শ্যামনগরের মন্দির-কাহিনী

মূলাজোড় কালীবাড়ির জন্য শ্যামনগরের খ্যাতি চতুর্দিকে

শ্যামনগর। উত্তর চব্বিশ পরগনার গঙ্গার ধারের এই জনপদ বহু কারণেই বিখ্যাত। তার অন্যতম, শ্যামনগর কালীবাড়ি। উনিশ শতকের গোড়ায়, ১৮০৯ খ্রীঃ বৈশাখী পূর্ণিমায় গোপীমোহন ঠাকুর  ব্রহ্মময়ী মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। মন্দির প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে অনেক কাহিনী প্রচলিত। জমিদার গোপীমোহন মা কে কন্যা রূপে আকাঙ্ক্ষা করে এক মাত্র কন্যা হিসাবে পেয়েছেন ব্রহ্মময়ীকে। ৮ বছর বয়সে বিয়ের ব্যবস্থা করা হয়। বিয়ের দিন সকালে ব্রহ্মময়ী গঙ্গা স্নানের ইচ্ছা প্রকাশ করলে পাল্কিতে চাপিয়ে ব্রহ্মময়ীকে গঙ্গায় নিয়ে যাওয়া হয়, কন্যা সহ পালকি গঙ্গায় চোবানোর পরে আর ব্রহ্মময়ীকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। এই সংবাদে গোপীমোহন কন্যার শোকে ২/৩ দিন মুহ্যমান হয়েছিলেন। দেবী পরে স্বপ্নে দেখা দিয়ে বলেন যে তাকে মূলাজোড় গঙ্গার পাড়ে পাওয়া যাবে এবং গোপীমোহন সেখানেই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে যেখানে মন্দির সেখানেই মৃতদেহ পাওয়া যায়। মতান্তরে, স্বপ্ননির্দিষ্ট স্থানে পাষাণময়ী এক দেবীমূর্তি পাওয়া যায়, মৃত্তিকায় অর্ধ প্রোথিত, কষ্টিপাথরের দক্ষিণা কালীমূর্তি, পদতলে শায়িত মহাদেব বিগ্রহ। ব্রহ্মময়ী কোন রোগেই মারা যান( দু এক জন কালা জ্বরে মারা গেছেন এমন বক্তব্যও পেশ করেন)। ব্রহ্মময়ীর গায়ের রং ছিল একটু কালো এবং প্রকৃতিতে ধর্মভীরু। তবে স্বপ্নদিষ্ট হয়েই গোপীমোহন মন্দির নির্মাণ করান। ব্রহ্মময়ীর মন্দিরটি নবরত্ন মন্দির, এরকম মন্দির পশ্চিমবঙ্গে বেশী দেখা যায় নি। মন্দিরের দক্ষিণ ও বাম পার্শ্বে ছয়টি করে সারিবদ্ধ শিব দেউল। শিব মন্দিরগুলো অবশ্য গোপীমোহন পুত্র প্রসন্ন কুমার সম্পূর্ণ করেন। মন্দিরের আভ্যন্তরীণ বাতিগুলি ইউরোপীয় প্রভাবের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, মন্দিরে সোপানের কাছে দুই স্তম্ভের উপর শ্বেত পাথরের দুই সিংহ মূর্তি। উপরে আরও দুটি স্তম্ভ যার ওপর দুটি বিষ্ণু মূর্তি। অনুমান করা হয় এই মূর্তিদুটো ব্রহ্মময়ী মূর্তির চাইতেও প্রাচীন, এদের রাজশাহীর কোন জায়গায় খোঁড়াখুঁড়ির সময় পাওয়া যায়।

