হাত খালি, তবু সাহেবি কেতায় বিপুল ভোজ আয়োজন করে গ্র্যান্ট খুইয়েছিলেন নীরদ সি চৌধুরী

বাঙালি হয়েও সাহেব ছিলেন যে মানুষটা

অক্সফোর্ডের ২০ নম্বর ল্যাথবুরি রোড। বাগানের ঘেরা বাড়ি। আর সেই বাড়িতেই বাসা মৈমনসিংহের বাঙালিবাবুর। এই মানুষটিকে নিয়ে চিরকালীন এক দ্বন্দ্ব। তিনি বাইরে সাহেব ভিতরে বাঙালি? নাকি বাইরে বাঙালি ভিতরে সাহেব? নাকি একই সঙ্গে দুটোই? নিজেকে নিয়ে তাঁর নিজেরও হয়তো এমনি কোনো দ্বন্দ্ব ছিল। এসবের সহজ নিরসন অবশ্য সম্ভব নয়৷ তাই এই যুগল সত্তা নিয়ে জগৎ ও জীবনকে দেখাই শ্রেয়। সেটাই দেখেছিলেন নীরদ সি চৌধুরী। তাঁর জীবন যেন সেই দ্বৈততারই সাক্ষ্য দেয়। 

ব্রিটিশ নিয়মনিষ্ঠাকে গভীরে আত্মস্থ করেছিলেন নীরদবাবু। তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চাইলে ঘড়ির কাঁটা মিলিয়ে নির্দিষ্ট সময়ে আসতে হত। দেরি হলে  অবশ্যই সম্যক কারণ দর্শাতে হত। নইলে তাঁর দেখা পাওয়া মুশকিল। একজন দেখা করার জন্যে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করলে, কোনোভাবেই তিনি ওই ব্যক্তির সঙ্গে আসা অন্য কাউকে সাক্ষাতের সুযোগ দিতেন না। এমনটা নাকি হয়েছিল তসলিমা নাসরিনের ক্ষেত্রেই৷ অক্সফোর্ডে তসলিমা দেখা করতে যান তাঁর সঙ্গে। একজন সাহেব ছিলেন তাঁর সহযাত্রী। কিন্তু কিছুতেই নিজেদের কথার মাঝে সেই সাহেবকে রাখেননি নীরদ সি চৌধুরী। ঘণ্টা দুয়েকের সেই কথায় নীরদ চৌধুরীর বাড়ির বাইরে গাড়ির ভিতরে সময় কাটাতে হয়েছিল সেই সাহেবকে। এমনই নিয়মনিষ্ঠ ছিলেন তিনি৷

নিয়মনিষ্ঠা সময়নিষ্ঠাকে রীতিমতো বাতিকের পর্যায়েই নিয়ে গিয়েছিলেন নীরদ সি চৌধুরী। আর তা বজায় রাখতেন সবক্ষেত্রেই। যেমন– কোনো সাহেব দেখা করতে এলে তাঁর পরনে থাকত ব্রিটিশ পোশাক। আর এদেশের মানুষ দেখা করতে গেলে পরতেন ধুতি-পাঞ্জাবি। চেনামহলে তাঁর ফ্যাশান-সেন্স ছিল রীতিমতো প্রশংসনীয়। যদিও পোশাক নিয়ে তাঁর ছুৎমার্গও ছিল। বাঙালি কোনো মেয়ে দেখা করতে গেলে, তাকে শাড়ি পরেই যেতে হত নাকি। এমনকি সালোয়ার কামিজকেও নাকচ করতেন তিনি। শোনা যায়, কেতকী কুশারি শাড়ির বদলে সালোয়ার পরে দেখা করতে যাওয়ায় তাঁকে প্রায় তাড়িয়েই দিয়েছিলেন নীরদবাবু। 

অথচ, এই মানুষটাই সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন একদম কেতাদুরস্ত সাহেব সেজে। কোটের পকেট থেকে সেদিন ঝোলানো ছিল লম্বা রুমাল। যাওয়া-আসার সময় সেই লম্বা ঝুলের রুমাল মাটিতে ঠেকে বারবার। সুনীতি চাটুজ্জে সেই রুমালটি নাকি তুলে পকেটে ঢুকিয়ে দিতে যান। অমনি তাঁকে অবাক করে নীরদবাবু মাটিতে ফেলে দেন রুমালটা। আর খানিক অসন্তোষের সুরে বলে ওঠেন – “ওটা ওখানেই থাকবে।

এই সাহেবিয়ানাকে আমৃত্যু লালন করেছিলেন তিনি। স্বদেশ থেকে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া এক অতিথিকে যত্ন করে খাইয়েছিলেন দামি রেড ওয়াইন। খাওয়ার আগে বারবার শিখিয়েছিলেন গ্লাস ধরার পদ্ধতি৷ কিন্তু তিনি সেই দেশি কায়দায় গ্লাস ধরে চুমুক দিতে যান। অমনি নীরদবাবু উঠে ওয়ানটি ফেলে দেন। আঙুলের তাপে নাকি নষ্ট হয়ে যায় মহামূল্যবান সেই পানীয়। 

এই সুনিষ্ঠ সাহেবিয়ানার জন্যই নাকি গ্রান্ট বাতিল হয়েছিল নীরদবাবুর। দ্বিতীয়বার যখন তিনি অক্সফোর্ড যান, তখন থাকার জন্যে একটি বাড়ি তিনি ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে পেয়েছিলেন৷ কিন্তু হাত ছিল এক্কেবারে খালি৷ তপন রায়চৌধুরী ও বিমলকৃষ্ণ মতিলাল অনেক কষ্টে গ্রান্টের ব্যবস্থা করেন তখন। গ্রান্ট কমিশনের দুজন সাহেব নীরদ চৌধুরীর বাড়ি গেলেন ডিনার খেতে। আর তাতে নীরদবাবু করলেন এলাহি আয়োজন। দামি দামি অ্যান্টিক ক্রকারিতে খাবার পরিবেশন, অত্যন্ত দামি পানীয়- এইসব দেখে তো সাহেবদের চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। খাওয়াদাওয়া শেষে তারা ঠিক করেন, এই মানুষটির এতই বৈভব, গ্রান্ট তাঁর কিছুতেই লাগতে পারে না। 

আশ্চর্য ঘটনা বটে! 

সঠিক জানা নেই। তবে এই যে দ্বৈততা, এটাই কি বাঙালির আত্মঘাতের অন্যতম কারণ, যা থেকে বেরিয়ে আজও তেমন শিকড়সন্ধান সম্ভব হল না।

ঋণ- ‘অপরিচিত’, আনন্দবাজার পত্রিকা, ৭/৬/২০১৪; ‘পিয়ন থেকে প্রকাশক’ – বাদল বসু

Developed by DXDasia