
নকশাল আন্দোলন নিয়ে লিখছেন সৃজন সেন, আজ ৫৬তম পর্ব
“পিতর খুন হয়ে গিয়েছে” – খবরটা পেতেই আমি কেমন দিশেহারা হয়ে পড়লাম। ‘দক্ষিণ দেশ’ গোষ্ঠীর সর্বোচ্চ কমিটির মিটিং। তার মানে সংগঠনের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিরাই আসবেন। আমাকে জয়নগর স্টেশন থেকে তাঁদের নিয়ে রামভদ্রপুর গ্রামে পৌঁছে দিতে হবে সন্ধের মধ্যে। কিন্তু যে ঘটনা ঘটে গেছে, তাতে রামভদ্রপুরে মিটিং হওয়া কিছুতেই সম্ভব নয়। হটনগরের খুনের ঘটনাটা ঘটেছে সকালের দিকে। তারপর সেই গ্রামের অবস্থা কী, তার কিছুই আমি জানি না, জানার কোনো উপায়ও নেই। তবে এটা নিশ্চিত যে, এর মধ্যে নিশ্চয়ই সেখানে পুলিশ পৌঁছে গেছে। ‘খুনি’দের সন্ধানে পুলিশ নিঃসন্দেহে তোলপাড় শুরু করে দিয়েছে।
আরও পড়ুন
শাবলের এক ঘায়ে ‘খতম’ হয়ে গেল চৌকিদার
অথচ, যাঁরা আসবেন, তাঁদের ঠাঁই ঠিকানা কিছুই আমার জানা নেই। এখানকার মতো ফোনের ব্যবস্থাও তখন ছিল না। আর, যাঁরা আসবেন, তাঁদের মধ্যে কয়েকজনকে মাত্র আমি চিনি, অধিকাংশদের চিনি না। আমার চেনা নেতৃস্থানীয়দের কয়েকজন তাঁদের নিয়ে আসবেন। আমাকে বিকেল চারটে থেকে জয়নগর স্টেশনে ওঁদের অপেক্ষায় থাকতে হবে। তারপর একে একে সবাই জড়ো হলে আমাকে সুকৌশলে তাঁদের নিয়ে জয়নগরের পশ্চিম দিকে মাঠের মধ্যে হেঁটে গিয়ে তাঁদের সঠিক ডেরায় পৌঁছে দিতে হবে। দূরত্ব কম করে সাত-আট মাইল। আমার তখন বিহ্বল অবস্থা।
কাছেই ছিল বিষ্ণুপুর মহাশ্মশান। আমি সেই শ্মশানে বসে খানিকটা সময় কাটিয়ে তিনটে-সাড়ে তিনটের মধ্যে জয়নগর স্টেশনে পৌঁছে গেলাম। কিন্তু, স্টেশনে বসে থাকাটা আমার কাছে শ্রেয় মনে হল না। রামভদ্রপুর গ্রামে জয়নগর স্টেশনে নেমে যেমন যাওয়া যায়, তেমনি, ডায়মন্ড হারবার লাইনে মগরাহাট স্টেশনে নেমেও যাওয়া যায়। পুলিশ খুনির সন্ধানে দুই স্টেশনেই জাল পাততে পারে। তাই ভালো মানুষের মতো এধার ওধার ঘুরে বেড়িয়ে চারটের পর থেকে ডাউন ট্রেনগুলির আসা-যাওয়ার প্রতি নজর রেখে চেনা লোক খুঁজতে লাগলাম। একে একে চেনা দু’একজনকে ট্রেন থেকে নামতে দেখলাম। তার মধ্যে যে সবচেয়ে পরিচিত, তাঁকে একপাশে ডেকে নিয়ে গিয়ে কানে কানে কথাটা জানালাম।
কিন্তু, এক ট্রেনে সবাই এল না। সময় রক্ষা করে চলা আমাদের দেশের কমিউনিস্টদের মধ্যে খুব কম লোকের মধ্যেই আমি দেখেছি। আমি একবার মাস্টারমশাই তথা অমূল্য সেনকে জানিয়েছিলাম, “আমার অভিজ্ঞতায় ১৫-১৬টা মিটিং-এ আপনাকে ঠিক সময়ে উপস্থিত হতে দেখিনি”। মাস্টারমশাই “এরকম হয়েই থাকে” বলে আমার অভিযোগকে এড়িয়ে গিয়েছিলেন। সেদিনও প্রায় সাড়ে আটটা পর্যন্ত আমাকে স্টেশনে কাটাতে হয়েছিল – কিন্তু সবাই এসে পৌঁছননি।
(চলবে)
