
উত্তরপাড়া কলেজে পুরোনো দিনের ছাত্র রাজনীতির গল্প
জমিদারিহীন জমিদারদের ভাঙা বাড়িতে দিন পনের জেল জীবন যাপন করে জেল থেকে বেরিয়ে দেখলাম, কলেজে আমি কেউকেটাদের একজন হয়ে গেছি। ছাত্র-সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে যাই অনায়াসে। ক্লাসে ক্লাসে বক্তৃতা দেওয়ার গুণ অর্জন করে ফেলি। আইএ পাশ করে অতঃপর কোন্নগর কলেজ ছেড়ে উত্তরপাড়া কলেজে এসে ভর্তি হই। উত্তরপাড়া কলেজে এসে ক’দিনের মধ্যে ‘ছাত্রনেতা’-দের একজন হয়ে উঠি। ছাত্র ও শিক্ষক মহলের অনেকের ভালোবাসা পেয়ে আমি হয়ে উঠি একজন নতুন যুবক। উত্তরপাড়া কলেজ ছাত্র ফেডারেশনের তখন খুব নাম ডাক। আমার বিকাশ ঘটে সেই ছাত্র ফেডারেশনের নেতৃত্ব হিসেবে। ছাত্র সংসদও আমাদের দখলে। আমাদের শক্তি ও ছাত্রছাত্রীদের সমর্থন এত ছিল যে কংগ্রেসি ছাত্র পরিষদের সদস্যদের দেখলে মনে হত মিঁউ মিঁউ বেড়াল ছানা। তবে সংসদ নির্বাচনে আমি কখনও দাঁড়াইনি, সম্পাদক-টম্পাদক হওয়ার কোনো প্রশ্নই ছিল না। কলেজের অধ্যক্ষ কিরণ গুপ্ত আমাকে বলতেন – আমি নাকি কংগ্রেসের নেতা অতুল্য ঘোষের মতো, সব বিষয়ে পেছন থেকে কলকাঠি নাড়ি – সামনে আমাকে কেউ দেখতে পায় না!
উত্তরপাড়া কলেজে পড়ার সময় আমি অনেক কিছু পেয়েছি – ছাত্র-ছাত্রী-বন্ধুদের সাহায্য, সহযোগিতা ও ভালোবাসা পেয়েছি উজার করা। এই কলেজের তরুণ কবিদের মুখপত্রের প্রকাশে আমি ছিলাম মুখ্য ভূমিকায়। ছাত্র ফেডারেশনের পত্রিকা ‘অভিযান’-এ লিখি, ছবি আঁকি এবং প্রকাশ করি মূলত আমি। ছাত্রছাত্রীদের অভাব-অভিযোগের প্রতিকারে যে কোনো পরিশ্রম করতে আমি ও আমরা কখনও গররাজি হইনি। ক্লাসে ক্লাসে বক্তৃতা দেওয়ার সময় আমি ছাত্র পরিষদের ছেলেদের নাস্তানাবুদ করতে ছিলাম অদ্বিতীয়। কলেজের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রধান সংগঠকের ভূমিকা পালন করতে কত পরিশ্রমই না করতে হয়েছে অনেকের সঙ্গে আমাকে। কোনো কোনো ছাত্রী বন্ধু আমাকে ভালোবাসার বাঁধনেও বাঁধতে চেয়েছে – আমি সে ভালোবাসায় আলোড়িত যে হইনি তা নয়। কিন্তু পাছে আমাদের ছাত্র সংগঠনের বদনাম রটে, তাই নিজেকে সংযত রাখার চেষ্টা করেছি। কিন্তু সব ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করতে পারিনি। একটি মজার ঘটনা এক্ষেত্রে উল্লেখ না করলেই নয়। ঘটনাটি এই:
সেবার কলেজের ছাত্রছাত্রীদের কবিতা প্রকাশের জন্য অনুমতিপ্রাপ্ত দেওয়াল পত্রিকা (যার সম্পাদক ছিলাম আমি) ‘ঋত্বিক’-এ একটি কবিতা প্রকাশিত হয়। কবিতাটি লিখেছিলেন অমিতা দত্ত নামে আমাদের একজন ছাত্রী বন্ধু। খুব ভালো কবিতা লিখত অমিতা। প্রকাশিত কবিতাটির দু’চারটি লাইন এখনও আমার মনে পড়ে –
“গাইবো কি ছায়ানট হিন্দোল পূরবী
কিংবা বসন্তের গান,
আমি তো গাইতে পারি মুহূর্তেই বেঁধে নিয়ে তার
তোমার দুচোখে তবু পাথরের মতো পরিম্লান”।
এ পর্যন্ত কবিতাটিতে কোনো অসুবিধে ছিল না। কিন্তু গোল বাঁধল শেষ লাইনে এসে –
“তোমাকে সাজাতে চাই
মাতৃত্বের মায়াবী কাজলে”।
“মাতৃত্বের মায়াবী কাজলে” সাজাতে চাওয়াটির মধ্যে অশ্লীলতার গন্ধ পেলেন কয়েকজন প্রবীণ কলেজশিক্ষক। এঁরা সব সময়েই অধ্যক্ষ কিরণ গুপ্তের ঘরে তাঁকে ঘিরে বসে থাকতেন। তাঁদেরই কোনো একজন সম্ভবত প্রিন্সিপ্যালের কানে কবিতাটির কথা তুলে দিলেন এবং তাঁদের ‘প্ররোচনা’য় একদিন প্রিন্সিপ্যালের ঘরে আমার ডাক পড়ল। মৌখিক নির্দেশিকা জারি হল, ‘ঋত্বিক’-এর কোনো সংখ্যাই উপাধ্যক্ষ শ্যামাচরণ বাবুকে দিয়ে ‘সেন্সর’ না করিয়ে টাঙানো যাবে না।
(চলবে)
ছবি সূত্র – রাজা প্যারি মোহন কলেজ
