
সুকুমার রায়কে আমরা খুঁজে চলেছি এই একুশ শতকের পৃথিবীতেও
মজাচ্ছলে খুব কঠিন ভারি কথাগুলো সহজ ভাবে বলে দিয়েছেন সুকুমার রায়। তখন আমাদের হয়তো স্কুলে যাওয়ারও বয়স হয়নি। দুপুরে খাওয়ার পর পিঠ চাপড়ে চাপড়ে মা ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করছেন সন্তানকে। সে যাতে দুষ্টুমি না করে তার টোটকা বের করে সেই মায়েদের জীবনে গুরুদেবের ভূমিকা নিয়েছেন সুকুমার রায় স্বয়ং। সুকুমার রায়ের আবোল তাবোল বই (পড়ুন: শতবর্ষে আবোল তাবোল) থেকে ভয় পেও না-র পাতাটা খুলে মা তার সন্তানের পায়ের দিকে খাটের শেষ প্রান্তে রেখে দিচ্ছেন, আর বলছেন, চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়ো, নইলে ‘ভয় পেও না’ এসে তোমাকে ধরবে।

ছড়াতে ওই অদ্ভুত দেখতে প্রাণীটার আদপে কোনো নামই নেই। অজানা সেই প্রাণীর বারণ উপেক্ষা করে ছবিটা দেখেই শিশুরা ভয়ে চোখ বুজে থাকে। ওই বয়সটাই এরকম। যেটা করতে বারণ করা হয়, সেটাই ওই বয়সের ছেলেমেয়েরা বেশি বেশি করতে থাকে। অতএব যিনি বাংলার এক প্রধান শিশুসাহিত্যিক হিসেবেই পরিচিত, এবং হাস্যরসের কারিগর হিসেবে খ্যাত, অনেকের শিশু বয়েসে তাঁর স্মৃতি বলতে হাসি তো নেই-ই, কেবলই ভয়। অতঃপর, সুকুমার রায় ভাবিয়ে তোলেন আজীবন। সুকুমার রায় পিছু ছাড়েন না। কারণ তাঁর লেখাগুলোকে যখন রাজনৈতিকভাবে পাঠ করতে শিখব, তখন দেখব সমাজের বিভিন্ন স্টিরিওটাইপ প্রবণতাগুলো রূপক হয়ে তাঁর লেখাতে ফুটে উঠেছে। ‘ভয় পেও না’ ছড়াটার কথাই ধরা যাক। যে কোনো শাসনব্যবস্থা দাবি করে আনুগত্য। আর সেই দাবি কিন্তু দু’মুখো। একদিকে থাকে ভয়ের উপাদান, থাকে শাস্তি, থাকে নির্যাতনের হুমকি। আরেকদিকে থাকে নিরাপত্তা দেওয়ার অঙ্গীকার, থাকে ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি। যতক্ষণ একজন সিস্টেমের অনুগত, ততক্ষণ সিস্টেম তাকে অভয় দেবে, আর যেই খানিক গড়বড় করবে, সিস্টেমের দাঁত-নখ বেরোবে তখনই। ভয় আর অভয়ের এই যে খেলা, তার ভারসাম্যটা ভেঙে গেলে কী হয়, তার উদাহরণ আছে আরেকটা ছড়ায়—
চলতে গিয়ে কেউ যদি চায়
এদিক্ ওদিক্ ডাইনে বাঁয়,
রাজার কাছে খবর ছোটে,
পল্টনেরা লাফিয়ে ওঠে,
দুপুরে রোদে ঘামিয়ে তায়-
একুশ হাতা জল গেলায়।। (একুশে আইন)
ঔপনিবেশিক শাসনের প্রেক্ষিতে লেখা হয়েছিল এই ছড়া। তাছাড়া সুকুমার রায় আবোল তাবোল-এর ছড়াগুলো লিখছেন, যার মধ্যে এই লেখাটিও আছে, তখন ইউরোপে গুটি গুটি পায়ে এক নতুন রাজনৈতিক মতবাদ নিজের জমি শক্ত করছে। সেই দর্শনের নাম ফ্যাসিবাদ। এই ছড়াটির কোথাও তার কি ইঙ্গিত নেই? আর এখনকার সময়ে তার লেখাগুলো কি নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে না? বাংলার সুকুমার রায় এখন পথ দেখাতে পারেন গোটা ভারতকে, এমনকি গোটা বিশ্বকেও। ননসেন্স ভার্স আসলে তো শুধুমাত্র ননসেন্স নয়, শুধুমাত্র অর্থহীন কিছু শব্দসমাহার নয়। ননসেন্স ভার্স আসলে সেন্সের এক ধরনের প্যারোডি। আরও স্পষ্ট করে বললে মানুষের যে কমন সেন্স, তার প্যারোডি এই ননসেন্স ভার্স। যদিও এই সাহিত্যরীতির জন্ম ইউরোপে, তা সত্ত্বেও সুকুমার যখন ননসেন্স ভার্স লেখেন, সেগুলোর মধ্যে বাঙলিত্ব খুঁজে পেতে অসুবিধে হয় না। সুকুমার নিজেই তো একজন আন্তর্জাতিক প্রাচ্যবাসী।

