তাসের দেশ, জড়-র দেশ : আমাদের চিন্তার ঘরে কি বোবা তালা পড়ে গেছে?

চলো নিয়ম-মতে।
দূরে তাকিয়ো নাকো,
ঘাড় বাঁকিয়ো নাকো,
চলো সমান পথে।
… … …
ওদিক চেয়ো না চেয়ো না,
যেয়ো না যেয়ো না—
চলো সমান পথে।।

(তাসের দেশ/ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

তাসের দেশ। জড়-র দেশ। তাসের দেশের অধিবাসীরা জড়-ধর্ম পালন করে। কেন? তার উত্তর রবীন্দ্রনাথই দিয়েছেন—দানাপানির লোভ। কোন দানাপানি? ভোগের দানাপানি। কেবলমাত্র দানাপানির লোভ যাদের জীবনের মুখ্য, হয়তো বা একমাত্র উদ্দেশ্য, তারা জড়-ধর্মের অংশীদার হয়ে ওঠে। সেই ‘জড়’-র ‘কৃষ্টি’ই হ’ল সমান পথে চলা। পথ চললেও ‘এগনো’ কিন্তু সেখানে হারাম। এমনকী নিজের ঘাড়টাকেও সমান পথে রাখতে হবে, যাতে এদিক-ওদিক চোখ চলে না-যায়। হাতের স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রটির হাজারও আহ্বানে সাড়া দিতে গিয়ে আমাদের ঘাড়ও ‘তাসের দেশ’-এর মতোই এতটুকু না-হেলে সমান পথে চলা বেছে নিয়েছে। কিন্তু ঘাড় কিভাবে চলে? আসলে ঘাড় যেদিকে থাকে, চোখ তাকে অনুসরণ করে, করতে বাধ্য। আর চোখ যা-দেখে, যেদিকে তাকায়, পা ঠিক সেই পথে চলে। আরও স্পষ্ট করে বললে ঘাড় হল দিকনির্দেশক কম্পাস। পায়ের চাবিকাঠি ঘাড়ের কাছে, চোখের কাছে। ঘাড় যদি ডাইনে-বাঁইয়ে তাকানোর ফুরসত না-পায়, পা কেবলই সমান পথে হাঁটে; হাঁটতে বাধ্য হয়। নিজের পথটুকু ছাড়া, নিজেকে ছাড়া আর সব পথ আর সব দৃশ্য সব ঘটনা অগোচরে রয়ে যায়।

গাজার দুনিয়া যে আমারও দুনিয়া, কিংবা, উত্তরবঙ্গে বন্যায় সর্বস্বান্ত হওয়া মানুষটি যে আমারই নিকটজন, সেই অনুভূতি থেকে ক্রমশ দূরে তলিয়ে যাচ্ছি আমরা।

এ-কেমন কথা? হাতের ওই স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রটায় কি আমরা সারা দুনিয়া দেখি না? সারা দুনিয়ার খারাপ থাকা, ভালো থাকা আমাদের জানান দেয় না যন্ত্রটি? পাশের বাড়ির বন্ধুর খবর সেও তো ওই যন্ত্রই দেয়! তাহলে সোজা পথে তাকিয়ে কি আমরা সারা বিশ্বের পথে হাঁটি না? এরকমই এক ধাঁধায় সম্ভবত পাবলো নেরুদা-ও তলিয়ে গিয়েছিলেন— ‘If all rivers are sweet/ where does the sea get its salt?’ (The Book of Questions: Pablo Neruda)। আর আমরা? তাসের দেশের মানুষেরা? এই ‘প্রশ্ন’ করার হকটাই নেই! প্রশ্ন করলেই তুমি অন্যদলের, তুমি নজরবন্দী। এরই মাঝে দোলদোলানো আমাদের হাতে ধরা মোবাইল ফোনটি। মধ্যগগনের একমাত্র তারা। বোকা-বাক্স একরকমভাবে আমাদের দুনিয়াটা ছোটো  করে এনেছিল। আর এখন সর্বক্ষণের সঙ্গী মোবাইল ফোনটি দুনিয়াটাকে আরও ছোটো আকারে বন্দি করে ফেলছে। অহরহ সংবাদের ঢেউ। স্ক্রল করার সঙ্গে সঙ্গে এক সংবাদ থেকে আরেক সংবাদে পৌঁছে যাচ্ছি। এমাথা-ওমাথা বিনোদনময় সৈকত। ভেসে যাচ্ছি। অনুভূতি কিছুতেই কেটে বসতে পারছে না। গাজার দুনিয়া যে আমারও দুনিয়া, কিংবা, উত্তরবঙ্গে বন্যায় সর্বস্বান্ত হওয়া মানুষটি যে আমারই নিকটজন, সেই অনুভূতি থেকে ক্রমশ দূরে তলিয়ে যাচ্ছি আমরা। মাইক্রোফোনে, রিলস আর ভিডিয়োয় সারাক্ষণ কথা। কথার পালটা কথা। স্বপক্ষে কথা। বিপক্ষে কথা। তবু কেউ কারও কথা শুনতে পাচ্ছি না। কথা তীরে ফিরে এসে এক পলক পার করে আবার স্ক্রল করার সঙ্গে সঙ্গে ভেসে চলে যাচ্ছে। চাপা পড়ছে। সমুদ্রতীর অবধি বর্জ্য-র চিৎকার। জিডিপি ঊর্ধমুখী। তবু বৈষম্য বিষাক্ত রকমে বেড়েই চলেছে। বেড়েই চলেছে। আমরা চলেছি, সমান পথে। আমাদের চোখ সমান-পথে। উঁচু-নিচু ঠাহরই হচ্ছে না। আমাদের চিন্তার ঘরে বোবা তালা পড়ে গেছে। রেনে দেকার্তের— “আই থিঙ্ক, দেয়ারফোর আই অ্যাম” জরুরি কথাটি আজ শুকনো বাসি ফুলের মতো দেওয়ালে ঝুলছে। গন্ধহীন।

