায় পটচিত্রের ক্ষয়িষ্ণু ধারা লক্ষ্য করা যায়।
এই শিল্পধারা দিয়েই তিনি এতদিন সংসার চালিয়েছেন। অন্য কোনো পেশায় তাঁর মন বসেনি। উৎসবের সময় বিভিন্ন গ্রামীণ মেলায় পটের গান গেয়ে বেড়ান। চড়কের সময় মুর্শিদাবাদের বহরমপুর, রথের সময় দুবরাজপুর ও দুর্গাপুর, পৌষসংক্রান্তিতে কেন্দুলির জয়দেবের মেলায় শিল্পীর মরমী কণ্ঠে মোহিত হয় মানব মন।
প্রতিটা শিল্পকলার ব্যবহারিক দিক রয়েছে। এই ব্যবহারিক দিকটা না থাকলে সংশ্লিষ্ট সেই শিল্পধারার চর্চা ও প্রয়োগ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে পটুয়ারা কাঁচা মাটির রঙিন দুই খোল ছাঁচের পুতুল মূলত শিশুদের মনোরঞ্জনের জন্যই তৈরি করে থাকেন। শিশুরা মাটির পুতুল দিয়ে না খেললে এই লোকশিল্প ধারার পূর্ণ সার্থকতা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তখন সেটি কেবল সংগ্রাহকদের ঘর সাজানোর নিরস উপকরণ হয়ে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে। ঠিক তেমন ভাবে পটচিত্র অঙ্কন করে সেটি বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে দেখিয়ে ও গান গেয়ে অর্থ উপার্জনের মধ্যে দিয়েই এই শিল্পশৈলী পূর্ণমাত্রায় সার্থক হয়ে ওঠে। কিন্তু বর্তমান সময় কলমদানি, কফি মগ, শাড়ি, পাঞ্জাবি, কুর্তা, টি-শার্ট, টি-ট্রের মধ্যে পটচিত্র অঙ্কন করে এই শিল্প ধারার পূর্ণতাকে টিকিয়ে রাখা যাচ্ছে না। এমনকি শুধু পটচিত্র অঙ্কন করে এবং নির্দিষ্ট প্রদর্শনী কক্ষে অতিথিদের জন্য তা দেখিয়ে ও গান গেয়েও এই শিল্পের প্রাথমিক শর্তকে বজায় রাখাটা দুরূহ হয়ে যাচ্ছে। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে দাঁড়িয়ে এই শিল্পের পূর্ণতাকে বজায় রেখেছেন বীরভূম জেলার ইটাগড়িয়া গ্রামের চিত্রকর পাড়ার বরিষ্ঠ শিল্পী লাল্টু পটুয়া। নিজে হাতে পট অঙ্কন করে সেটি স্থানীয় বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে দেখিয়ে এবং গান গেয়ে এই শিল্পের ধারাকে সঠিক অর্থে বাঁচিয়ে রেখেছেন তিনি। পটচিত্রের মধ্যে থাকা লোকশিক্ষার ধারাকে তিনি বজায় রেখেছেন। আজও এই রোদে পায়ে হেঁটে বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে পটের গান শোনান। পিতা কাদের পটুয়ার কাছে পটচিত্রের অঙ্কন এবং গায়ন শৈলীর প্রাথমিক পাঠ নিয়েছিলেন। তারপর দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম তার নির্মিত পটচিত্রের শৈলীকে আরও সমৃদ্ধ করে তুলেছে। কলির চলন দেখেই পট আঁকেন তিনি। আর গানের সময়সীমা পটচিত্রের নির্মাণের ওপর নির্ভর করে থাকে বলে জানিয়েছেন এই বর্ষীয়ান শিল্পী। লাল্টু পটুয়ার কথায় গানের সময়সীমা পটের উপর নির্ভর করে। কোন গানের সময়সীমা হতে পারে কুড়ি মিনিট আবার কখনও এক ঘণ্টা। শিল্পীর কথায় এই শিল্পধারা দিয়েই তিনি এতদিন সংসার চালিয়েছেন। অন্য কোনো পেশায় তাঁর মন বসেনি। উৎসবের সময় বিভিন্ন গ্রামীণ মেলায় পটের গান গেয়ে বেড়ান। চড়কের সময় মুর্শিদাবাদের বহরমপুর, রথের সময় দুবরাজপুর ও দুর্গাপুর, পৌষসংক্রান্তিতে কেন্দুলির জয়দেবের মেলায় শিল্পীর মরমী কণ্ঠে মোহিত হয় মানব মন। মেলায় গান শোনানোর সময় সঙ্গে থাকেন নাতনি। গানের সঙ্গে ঢোল বাজায় সে।