সুকুমার রায়কে নানাভাবে পাঠ করা যায়, নানা বয়সে, নানা সময়কালে। যেন ল্যাবরেটারিতে গবেষণার জন্য রাখা ব্যাঙ কিংবা আরশোলা। বাইরে থেকে যেন একটা মজার প্রাণী, যাকে নিয়ে বাচ্চারা খেলতে পারে, কিন্তু তার চামড়া খুলে ভেতরে চোখ লাগালেই বাইরের দৃশ্যের সঙ্গে কোনো মিলই নেই, তার বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় কাজকর্ম সম্পর্কে জানতে গেলে শরণ নিতে হবে জীববিজ্ঞানের খটোমটো জ্ঞানের। সুকুমারের লেখাগুলোতে বাইরে থেকে এক রকমের মজা, ভেতরে আরেক রকমের গভীরতা। বাবুরাম সাপুড়ে-র থেকে যে রকমের সাপ চায় তার ক্রেতা, আমরাও কি ঠিক অধস্তন কাজের ক্ষেত্রে একই রকম মানুষের সন্ধান করি না? কিংবা রাষ্ট্র? সে কি চায় না তার নাগরিকদের এরকম নিরীহ বানিয়ে রাখতে?

হযবরল-র (পড়ুন: শতবর্ষে হযবরল) যে বিচারপতি চোখ বুজে মামলার কাজ পরিচালনা করেন, আমরা হয়তো তাঁকে আজও বসতে দেখি এজলাসে। প্রায়ই দেখি অনেক অনেক হাঁসজারু আর বকচ্ছপ ঘুরে ফিরে কথা বলে বেড়াচ্ছেন চারদিকে – শহরে, শহরতলিতে, মফস্সলে, গ্রামে সব জায়গায়তেই। সেই তুলনায় খুব কমই চোখে পড়ে হেসোরাম হুঁশিয়ারকে, আর কখনও সখনও দেখি পাগলা দাশু উঁকি মেরে ভ্যানিস হয়ে যায়। আমরা হয়তো সুকুমার রায়কে খুঁজে চলেছি এই একুশ শতকের পৃথিবীতেও। যিনি উলঙ্গ রাজা-র সেই শিশুটার মতো আবার প্রশ্ন ছুড়ে দেবেন সিস্টেমের দিকে—
“সভায় কেন চেঁচায় রাজা ‘হুক্কা হুয়া’ ব’লে?
মন্ত্রী কেন কল্সী বাজায় ব’সে রাজার কোলে?
সিংহাসনে ঝোলায় কেন ভাঙা বোতল শিশি?
কুমড়ো নিয়ে ক্রিকেট খেলে কেন রাজার পিসি?
রাজার খুড়ো নাচেন কেন হুঁকোর মালা প’রে?
এমন কেন ঘটছে তা কেউ বলতে পার মোরে?”
_________________
প্রচ্ছদের ছবি সৌজন্যে: বৈভাষিক