তবে আশার কথা, তাসের দেশেও হাওয়ার বেগ আছড়ে পড়ে। পড়েছিল। আর হাওয়ার ঝাপট লাগতে বোঝা গিয়েছিল নিয়মের সোজা রাস্তায় চলেও তাদের ভেতরে হাওয়ার কাঁপনে সাড়া দেওয়ার মতো একটা গোপন তিরতিরে মন রোগা-পাতলা ঝোরার মতোই বয়ে যাচ্ছিল। যে মন নিয়ে মানুষ বিশ্বপ্রকৃতিকে জেনেছে, মহাবিশ্ব অব্দি তোলপাড় করে ফিরেছে, নিজেকে খুঁজেছে, শিল্প-সাহিত্যের বাঁক বদল ঘটিয়েছে; তার মন জড়-ধর্মের রেশ কাটিয়ে ফিরতে চাইবেই। সেই মন পুরোটা কংক্রিট দিয়ে বাঁধানো হলেও একসময় চাঙড় খসে পড়ে। আর সেই ভাঙা-ফাটা চিড়, ফাটলের প্রথম সূত্রপাত রবীন্দ্রনাথ ঘটিয়েছেন মেয়েদের মধ্যে। মেয়েদের বেছে নেওয়ার অর্থ বহুবিধ হতে পারে। এক, পুরুষ-মহিলা অঙ্গাঙ্গি বন্ধনে আবদ্ধ। সেখানে মহিলাদের ভাঙনের পথের শরিক করতে পারলে ভাঙনটা আসলে ‘ঘর’ অব্দি পৌঁছয়। কেননা, দুর্ভাগ্যজনক হলেও এখনও অব্দি আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে মেয়েরাই মূলত ঘর সামলান। আর ঘরের ভাঙন অনেক বেশি আগ্রাসনময়। আগ্রাসনময়, তবু, রক্তের ছিটেফোঁটার আভাস থেকে দূরে। অহিংস। এমনকী মল্লযুদ্ধের উপক্রমটুকু অব্দি সেখানে ঘটে না। দুই, আজও ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশে পুরুষদের তুলনায় মেয়েদের পূর্ণ আত্মমর্যাদায় অধিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্নটি অনেকক্ষেত্রেই দূরের। আর মহিলা-পুরুষ নির্বিশেষে মর্যাদার আসনই শ্রেষ্ঠ আসন, শ্রেষ্ঠ অর্জন। শুধু রবীন্দ্রনাথ নন, রবীন্দ্রনাথের থেকে বছর সাতেকের ছোটো আলেক্সি ম্যাক্সিমোভিচ পেশকভ ওরফে ম্যাক্সিম গোর্কিও প্রায় একইরকম ভেবেছিলেন। গোর্কি-ও তাঁর বিশ্ববিখ্যাত ‘মা’ উপন্যাসে বিপ্লবের গুরুদায়িত্বটি মেয়েদের উপরেই সঁপেছিলেন। আজকের রাজনীতির দুনিয়ায়-ও এই ঘটনার অনুক্রম। মেয়েদের প্রাধান্য দেওয়ার ছলে কেউ কেউ নিজস্ব অ্যাজেন্ডার বাস্তবায়ন চেয়েছেন। তাঁদের ভোট পাওয়ার নিশ্চয়তা নিয়ে কেউ কেউ তীরে তরী-ও ভেড়াতে পেরেছেন। কেউ বা চেষ্টায় আছেন।

যদিও উত্তর-সত্যের প্রেক্ষাপট রবীন্দ্রনাথের লেখায় তৈরিই ছিল—‘নারদ কহিলা হাসি, “সেই সত্য যা রচিবে তুমি, ঘটে যা তা সব সত্য নহে” (ভাষা ও ছন্দ : কাহিনি)। তবু, রবীন্দ্রনাথ কিংবা গোর্কি-কে উত্তর-সত্যের মতো একটা দানব ও ফাঁপা সময়ের সঙ্গে সংঘর্ষে যেতে হয়নি। উপনিবেশরাজ বা জারের সঙ্গে যুদ্ধ হয়তো তুলনায় সোজা, কেননা তা প্রত্যক্ষ। তাই, আশার কথা লিখেও পরমুহূর্তে একটা ধাক্কা এসে লাগে। এই ধাক্কা, আজ যা মনে হয়, কাল তার শিবির বদলের। এই ধাক্কা, সত্যের কাটাকুটির। এই ধাক্কা, বিস্মৃতির। এই ধাক্কা, মনের ভাষার স্রোত থেকে লেখা-ভাষার দূরে সরে যাওয়ার। এই ধাক্কাগুলো আসলে ‘বুড়োমানুষির সুবুদ্ধি-ঘেরা জগতে’ প্রাণ হাঁপিয়ে ওঠার ধাক্কা। সুবুদ্ধি-ঘেরা জগত আর জড়তা আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে। তাসের দেশের মতোই আমাদের তাই একজন হরতনী দরকার। যে বলবে—‘আমাদের শান্তিটা বুড়ো গাছের মতো। পোকা লেগেছে ভেতরে ভেতরে, সেটা নির্জীব, তাকে কেটে ফেলা চাই’। তাসের দেশে সবচেয়ে বড়ো ‘অপরাধ’ যে চাঞ্চল্য, যে সপ্রাণতা, তাকেই আজ প্রয়োজন। বড়ো প্রয়োজন।

____________
মতামত লেখকের নিজস্ব

Written by