লাল্টু পটুয়ার সরল তুলির টানে সাবলীল হয়ে ওঠে পৌরাণিক ভগবানেরা। দেবত্বের মহিমা থেকেও বেশি দ্বিমাত্রিক নম্রতায় উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন। “দেখামাত্রই ভালো লেগে যাওয়া” এই ধারণাকে সত্যি করে দেখিয়েছে লাল্টু পটুয়ার তৈরি পটচিত্র। কোনও প্রকারের জটিল আঙ্গিক নেই। তার তৈরি পটচিত্র তীব্র নগরকেন্দ্রিক বাণিজ্যকরণ থেকে স্বতন্ত্রতা বজায় রেখেছে। পটচিত্র আঁকার সময় নিজের তৈরি ভেষজ রং ব্যবহার করেন। সাদা কাগজের ওপর পটচিত্র আঁকা হয়। ঠিক তার পেছনে কাপড় জড়িয়ে দেওয়া হয়। এতে করে পটচিত্রের মূল আঁকাটিকে সংরক্ষিত করা হয়ে থাকে। তাঁর অঙ্কিত এক একটি পটচিত্রের উচ্চতা প্রায় চোদ্দ ফুট। তুলির টানে রাজা হরিশচন্দ্র, রাজা দশরথ, সিংহবাহিনী মহিষাসুরমর্দিনী বাঙ্ময় হয়ে ওঠেন। শিল্পীর কথায় চৈত্র মাসে মা বাসন্তীর পুজো হয়ে থাকে। সেই জন্য তিনি এঁকেছিলেন মা সিংহবাহিনী রূপ পালা। আবার রথের সময় গৌরাঙ্গ প্রভু পালা পটচিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরেন তিনি। চৈতন্যদেবের জীবন বৃত্তান্তের ওপর তার নির্মিত দুটি পটচিত্রের দেখা আমরা পাই। প্রথম পটচিত্রতে নিমাই পণ্ডিতের সন্ন্যাস নেওয়ার আগের জীবনের কথা তুলে ধরা হয়েছে। অপর আরেকটি পটচিত্রে সন্ন্যাস নেওয়ার পর শ্রীক্ষেত্র পুরীতে গিয়ে মহাপ্রভুর লীলা মাহাত্ম্য মনের আবেগ মিশ্রিত ভক্তি রসের অঙ্কিত করেছেন লাল্টু পটুয়া। জগন্নাথ মূর্তিতে বিলীন হওয়ার আগের মুহূর্তটি ব্যক্ত করতে গিয়ে শিল্পীর গলা ভক্তির ভাবরসে কেঁপে ওঠে। এছাড়া রামায়ণ, মহাভারতের মহাকাব্যিক গাঁথা লাল্টু পটুয়া তার পটচিত্র নির্মাণে প্রস্ফুটিত করেছেন। দশরথের বীরত্ব ও ভগবান শ্রীরামের জন্ম বৃত্তান্ত পটচিত্র অঙ্কনে তুলে ধরতে গিয়ে মহাকাব্য সম্পর্কে শিল্পীর প্রজ্ঞতার পরিচয় পাওয়া যায়। অন্যদিকে লৌকিক দেবী মনসা ও শীতলার মহিমা শিল্পী নিজের পটচিত্র অঙ্কন ও গায়নে অক্ষয় করে রেখেছেন। লাল্টু পটুয়া সংগ্রাম করেও আজও এই শিল্পধারাকে টিকিয়ে রেখেছেন। সংগ্রামের এই পথে শিল্পী পেয়েছেন তার সহধর্মিনী সালেমা পটুয়ার পূর্ণ সমর্থন।
পটচিত্র আঁকার সময় নিজের তৈরি ভেষজ রং ব্যবহার করেন। সাদা কাগজের ওপর পটচিত্র আঁকা হয়। ঠিক তার পেছনে কাপড় জড়িয়ে দেওয়া হয়। এতে করে পটচিত্রের মূল আঁকাটিকে সংরক্ষিত করা হয়ে থাকে। তাঁর অঙ্কিত এক একটি পটচিত্রের উচ্চতা প্রায় চোদ্দ ফুট।
