
নিউ এম্পায়ার হলের বয়স নয় নয় করে সাতাশি বছর
১, হুমায়ূন প্লেস, নিউ মার্কেট। কলকাতার অন্যতম হেরিটেজ বিল্ডিং-এ দাঁড়িয়ে নিউ এম্পায়ার সিনেমা। লাইট হাউজের পাশে দাঁড়ানো এই সিঙ্গল স্ক্রিন হলের বয়স নয় নয় করে সাতাশি বছর। নেপালের হোম মিনিস্টার মেজর জেনারেল সামশের জাং বাহাদুর রাণা একসময় কলকাতার ৪৫টি বিশেষ সম্পত্তির মালিক ছিলেন। নিউ এম্পায়ার থিয়েটার সেই ৪৫টি সম্পত্তির একটি। ১৯৩২ সালে এই থিয়েটার হল তৈরি হয়। নকশা বানান বিখ্যাত ডিজাইনার আর্কিটেক্ট এ ডে বই স্রসব্রি। সেসময় এই থিয়েটার কলকাতা কাঁপাত তার ব্যালে নাচ ও নাটকের যাদুতে। বিখ্যাত সব শিল্পী জুবিন মেহেতা, উদয় শঙ্কর, অমলা শঙ্কর, শম্ভু মিত্র প্রমুখ অনুষ্ঠান করেছেন এই হলে। সিনিয়ার পিসি সরকার বহু ম্যাজিক শো করেছেন এই। এমনকি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিচালনায় ‘নটীর পূজা’ নাটকটিও অনুষ্ঠিত হয় এই মঞ্চে।
১৯৬০ সালের শুরুর দিকে নাটক, গান, নৃত্য ইত্যাদির সঙ্গে দেখানো শুরু হয় সিনেমাও। কিছু সময় পরে বোঝা যায় সিনেমা অনেক বেশি লাভজনক এবং জনপ্রিয়তার পথ সুগম করে থাকে। ১৯৬০-এর শেষদিকে তাই এই হল সম্পূর্ণরূপে সিনেমা হলে পরিবর্তিত হয়। ভি শান্তারামের চেয়ারম্যানশিপে হল কর্তৃপক্ষ এই সিদ্ধান্তে আসে।
আরও পড়ুন
টকি-কথা ১
কিন্তু ভাগ্যে কিছু অন্যই ছিল নিউ এম্পায়ারের। জানা যায় ১৯৭০ পরবর্তীতে স্ক্রিনিং-এর মান খারাপ হতে থাকে এই হলে। কলকাতার বুকে প্রোডাকশন হাউজ ওয়ার্নার ব্রাদার্সের এই হলে দেখানো সিনেমার মান ক্রমশ অবনত হতে থাকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত। সঙ্গে এসে জোড়ে নানা অন্য সমস্যা। স্টাফেদের দুর্নীতি যুক্ত হয় বোঝার উপর শাকের আঁটি হয়ে। কম মাইনের অজুহাতে তাঁরা শুরু করেন টিকিট ব্ল্যাকে বিক্রি করা। ১০০০ সিটের একটি হলে কাউন্টার খোলার আধঘণ্টার মধ্যে হাউজফুল ঘোষণা করে দেওয়া হত একসময়। এরপর শুরু হতো চোরাপথে টিকিট বিক্রি। সে টিকিটের দামের কোনো গাছপাথর থাকত না। সপ্তাহান্তে সে দাম হয়ে যেত দুই বা তিনগুণ। আশায় থাকা মানুষ বাধ্য হয়ে কিনতেন সেসব আর নিউ এম্পায়ারের কবরে গিয়ে পড়ত একমুঠো করে মাটি। এদিকে দুর্নীতির সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় কর্মচারীদের খারাপ ব্যবহারও। না ঠিকমতো ইউনিফর্ম পরেন তাঁরা, না ভালো ব্যবহার করেন দর্শকদের সঙ্গে! পুরোনো দর্শকেরা বিরক্ত হয়ে যাওয়া কমিয়ে দেন এই হলে। মালিকপক্ষ দেখতে পান এক বিরাট লোকসানের খাতে ডুবতে চলেছে এই হল। সেখানে অত্যন্ত উঁচু দর আসছে ইলেকট্রিকের, অন্যান্য খরচের পারদও পেরিয়ে যাচ্ছে সীমা, অথচ তেমন রোজকার হচ্ছে না হলের।
আরও পড়ুন
টকি-কথা ৬
পরবর্তীতে ইউনিপ্লেক্স থেকেও কিছু আধুনিকতার আশ্রয় নেয় নিউ এম্পায়ার। টিকিট-পত্রের বিষয়ে অনেক বেশি স্বচ্ছতা আসে সমস্তটা মেশিনে চলে আসায়। দর্শক তাঁর সামর্থ্যের মধ্যে দেখতে পান সিনেমা। সপ্তাহ থেকে সপ্তাহান্ত একই দামের টিকিট। কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে হলের নিচে তৈরি করা হয় একটি ফুডকোর্ট। সেখানে ডমিনোজ, কেএফসি ও বারিস্তার মতো কিছু স্টল দেওয়া হয়। এটি হলের একটি উপরি রোজকার হিসাবে সাফল্য পায়।
যেখানে কলকাতার অধিকাংশ ইউনিপ্লেক্স বন্ধ হয়ে যায় ২০০৬-এর মধ্যে সেখানে কেবল ম্যানেজমেন্টের দূরদর্শিতার কারণেই সম্ভবত এখনও পর্যন্ত সক্রিয় এই হল। নিউ এম্পায়ার কলকাতার টুপিতে এক রঙিন পালক, তবে আলগা হয়ে এসেছে অনেকটাই। হয়তো কোনও এক দমকা হাওয়ায় একদিন হারিয়ে যাবে সমস্ত কিছু।
