কন্যাভ্রূণ হত্যা হয়ে উঠুক বিশ্বের জঘন্যতম অপরাধ

কন্যাভ্রূণ হত্যার বিপরীতে আশার আলো দেখাচ্ছে কন্যাসন্তান দত্তক নেওয়ার সংখ্যা বৃদ্ধি

“বয়স ৪০, গায়ের রং শ্যামলা, বাঁদিকের গালে একটা কাটা দাগ আছে। নিখোঁজের সময় পরনে নীল রঙের জামা এবং কালো প্যান্ট ছিল।…”

খবরের কাগজের দুই নম্বর পাতায় প্রায়শই নজর পড়ে এমন ছোটো বড়ো বেশ কিছু ‘সন্ধান চাই’ বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনের সঙ্গে কিছু কিছু ক্ষেত্রে থাকে আর্থিক পুরস্কারের প্রসঙ্গও। পুলিশ, প্রশাসন থেকে সাধারণ মানুষ, সকলের তৎপরতায় এদের বেশিরভাগ জনের হয়তো খোঁজও মেলে। জীবিত না হোক নিদেনপক্ষে মৃত তকমা জুটে যায় তাদের। কিন্তু ‘নিরুদ্দেশ’ ঘোষণার ট্যাগ লাগিয়ে হাজার খুঁজলেও পাওয়া যাবে না যাদের, তাদের নিয়ে কী বলছে সমাজ?

পৃথিবীর যত জঘন্যতম অপরাধমূলক কাজ আছে তার মধ্যে অন্যতম কন্যাভ্রূণ হত্যা (Female Foeticide or Female feticide)। সারা পৃথিবীতে অল্পবিস্তর এই জঘন্যতম কাজ সংঘটিত হলেও ভারতে কণ্যা ভ্রূণ সংক্রান্ত অপরাধের হার অত্যন্ত বেশি। এর বিরুদ্ধে সরকারি আইন আছে, আদালত আছে, অপরাধের শাস্তি আছে। কিন্তু তারই ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার অপরাধী। একদিকে জন্মগ্রহণ করার পূর্বেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে লক্ষ-লক্ষ কন্যা শিশু। আবার জন্মগ্রহণ করার পরও হত্যা করা হচ্ছে কন্যা শিশুকে।

২০২১ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত ভারতবর্ষে মোট সন্তান দত্তক নেওয়া হয়েছে ২৯৯১টি। যার মধ্যে ১৯৬৮ জনই কন্যা সন্তান। অর্থাৎ সিংহভাগই মেয়ে। সুতরাং, ধীরে হলেও বদলাতে শুরু করেছে পরিস্থিতি। পরিবর্তন আসছে মানুষের মনে।

রাষ্ট্রসঙ্ঘের জনসংখ্যা বিষয়ক দফতর (ইউএনএফপিএ)-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, সারা বিশ্বে ‘নিখোঁজ’ প্রায় ১৪ কোটি ২০ লক্ষ শিশুকন্যা। কারণ, সেই কন্যাভ্রূণ হত্যা। বিশ্বের পাশাপাশি আশঙ্কাজনক ভারতের পরিস্থিতিও। ইউএনএফপিএ যে তথ্য সামনে এনেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে ভারতে এই সংখ্যাটা প্রায় ৫ লক্ষ ছুঁইছুঁই। ভারতে হরিয়ানা, উত্তরাখণ্ড, দিল্লি, গুজরাট, রাজস্থান, উত্তর প্রদেশ, মহারাষ্ট্র, পাঞ্জাব এবং বিহারের মতো ৯টি রাজ্যে এই পরিস্থিতি বিশেষভাবে শোচনীয় বলে প্রকাশ পেয়েছে রিপোর্টে।  ভারতে প্রতি ৩ জনের মধ্যে ২ জন কন্যা সন্তান হারিয়ে যায় জন্মের পূর্বে ভ্রূণ নির্ধারণের ফলে। সারা বিশ্বের হিসেবে প্রতি বছরে এই সংখ্যাটা অন্তত ১২ কোটি! এমনকি অর্থনৈতিক ভাবে ক্ষমতাবান দেশেও পরিস্থিতিটা ভয়াবহ।

এই এতো এতো আধুনিকতার মোড়কে বাইরে থেকে সমাজটাকে দেখতে যতোই চিকন-চাকন লাগুক না কেন, ভিতরে সেই খড়ের গাদন। মেয়েদের জায়গাটা সমাজে এখনও নড়বড়ে। এতো আন্দোলন, সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে উত্তাল পরিস্থিতি সব কিছুর আড়ালে এখনও মেয়েদের পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক। এমনকি এই করোনা পরিস্থিতিতেও যে হারে মেয়েদের মধ্যে বাল্যবিবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে, তাতে সামগ্রিকভাবে প্রশ্ন উঠছে পরিবারে নারীদের অবস্থান নিয়ে।

তথাকথিত শহুরে ছবিটার দিকে তাকালে ঠাহর করতে একটু অসুবিধা হবে ঠিকই, তবে ইতিহাস সম্পর্কে অবগত থাকলে এটুকু বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, সামাজিক বঞ্চনা ও অসাম্যের নিরিখে মহিলাদের পরিস্থিতি কখনোই ইতিবাচক ছিল না। পাশাপাশি ক্রমাগত বাড়তে থাকা এই কন্যাভ্রূণ হত্যার ফলে সমাজে মেয়েরা যে আরও কোণঠাসা হয়ে পড়ছে, সে কথা সহজবোধ্য। এমনকি সংখ্যালঘু লিঙ্গের প্রতিনিধিত্ব করার ফলে এই চোরাগলি থেকে বেরিয়ে আসার পথগুলোও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ।