বিশিষ্ট লোকসংস্কৃতি গবেষক তারাপদ সাঁতরার লেখা বই ‘পশ্চিমবঙ্গের লোকশিল্প ও শিল্পী সমাজ’ থেকে আমরা জানতে পারি, “প্রথমদিকে পট আঁকা হতো তালপাতায়, তারপর কাপড়ের ওপর পট আঁকা শুরু হয়, যাকে সে সময় বলা হত কাঁথাপট। শেষে হাতে তৈরি কাগজের ওপর এবং পরবর্তী হালফিল কাগজের ওপর আকার রেওয়াজ শুরু হয়।” তারাপদ সাঁতরা দেখিয়েছিলেন, “পটুয়া-চিত্রকর সম্প্রদায় তিন ধরনের পট তৈরি করে থাকেন। এর মধ্যে একটি হল, দেবমাহাত্ম্য বা সামাজিক নানা কাহিনি নিয়ে তৈরি লম্বাটেভাবে জড়ানো পট, দ্বিতীয়টি হল আড়াআড়িভাবে তৈরি জড়ানো পট এবং শেষেরটি হলো চৌকো পট যা যাদুপট বা চক্ষুদান পট হিসেবে ব্যবহৃত হয়।”
বীরভূমের পটচিত্রের ঐতিহ্য ও পটের গান সম্পর্কে বলতে গিয়ে বিশিষ্ট লোকসংস্কৃতি গবেষক অধ্যাপক ড. সমীপেষু দাস জানিয়েছেন, “বীরভূমের পট ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্প যা এখনও পর্যন্ত আধুনিকতার স্পর্শশূন্য এক অনন্য উপাদান। এই জেলায় পটের দুটি ধারা রয়েছে। একটি শুধুই ‘পটচিত্র’ ও অন্যটি ‘পটের দুর্গা’। দ্বিতীয় ধারাটি কেবলমাত্র দুর্গাপুজোর সময়েই আঁকা হয় এবং সেই পটেই পুজো করা হয়। প্রথম ধারাটির মধ্যে বীরভূমের ইটাগড়িয়া, ষাটপলসা, ভ্রমরকোল ইত্যাদি গ্রামের পটচিত্র রয়েছে। মূলত দীঘল বা জড়ানো পট ও পটুয়াগান একই সঙ্গে এখানে বয়ে চলেছে। সেকাল থেকে প্রচলিত রামায়ণগান, মহিষাসুরবধের পালা, গৌর-নিতাই-আখ্যানের পাশাপাশি বৃক্ষরোপণ, সর্বশিক্ষা অভিযান, নারীস্বাতন্ত্র্যের মতো সমকালীন ভাবনাও এখানে ফুটে ওঠে। বাণিজ্যিকভাবে এই লোকায়ত শিল্পের প্রসার সেরূপ না ঘটায় এই পটচিত্র বর্তমানেও ‘পট’ই হয়ে রয়েছে; তার কারণ রাসায়নিক রং বা মনোমুগ্ধকর উপাদান এখানে যুক্ত হয়নি। আঁকার শৈলিতেও সরল ও সহজাত প্রবৃত্তিই ধরা পড়ে। ফলে জ্যামিতিক দৃষ্টিকোণের সাপেক্ষে এই পটের মাননির্ণয় করা উচিত নয়। …এই পটের গানের মধ্যেও একটি সুরের চলন বর্তমান যা এক জেলার সঙ্গে অন্য জেলার পার্থক্য সহজেই তুলে ধরতে পারে। তাই এই সুরসহযোগে গানগুলিও বাংলার এক সম্পদ। বাংলার লোককৃষ্টির আঙিনায় অবশ্যই পটুয়াগানের চর্চা হওয়া উচিত।”
বেলা ফুরিয়ে আসে, সূর্য পশ্চিম দিকে ঢলে পড়ে। ঠিক সেই সময় লাল্টু পটুয়ার মলিন ফতুয়ায় আবৃত শরীরের কণ্ঠ থেকে আবেগমথিতভাবে বেরিয়ে আসে, “জয় জগন্নাথ, জয় করো বাবা বলরামের দয়।” মুখের পেশিতে বার্ধক্যের ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কাঁধ পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা সাদা চুল ও গাল ঢেকে যাওয়া সাদা দাড়ি প্রজ্ঞতার পরিচয় বহন করে চলেছে। খর্বকায় শরীরে পরিশ্রমীর ভাব স্পষ্ট। আর সেই পরিশ্রমের বলেই তিনি নিজেকে সাধকে পরিণত করেছেন। এক পরিপূর্ণ শিল্পসত্তার প্রতীক হয়ে উঠেছেন, যাতে আজও মোহিত গ্রামীণ বাংলা।

