চা-পানের উপকারিতা

দমদম ষ্টেশনে চায়ের দোকানের এই বিজ্ঞাপনগুলি চা-কে কেন্দ্র করে মানুষের ভাবনা বদলের এক নতুন দিশার কথা বলে

কলকাতার দমদম ষ্টেশনে তিন-চার নম্বর প্ল্যাটফর্মর দিকে রয়েছে একটি চায়ের দোকান। সেই দোকানের আসবাবপত্র থেকে শুরু করে চায়ের কাপ পর্যন্ত যা কিছু রয়েছে তার মধ্যে রয়েছে বিলকুল আভিজাত্যের গন্ধ। সেই দোকানেই চোখে পরবে টিনের পাতের ওপর এনামেল প্রিন্টে ছাপা কয়েকটি চা-বিষয়ক ব্রিটিশ আমলের বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনের দাবি – ইহা খাইতে বেশ সুস্বাদু, ইহাতে কোনও অপকার হয় না, ইহা জীবনী শক্তির উদ্দীপক ও সর্বোপরি ইহাতে মাদকতা শক্তি নাই। এসবের সাথে সাথে চায়ের অতিরিক্ত উপকারিতা বোঝাতে আরও জোরালো ভাবে জানানো হয় যে, ম্যালেরিয়া, টাইফয়েড‌, কলেরা, আমাশা, প্লেগ এবং মানসিক অবসাদ দূর করতেও নাকি এই চায়ের ভুমিকা অকল্পনীয়।

বিজ্ঞাপনে সেদিনের ভারতীয়দের কাছে চা-কে শুধুই আমেজ বা মেজাজের তৃপ্তি সহায়ক পানীয় হিসাবে  তুলে ধরা হয়নি। সে কারণেই  সেদিন রেলপথের যাত্রীরা চা-য়ের ফ্লেভারের বদলে চা-য়ের উপকারিতাকেই বেশী করে জেনেছিলেন এই জাতীয় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে।

বিজ্ঞাপন কটি দেখতে দেখতে আমাদের ফিরে যেতে হয় এক বহুমুখী অতীতের কোলাজে। সন ১৮৯২। ‘আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে’-র রেলপথ পাতা শুরু হল পাহাড়ের বুক চিরে। কুমিল্লা, বদরপুর, আখাউরা-র পর দেখা গেলো রেলপথ বাঁক নিয়েছে লামডিং-র দিকে। আর সাথে সাথে ব্রাঞ্চ লাইন এগিয়ে গেল একদিকে তিসুকিয়া আর অন্য পাশে গৌহাটি পর্যন্ত। এমন ঘটনার কারণ হল আসামের চা বাগান। সেই ১৮২৩ থেকে চলছে এই বাগান আবিষ্কারের কাহিনি। চার্লস ও রবার্ট ব্রুস মুনিরাম দেওয়ানের খাস তালুকে আবিষ্কার করে ফেলেছে ক্যামেলিয়া সিনেনসিস। কলকাতার বোটানিক্যাল বাগানের কর্তারা জানিয়েছেন ওটি আসলে চা-পাতা। সেই সুবাদেই এই রেল পথের প্রসার হচ্ছে। এর পর শুরু হল শ্রমিক নিয়ে যাওয়ার পালা। বিহার আর ওড়িশা থেকে দলে দলে চা-বাগানের পথে পাড়ি দিল শ্রমিকেরা।

এরই মাঝে শুরু হল নয়া জুলুম। চা-বাগানে শ্রমিকদের জীবনকে পরিণত করা হল ক্রীতদাসের জীবনে। ১৯২১ সালে শ্রমিকের মাইনে দৈনিক ৫০ পয়সা আট আনা। হ্যাট-কোট পড়া সাহেবদের অত্যাচারের খবর এবং চা-বাগানে কাজ করতে যাওয়ার হাতছানি দু’ই হাজির হল উত্তর বাঙলার লোকগানে। অবশেষে গান্ধীজীর অসহযোগ আন্দোলনের প্রভাব পড়ল চা-বাগানে। কুলিরা ধর্মঘট শুরু করল। দলে দলে দেশে ফেরার চেষ্টা করল কুলিরা। চা-শিল্পের মালিকদের সাথে হাত মিলিয়ে রেল দপ্তর শ্রমিকদের টিকিট দেওয়া বন্ধ করে দিল, যাতে তাঁরা দেশে না ফিরতে পারে। তখন পায় হেঁটে দেশে ফিরতে চেষ্টা করল অসহায় শ্রমিকেরা। কলকাতার মেয়র যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত নেলি সেনগুপ্ত-রা বিস্তর লেখালিখি আর আন্দোলন শুরু করলেন। এরই মধ্যে ২০ মে ১৯২১। গোয়ালন্দ ষ্টীমার ঘাটে ঘুমন্ত কুলিদের ওপর চলল গুলি বর্ষণ।

প্রতিবাদের ঢল নামল দেশে। আসাম বেঙ্গল রেলের শ্রমিকেরা রেল রাস্তা অচল করে দিল। তরুণ ব্যারিস্টার তুলসিচরন গোস্বামী এগিয়ে এলেন। নির্যাতিত কুলিদের পাশে দাঁড়ালেন রবীন্দ্রনাথের সহযোগী সি এফ অ্যানড্রুজ। বাঙালির মন ভারাক্রান্ত হল। এরকম একটা অবস্থার মধ্যে চা-কর সাহেবরা বুঝলেন বিজ্ঞাপনে কথার ভাঁজে চায়ের গন্ধ চায়ের আমেজ বা চায়ের তৃপ্তির প্রসঙ্গের বাইরে গিয়ে চা কে অন্য ভাবে পেশ করতে হবে। আর তখনই উঠে এলো ম্যালেরিয়া টাইফয়েড কলেরা আমাশা প্লেগ এবং মানসিক অবসাদ দূর করার অলীক প্রচার শব্দ।

রেলের ইংরাজ আমলের ক্যাটারিং কনট্রাক্টর এইচ সি দে দমদমের এই দোকানটি চালাতেন। তিনি বিনি পয়সায় চা ও দিতেন রেল যাত্রীদের। তাঁর সময় থেকেই বিজ্ঞাপনগুলি রয়ে গিয়েছে এখানে। কিন্তু তাতে আজও লুকিয়ে আছে ইংরাজের কথার চাতুরি গুন।

ছবি- শান্তনু দেবনাথ 

Post Tags
Developed by DXDasia