
বালি জিটি রোডের উপর এমনই এক দৃশ্যের নাম ‘শ্রীকৃষ্ণ’
হাওড়া জেলার এক অন্যতম প্রাচীন জনপদ বালি। গঙ্গা পাড়ের আজকের এই মফস্সল এককালে খ্যাত ছিল বালি গ্রাম নামে। অথচ যোগাযোগ ব্যবস্থায় আজকের বালি টেক্কা দেবে যেকোনও মেট্রোসিটিকে। তিনটি ন্যাশনাল হাইওয়ে ও চারটি রেলস্টেশন বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এই শহরের উত্তর দিক দিয়ে বয়ে গেছে বালিখাল। যা টপকালেই হুগলিতে পা রাখা। এবার ফেরা যাক প্রসঙ্গে। প্রাচীন জনপদ হওয়ার দরুণ ১৯৪০ পরবর্তী মফস্সলের যে যে জায়গায় গড়ে উঠেছিল সিনেমা হল, তার মধ্যে বালি অন্যতম। বালি ও সিনেমা পাশাপাশি উচ্চারিত হলে প্রথমেই উঠে আসে ‘শ্রীকৃষ্ণ’। একটি ভিড় রাস্তা, তার একদিকে বাস টার্মিনাস, একদিকে অটো ও টোটো স্ট্যান্ড। মাথার উপর দিয়ে চলে গেছে দু’টি সমান্তরাল সেতু। জিটি রোডের উপর এমনই এক দৃশ্যের নাম ‘শ্রীকৃষ্ণ’। হ্যাঁ, এক সিনেমা হলের নামেই নাম হয়েছে এই স্টপেজের। অথচ নামমাত্র টিকে নেই সে হলের একটি ইটও। মাটিতে মিশে গেছে বাড়ি। কেবল লোকমুখে রয়ে গেছে শ্রীকৃষ্ণ। আগামী কয়েক বছরে অনেকেই আর জানবেন না কী থেকে এমন নাম পেয়েছে এলাকাটি। প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো আনুমানিক ’৪৬ সাল নাগাদ শুরু হয় এই হল। তখন অধিকাংশ সিনেমা হলের নাম রাখা হত দেবদেবীর নামে। খুব ছোটো স্ক্রিনের দোতলা এই হলে মূলত ভিড় জমাত উত্তরপাড়া প্যারীমোহন কলেজের পড়ুয়ারা। ছোটো পর্দা বা খারাপ শব্দ ব্যবস্থা হলেও, ভৌগোলিক ও আর্থিক সুবিধার কারণে তাঁদের নির্বাচনে সবসময়ই এগিয়ে থাকত এই হল। লক্ষণীয় ভাবে এই হলে বাংলা সিনেমা চলত বহুমাত্রায়। না ছিল ভালো পর্দা, না ভালো বসবার ব্যবস্থা। অথচ উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত সকলেই ছবি দেখতে এসেছেন এই হলে। বালিঘাট স্টেশনের পাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো এই হল বালি ও উত্তরপাড়ার মানুষের বহু স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এখনও। এই হলের নীচে এসে থামত ৫৪ বাসরুটটি।
আরও পড়ুন
টকি-কথা ১
এরপর যুগ বদলায়। বড় পর্দা আসে, সুব্যবস্থা আসে, ধীরে ধীরে আন্তর্জাল গ্রাস করে নেয় সবকিছু। হলে যাওয়ার হিড়িক কমে আসে মানুষের মধ্যে। ভালো ব্যবস্থা না থাকলে তো আরোই… ধীরে বন্ধ হয়ে যায় স্ক্রিনিং, অবহেলায় পড়ে থাকে কিছু বছর। তারপর ২০০২ সালের মাঝামাঝি নোটিশ আসে সরকারের। নিবেদিতা সেতুর কানেক্টরদুটি যাবে শ্রীকৃষ্ণর উপর দিয়ে। বহু মানুষের জমি যায়। বহু বাড়ি ভাঙা পড়ে এই প্রজেক্টে। ভাঙা পড়ে দোতলা সেই দোহারা চেহারার বাড়ি। তার শীর্ণকায় অস্তিত্ব সরিয়ে সেখানে ফুটে ওঠে আলো, কাজ… তারপর মাটিতে মিশে যায় এই হল। শ্রীকৃষ্ণ পঞ্চভূতে বিলীন হন। ব্রিজের কানেক্টরদুটি জোড়া হয় অনেক দিনের সময় ব্যবধানে। নীচে অটো বাসা বাঁধে, রিক্সা এসে বসে। সে হল এখন ধুলোয় ধুলোয় উড়ে বেড়ায়। দোকানে দোকানে খাবার জিনিস বিক্রি হয় সেখানে। তবে মানুষ এখনও ডানলপের অটোতে ফিরলে ‘দাদা শ্রীকৃষ্ণ নামাব’ বলতেই অধিক স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।
