উত্তরপাড়ার গৌরি সিনেমা হল এখন বয়েজ হোস্টেল এবং পিজির আকার ধারণ করেছে

এটা আজকে নয়, শহর বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে রাস্তাঘাট, ধীরে ধীরে এসেছে নতুন বাসরুট। কলকাতা থেকে মফস্‌সল, এক অপরিচিত ক্ষণস্থায়ী যৌথ পরিবারকে চার বা ছ’চাকায় সন্তুষ্ট করে গেছে এই সব বাস। তাদের কোনোটির বয়স ৯০ বছর, কোনোটির ৭০। ঠিক এরকম সময়ই বাঙালির মন জুড়ে থাকা আরও একটি জিনিস হলো সিনেমা হল। সিঙ্গল স্ক্রিন। আজ এতবছর পেরিয়ে তার ৯০ শতাংশই বেঁচে নেই কোনোভাবে। অথচ লোকমুখে এখনও তারা টিকে থাকবে আগামী কয়েক দশক; হয়তো বা শতক। গত দশবছরের আন্তর্জাল বিপ্লবে সিনেমা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে হলের স্ক্রিন থেকে। সঙ্গে বেড়েছে পাইরেসি। ধীরে কমে এসেছে হলে ছবি দেখার প্রবণতা। ফলে শহর মফস্‌সলের হলগুলি দ্রুত হারে বন্ধ হয়ে গেছে গত কয়েক বছরে। 

কেবল যেটুকু রয়ে গেছে, তা সিনেমা হলের নামে স্টপেজ। হয়তো বহুদিন এভাবেই অস্তিত্ব রয়ে যাবে তার। বিচিত্র সব হল এবং বিচিত্র তাদের বৈশিষ্ট্য। এমনই এক কাজে মগ্ন হতে বাধ্য হলাম তাই। শুরু করা যাক হুগলির উত্তরপাড়া দিয়েই। মনে করা হয় বালি দক্ষিণ পাড়ার মতোই উত্তরপাড়াও কোনো এক দিন অংশ ছিল বালির। খাল টপকে এপাড়ে এলে হাতে গোনা কয়েকটি স্টপেজ পেরোলেই গৌরি সিনেমা। ১৯৪৪-৪৬ সাল নাগাদ স্টেশনের নীকটবর্তী পার্বতী সিনেমা উঠে চলে আসে গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের উপর। পার্বতী নাম বদলে নাম হয় গৌরি সিনেমা। ১৯৭০ পর্যন্ত রমরমা চলে এই হল। তারপর নানা সমস্যায় বার কতক বন্ধ ও হাতবদল হয় এই হল। শেষবারের চেষ্টায় ৮৯-৯০ সাল পর্যন্ত চালাতে সক্ষম হন কর্তৃপক্ষ। এরপর পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। অথচ আজও অনড় তার উপস্থিতি। ভাঙাও পড়েনি, বাড়িও ওঠেনি সেখানে। কেবল ওই বাড়িতেই একাংশে তৈরি হয় একটি রেস্টুরেন্ট ও কয়েকটি সেলাইয়ের দোকান। পরে সেসবও উঠে যায়। এখন সেখানে পিজি ভাড়া দেওয়া হয় এবং একটা অংশে তৈরি হয়েছে বয়েজ হোস্টেল। অথচ এই সিনেমাহলই কত সংসার গুছিয়ে দিয়েছে একসময়। উত্তরপাড়ার অন্যতম পুরোনো এই হলে ছিল বিচিত্র সব বন্দবস্ত। শোনা যায় নব দম্পতিদের নাইট শো দেখার সুবিধার জন্য ছিল একটি শিশু শয়ন কক্ষ। সেখানে ঘুমন্ত শিশুকে রেখে ছবি দেখতে পারতেন বাবা-মা। শিশুর রক্ষণাবেক্ষণের স্বার্থে ছিল নিয়োজিত কর্মচারি। যাঁরা শিশুদের খেয়াল রাখতেন এই মধ্যের সময়। ছবি দেখে বেড়োনোর পথে মা বাবা এসে চিনে খুঁজে নিয়ে যেতেন তাঁদের শিশুকে। গৌরি সিনেমায় নতুন দোকান বা পিজির ব্যবস্থা করা হলেও অক্ষত রয়ে গেছে হলটি। সেখানে দরজায় তালা ঝুলিয়ে অবহেলায় ফেলে রাখা হয়েছে এত বছরের ঐতিহ্য। গৌরি সিনেমার অনুপস্থিতির খবর আজ প্রায় ৩৩ বছরে কান পাতছে। অথচ নতুন থেকে পুরোনো মানুষ সেই নামে টাকা এগিয়ে দিচ্ছে বাসে। কন্ডাকটর তাঁদের দক্ষিণা নিয়ে পুজোর টিকার মতো করে ধরিয়ে দিচ্ছে টিকিট। উত্তরপাড়ার একপেশে শহরতলীতে গৌরি সিনেমা অন্যতম ব্যস্ত মোড়। সেখান থেকে পুরোনো আর নতুন গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড আলাদা হয়ে যাচ্ছে কিছুক্ষণের পথে। ধীরে ধীরে ছোটো সিনেমা হল কমে আসছে, কমে আসছে তাদের সমসাময়িক বাসরুটও। গৌরি সিনেমার অন্যতম সঙ্গী ‘৩’ নম্বর বাসও উঠে যেতে বসেছে প্রায়। অথচ লোকমুখের মেয়াদে আমরা সবাই এই নাম অন্তত দশবছর যে ভুলতে দেব না, তার সম্বন্ধে অবকাশ নেই সন্দেহের…

Developed by DXDasia