পাথুরিয়াঘাটের ঠাকুর ঐতিহ্যগত ভাবে বৈষ্ণব অথচ তারাই শক্তি মন্দির প্রতিষ্ঠা করলেন – এটা বিস্ময়কর বলে মনে হতে পারে। এর পেছনেও ঠাকুর পরিবারের অন্য আকাঙ্ক্ষা বা সামাজিক প্রতিষ্ঠার কারণ ছিল কি? পীরালি ব্রাহ্মণের সমাজ প্রতিষ্ঠা ও ব্রাহ্মণ সমাজের নেতৃত্ব করার করার আকাঙ্ক্ষা কি এই সব কর্মকাণ্ডের পেছনে কাজ করেছে? উচ্চ বর্ণের অনেক ব্রাহ্মণই পীরালিদের অন্নগ্রহণ করতেন না, সেই জন্যই কি ব্রহ্মময়ী মন্দির ও সংস্কৃত কলেজের সাথে যুক্ত ব্রাহ্মণদের ঢালাও অন্নদানের ব্যবস্থা ছিল? এসব প্রশ্নের উত্তরের জন্য চাই প্রয়োজনীয় তথ্য। প্রায় ১০০ বছর আগে পাথুরিয়াঘাটার ঠাকুর বাড়ীতে যে ‘গোপীনাথ জিউ’ ছিলেন তাঁকে ব্রহ্মময়ী মন্দিরের পাশে এনে প্রতিষ্ঠা করা হয়। গোপীনাথ এখানেই অধিষ্ঠিত। ব্রহ্মময়ী মন্দির ঘিরে নানা অলৌকিক ঘটনা প্রচারিত। তার সব হয়তো সত্যি নয়। দেবী এখানে পশ্চিমাস্যা হওয়ার কারণ হিসাবে বলা হয় রামপ্রসাদ যখন ভাগীরথী দিয়ে যাচ্ছিলেন তখন তাঁর গান শোনার জন্য দেবী পশ্চিম দিকে মুখ ফেরান। সাধক রামপ্রসাদ সেন মারা যান ১৭৭২ খ্রীঃ আর মন্দির তৈরি হয় ১৮০৯ এ। সুতরাং এই ঘটনা সত্য নয়। যতীন্দ্রমোহন ঠাকুরের সঙ্গে বামাক্ষ্যাপা এই মন্দিরে নিজে পূজা করেছিলেন। মন্দিরের সঙ্গে যুক্ত তাঁরা এ নিয়ে গর্ব করেন। পৌষ মাসে জোড়া মুলো দিয়ে পূজো দেবার জন্য বহু দূর দূরান্ত থেকেও ভক্তজনের আগমন ঘটে।

বর্তমান যেখানে CESC GENERATING STATION সেখানে একটি স্নান ঘাট ছিল। এই ঘাটের পাশে শিব মন্দির। এই মন্দিরটি বোধহয় এখানকার প্রাচীনতম ধর্মস্থান। তবে এই মন্দিরের কথা আজ প্রায় সবাই ভুলে গেছেন।

সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরটির দেবী ২০০ বছরের বেশী সময় ধরে এখানে অধিস্টিত। রায়গুনাকর ভারতচন্দ্রের আমলে এই মন্দির ছিল কিনা তা অবশ্য জানা যায় নি, শোনা যায় স্থানীয় ঘোষ পরিবার এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের আমলে বাংলা দেশে যে মাতৃ সাধনার জোয়ার বইছিল তারই ব্যক্তিগত বা আশ্রিত কারও উদ্যোগে হয়তো প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এই মন্দির।

অষ্টাদশ শতকে মাকালতলা লৌকিক দেবস্থান বলে বিবেচিত হতো বলে অনেকে দাবী করেন, সাধক রামপ্রসাদ সেন এখানেই সিদ্ধিলাভ করেছিলেন বলে শোনা যায়।

এই অঞ্চলে পুরনো কোন মসজিদের সন্ধান পাওয়া যায় নি। অথচ ১০০ বছর আগেও এখানে যথেষ্ট সংখক মুসলমান এখানে বাস করতেন। এর পেছনে কোন সামাজিক অসহিস্নুতা কাজ করছে কি? এখান যেখানে শ্যামনগর বয়েস ক্লাব সেখানে একটি মসজিদ ছিল বলে জানা যায়, আধুনালুপ্ত মির্জাপুর গ্রামের একাংশে পীরতলা বলে একটি জায়গা প্রভাবশালী মুসলমান পীরের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। পীরতলা রক্ষনা-বেক্ষনের অবশ্য কোন ব্যবস্থা নেই। মধ্যযুগের বাংলায় পীরেরা খুবই প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলেন। এই অঞ্চলে তাদের প্রভাব কতটা ছিল ? উনিশ ও বিশ শতকের ধর্ম আন্দোলনের ঢেউ এখানে বিশেষ ছাপ ফেলতে পেরেছিল বলে মনে হয় না। আতপুর জগদ্দল অঞ্চলে কিছু ব্রাহ্ম পরিবার ও সমাজের উপস্থিতির কথা জানা যায়। খ্রিস্টান ধর্মের প্রভাবও এখানে বিশেষ পড়েনি।

(জনরঞ্জন গোস্বামী লিখিত এবং ১৯৮৯ সালে “হৈমী”র রক্তদান শিবিরের স্মারক পত্রিকায় প্রকাশিত)

Developed by DXDasia