
আজ মহুয়ার মৃত্যুদিন
দর্শকাসন আলো করে বসে আছেন সুচিত্রা সেন। মঞ্চে গান গাইবেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্রর মতো বিখ্যাত শিল্পীরা। উত্তর কলকাতার চৌধুরীপাড়ায় আসর বসেছে। সমস্ত রথী-মহারথীরা স্টেজে ওঠার আগে হঠাৎ মঞ্চে এল চার বছরের এক ছোট্ট প্রজাপতির মতো মেয়ে। বাবা নীলাঞ্জন রায়চৌধুরী নিজেও নৃত্যশিল্পী। উদয়শঙ্করের দলে নাচতেন। তিনিই অনেক কষ্টে ব্যবস্থা করেছেন এই স্টেজে মেয়ের নাচ দেখানোর। মাত্র চার বছরের মেয়ে, কিন্তু সে যেন উড়ে বেড়াল গোটা স্টেজ জুড়ে। দেখে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গেল সবাই।
মেয়েটির নাম শিপ্রা ওরফে সোনালি। ছোটো থেকেই স্টেজে স্টেজে মুগ্ধতা ছড়িয়ে অভাবের সংসারে সামান্য হলেও রোজগার এনে দিত সে। তারপর একদিন টালিগঞ্জ পাড়ায় স্টুডিওতেও হাজির হল বাবার সঙ্গে। ততদিনে সে চোদ্দ-পনেরো বছরের কিশোরী। সুখেন দাসের প্রযোজনায় পীযূষ গঙ্গোপাধ্যায়ের পরিচালনায় ‘নয়া মিছিল’ মিছিল ছবির অডিশনে অবশ্য নির্বাচিত হয়নি শিপ্রা। কিন্তু সুখবর এল দ্রুতই। তরুণ মজুমদার নাকি তাঁর আগামী ছবির জন্য নতুন মুখ খুঁজছেন। এবারে আর খালি হাতে ফিরতে হল না মেয়েটিকে। ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’ ছবিতে ডেবিউ হল তার। সন্ধ্যা রায় গড়েপিটে নিলেন এই অসম্ভব প্রতিভাবান রোগাটে মেয়েটিকে। তরুণ মজুমদার তার নামটি বদলে রাখলেন—মহুয়া।

বাংলা চলচ্চিত্র একটি রত্নের খোঁজ পেল। এরপর এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলা চলচ্চিত্রে নিজের আসনকে স্থায়ী করে গেছেন মহুয়া। কত যে হিট সিনেমা তাঁর নামের পাশে। ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’ যে সম্ভাবনাকে চিনিয়ে দিয়েছিল, তাকেই নক্ষত্রের স্বীকৃতি দিল তরুণ মজুমদারেরই ‘দাদার কীর্তি’। জ্বরের ঘোরে তাপস পাল বিড়বিড় করছেন “সরস্বতী…”, ঘরে আচমকা ঢুকে পড়েছেন মহুয়া। গম্ভীর মুখ আলো করে খেলে যাচ্ছে আলতো হাসি। ভোম্বলদা-রূপী অনুপকুমার ঘরে ঢুকতেই ফের মিলিটারি মেজাজের গাম্ভীর্য। তিনি যে কত বড়ো জাতের অভিনেত্রী, এই সিনেমাতেই প্রমাণ করেছিলেন মহুয়া। ‘সেই চোখ’ সিনেমায় অভিনয় করেছেন উত্তমকুমারের বিপরীতে। এছাড়া কাজ করেছেন অমল পালেকর, দীপঙ্কর দে, রঞ্জিত মল্লিক, সন্তু মুখোপাধ্যায়দের মতো অভিনেতাদের সঙ্গেও। তাঁর অভিনয়ের গুণমুগ্ধ ছিলেন না, এমন মানুষ পাওয়া কঠিন। তপন সিনহা-র ‘আদমি অর অওরাত’-এ মহুয়ার অভিনয় তো চিরস্মরণীয়। জাতীয় পুরস্কারের স্বীকৃতিও এসেছিল, কিন্তু ততদিনে একমাত্র সন্তানকে রেখে পৃথিবী ছেড়ে অনেক দূরে চলে গেছেন মহুয়া। ১৯৮৬ সালের এমনই এক ২২ জুলাই পৃথিবীতে মহুয়ার শেষ দিন।
মহুয়ার অগ্নিদগ্ধ হওয়া নিয়ে রহস্য ও বিতর্কের সমাধান হয়তো কোনোদিনই হবে না। তাঁর মৃত্যু দুর্ঘটনা নাকি হত্যা, তা নিয়েও তরজা চলবেই। কিন্তু এইসবের অনেকটা বাইরে চিরউজ্জ্বল থেকে যাবেন অভিনেত্রী মহুয়া। মানুষ হিসেবেও তিনি বড়ো আপন ছিলেন অনেকের। দেবশ্রী রায়ের সঙ্গে সম্পর্কে নায়িকাসুলভ প্রতিযোগিতার সামান্য আঁচও ছিল না। তিনি যে দিদির মতো। যে যখনই সাহায্য চেয়েছেন অকাতরে সাহায্য করেছেন মহুয়া। আর তাঁর অভিনয় মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছে যুবক-যুবতী-মধ্যবয়স্ক-বৃদ্ধ সবাইকেই।
মৃত্যুর আগে বীরেশ চট্টোপাধ্যায়ের ‘আশীর্বাদ’ ছবিতে শেষ শট দিয়েছিলেন মহুয়া। কাঁদতে কাঁদতে ফোনে বললেন, ‘‘আমি ভাল নেই, আমি ভাল নেই। তুমি এসে আমাকে নিয়ে যাও।” এরপরই মৃত্যু এসে নিয়ে গেল তাঁকে। অভিনয়-জীবনের শেষ ডায়ালগ কি নিছকই অভিনয় ছিল মহুয়ার?