বাংলায় এই ছবিটা অবশ্য খানিক অন্য। এর পিছনে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ‘কন্যাশ্রী’র মতো প্রকল্প। এছাড়াও কেন্দ্রের তরফে ‘বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও’ প্রকল্পের ফলেও খানিকটা বদল এসেছে পরিস্থিতিতে। পরিবারে কন্যা সন্তান জন্ম নিলে কেবল লোকসান বলে ভাবতো যারা, তারাও খানিক অন্যরকম ভাবে ভাবতে শুরু করেছে। মাসিক কথবা এককালীন আর্থিক সহায়তা পাওয়ার কারণে বেশ কিছু সদর্থক ফল পাওয়া যাচ্ছে ঠিকই, তবে আখেরে ছবিটা খুব একটা বদলাচ্ছে না। টাকার লোভ দেখিয়ে ঘরে কন্যা সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে যতদিন, ততদিন হয়তো সামগ্রিক বদলটা সম্ভবপর নয়ও।

শুধু ভারতের দিকে তাকালেই দেখা যাবে, ১৯৭৪ সালে প্রথম দিল্লিতে গর্ভাবস্থায় ভ্রূণ নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পরীক্ষাগারে ভ্রুণের লিঙ্গ নির্ণয় করে কন্যাভ্রূণ হত্যা করার ঘটনা আকছার সামনে আসতে থেকেছে। তড়িঘড়ি এ সমস্যা ঠেকাতে আনা হয়েছে নয়া পিএনডিটি (প্রি ন্যাটাল ডায়াগোনস্টিক টেকনিক) আইন। কিন্তু পরিকাঠামো এবং সদিচ্ছা না থাকলে আইনের প্রয়োগ কি সহজ হয়? এরও বেশ কিছু দিন পরে, ১৯৯৮ সালে দু’টি সেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘সিহ্যাট’ ও ‘মাসুম’-এর তরফে সুপ্রিম কোর্টে কন্যাভ্রূণ হত্যার বিরুদ্ধে একটি আবেদন করা হয়। যে আবেদনের ওপর ভিত্তি করে নতুন করে নজরে আসে পিএনডিটি আইনের শিথিলতা। অবশেষে, ২০০৩ সালে এই আইন সংশোধন করে পিসিপিএনডিটি আইন (দ্য প্রি-কনসেপশন অ্যান্ড প্রি-ন্যাটাল ডায়াগোনস্টিক টেকনিকস্ অ্যাক্ট) আনা হয়। বিশেষ প্রয়োজনীয়তা ছাড়া কখনই গর্ভাবস্থায় আল্ট্রাসোনোগ্রাফি করে শিশুর লিঙ্গ প্রকাশ করা যাবে না, বলে জানানো হয় এই আইনে।

এইসব নানা তর্জার মধ্যেই বয়ে চলেছে সময়। গ্রাফের ওঠা নামা নিয়ে বুদ্ধিজীবী মহলে আলোচনারও শেষ নেই। কিন্তু এই এতোকিছুর মাঝে এখনও দিকে দিকে প্রতিনিয়ত আরও কতো কন্যাভ্রূণ হারিয়ে যাচ্ছে। তাই প্রয়োজন তাৎক্ষণিক সাবধানতা। সিঁদুরে মেঘের ছবিটা দেখিয়েই রেখেছেন গবেষকেরা। পাশাপাশি এই মুহূর্তে প্রবণতায় রাশ টানা গেলে হয়তো বদলানো যাবে ছবিটা, এমন কথাও জানাচ্ছেন অনেক চিকিৎসকই।

যদিও এতো নেতিবাচক আলোচনার বিপরীতে একটি চাঞ্চল্যকর তথ্যের কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। কন্যা সন্তান মানেই বোঝা, সম্প্রতি এই চিন্তা-ভাবনার বিপরীতে আশার আলো দেখাচ্ছে একটি পরিসংখ্যান। কন্যাভ্রূণ হত্যার মতো কদর্য চিন্তা ভাবনা থেকে বেরিয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে কন্যা সন্তান দত্তক নেওয়ার সংখ্যা। জানা গিয়েছে, ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত ভারতবর্ষে মোট সন্তান দত্তক নেওয়া হয়েছে ২৯৯১টি। যার মধ্যে ১৯৬৮ জনই কন্যা সন্তান। অর্থাৎ সিংহভাগই মেয়ে। সুতরাং, ধীরে হলেও বদলাতে শুরু করেছে পরিস্থিতি। পরিবর্তন আসছে মানুষের মনে। বদলাতে শুরু করেছে মধ্যযুগীয় চিন্তাভাবনা। আর এই ছোটো ছোটো বদলগুলোই যে একদিন আঁধারের শেষ ডেকে আনতে পারবে, এমনটা বিশ্বাস রাখতে ক্ষতি কি?

 

তথ্যসূত্র –

১। ইউএনএফপিএ-এর রিপোর্ট ২০২১-২২

২। www.thehindu.com

৩। ‘সিহ্যাট’ ও ‘মাসুম’ সংস্থার রিপোর্ট, ১৯৯৮

৪। https://pndt.gov.in/   

৫। বর্তমান পত্রিকা

 

Developed by DXDasia