
কলকাতাকে নিজস্ব ভঙ্গিতে দেখেছিলেন ইংরেজ চিত্রশিল্পীরা। ক্যানভাসে ধরা রয়েছে সেই নিবিড় প্রেমের গল্প
সাদা ক্যানভাস। এক পাশে আস্তে-আস্তে ফুটে উঠছে কংক্রিটের বাড়ি, মানুষ। রেখা যত দৃঢ় হচ্ছে, স্পষ্ট হচ্ছে রাস্তাঘাট, দৈনন্দিন ব্যস্ততা। ইতিউতি কয়েকটা হালকা সবুজের ছোপ আকার নিচ্ছে গাছের। ক্রমশ তৈরি হচ্ছে ছবি, ফুটে উঠছে কলকাতা, তেলরঙে। শিল্পী উইলিয়াম হজেস (William Hodges) ঔপনিবেশের বছরগুলোয় অন্যতম ইংরেজ পেইন্টার। যিনি এই শহরকে ভালোবেসেছিলেন, ভালোবেসে তুলির মাধ্যমে গড়েছিলেন নিবিড় সম্পর্কের রেখা। ভারতবর্ষে এসেছিলেন ওয়ারেন হেস্টিংস-এর রাজত্বের সময়। মূলত ল্যান্ডস্কেপ আঁকার জন্যেই ওঁর এই দেশে পদার্পণ। হজেসের কলকাতা-কেন্দ্রিক আঁকাগুলোর মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে বিখ্যাত ফোর্ট উইলিয়ামের একটি তৈলচিত্র। এঁকেছিলেন ১৭৮১ সালে। সেটিকে আধার বানিয়ে ১২ বছর পর, ১৭৯৩ নাগাদ W. Byrne একটি এনগ্রেভিং শিল্প তৈরি করেন। মহানগরীর সঙ্গে এমন ‘রঙীন’ সম্পর্কে ছিলেন একাধিক ইংরেজ শিল্পী। ধরা যাক থমাস গ্যানিয়েলের (Thomas Ganiell) কথা। ওনার আঁকা ছবি ‘Old Government House’ (পুরনো সরকারি বাড়ি) প্রত্যক্ষভাবে শহরের একটি কর্মচঞ্চল দিন ফ্রেমে বেঁধে দেয়। ব্যাকড্রপে পুরনো সরকারি বাড়ি, পেছনে ধূসর আকাশ, আর ছবির সামনে সাধারণ মানুষের ঢল, বাঁ-পাশে ঘোড়ায় চড়া সান্ত্রী। পুরো চত্বরটাই জীবন্ত হয়ে উঠেছে ওঁর ছবিতে। তবে শিল্প বিশেষজ্ঞরা মনে করেন ওঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ সেন্ট জন গির্জার তৈলচিত্র। ইউরোপের নব্য-সনাতনী স্থাপত্যের নিদর্শন হয়ে এই গির্জাটি সেই ১৭৮৭ সাল থেকে স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে আছে। অধুনা ডালহৌসি স্কোয়ারে লাল দিঘির পাশেই এটির অবস্থান। প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মাত্র এক বছর পরেই, অর্থাৎ ১৭৮৮ সালে, গির্জাটি ক্যানভাসেও ফুটে ওঠে, গ্যানিয়েলের তুলির টানে।
পুরনো সরকারি বাড়ি – থমাস গ্যানিয়েলে
ইংরেজ চিত্রশিল্পীদের কলকাতা প্রেম নিয়ে যখন আলোচনাই হচ্ছে, তখন দুজন মানুষের কথা না বললেই নয়। তাঁরা হলেন থমাস ড্যানিয়েল (Thomas Daniell) আর তাঁর ভাইপো উইলিয়াম ড্যানিয়েল (William Daniell)। থমাস সাহেব নিজের ভাইপো উইলিয়ামকে সঙ্গে নিয়ে কলকাতা পা রাখেন ১৭৮৬ সালে। এসেই এই শহরের মায়াবর্ণে ভেসে যান, ঠিক করেন ছবি আঁকবেন তিলোত্তমা নগরীর। সেই সময়ে ক্যালকাটা ক্রনিকল (Calcutta Chronicle) নামে একটি কাগজে উনি বিজ্ঞাপণ দিয়ে রীতিমতো ঘোষণা করেন উনি শহরের ছবি আঁকবেন। এখানকার রাস্তাঘাট, চরাচর, জীবনবৈচিত্র্যকে ফুটিয়ে তুলবেন ক্যানভাসে। সহযোগী ভাইপো উইলিয়াম। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ১৭৮৮ সালের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে কাকা-ভাইপো একসঙ্গে কলকাতার মোট ১২-টি চিত্রশিল্প আঁকেন, যা আজও শৈল্পিক এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতে অমূল্য সম্পদ। টেকনিকালি ওঁদের শিল্পকর্ম এচিং নামে পরিচিত, যা মূলত কোনও ধাতব প্লেটের ওপরে নানাবিধ আকৃতির খোদাই। তারপরে সেটিকে রঙ দিয়ে স্টেন (stain) করে শিল্পকর্মটি সম্পূর্ণ করা হয়। সেই সময়ের নিরিখে ভারতবর্ষে এমন কাজের নিদর্শন ড্যানিয়েলদের হাত ধরে প্রথম।
র্ফোট উইলিয়াম – উইলিয়াম হজেস
ইংরেজ চিত্রশিল্পীদের রিয়েলিস্ট আঁকায় কলকাতার কেন্দ্রস্থল এসপ্ল্যানেড, চৌরঙ্গি, চিৎপুর বাজার, গঙ্গার ঘাট প্রভৃতি অনেক জায়গাই ফ্রেমে বাঁধা পড়েছে। সেই ছবিগুলোয় ঔপনিবেশিক কলকাতার শিরা-উপশিরা ইউরোপিয়ান দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রবাহিত হয়েছে। এমন অনেক ছবির হদিশ পেতে হলে আপনাকে যেতে হবে ভারতীয় সংগ্রহশালায়। বেশ কিছু ছবি ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সংগ্রহশালাতেও সংরক্ষিত। ইংরেজদের চোখে পুরনো কলকাতা সন্তপর্ণে কাছে আসে এই ছবিগুলোর মাধ্যমে।
আরও পড়ুন
মাটির তলার কলকাতা
সেন্ট জোন গির্জা – থমাস গ্যানিয়েলে
