
ভিটে ছাড়ার কথায় বাবার চোখে জল। বৌদির ওপর রাগ উজাড় হয় আচারের কৌটোয়
বাবার হাতে লেখা চিঠি মাঝে মাঝে আসত দাদার কাছে। মায়ের কোনও চিঠিপত্র আসত না। এদেশে আসার পর বাবা দু’বার এসেছিলেন ওই রাম ব্যানার্জি লেনে। কিন্তু দাদা-বৌদির সঙ্গে বাবার কোথাও যেন একটা হৃদ্যতার অভাব ছিল। কিন্তু, কারণটা বোঝার মতো বয়সে আমরা তখনও পৌঁছইনি।
বাবা কলকাতা এলে পদ্মপুকুরে আমার ছোটো মামা-ছোটো মামির বাড়িতে যেতেন আমাকে সঙ্গে নিয়ে। ওখানে মামারা ভাড়া থাকতেন। সে বাড়িতে মামির সঙ্গে কথাবার্তা বলতে বলতে বাবাকে চোখের জল ফেলতে দেখতাম। সে কথাবার্তা যে দাদা-বৌদিকে নিয়েই– তা বুঝতে পারতাম আমি। এটাও বুঝতে পারতাম—বৌদি বাবাকে খুব একটা শ্রদ্ধা-ভক্তি করত না। কার দোষ মুখ্য তা অবশ্য সে’সময় আমার ও ছোটদির উপলব্ধির বাইরে ছিল।
বৌদিকে আমি ও ছোটদি আড়ালে একটা বিশেষ নামে ডাকতাম– ‘লাগাইন্যা বুড়ি’। এ নাম দেওয়ার কারণও ছিল। রাতে আমাকে আর ছোটদিকে আগে-ভাগেই খাইয়ে দিত বৌদি। আমরা শুয়ে পড়লে দাদা-বৌদি খেতে বসত। আর খেতে বসেই শুরু হত বৌদির রিপোর্টিং। সারাদিন এ বাড়িতে কোথায় কী ঘটেছে, কে কী বলেছে, করেছে তার রিপোর্ট তো ছিলই, আর ছিল আমি ও ছোটদি কখন কী করেছি তার রিপোর্টিং-ও। আমরা ঘুম না আসা পর্যন্ত চেষ্টা করতাম, বৌদি দাদার কাছে আমাদের নামে কী কী লাগাচ্ছে বোঝার চেষ্টা করতে। ছোটদি আমার কানে কানে বলত—‘লাগাইন্যা বুড়ির পাঁচালি শুরু হল।’
তবে, আমার বিরুদ্ধেই নালিশটা বেশি থাকত। দাদা বাজার থেকে অর্ধেক নারকেল কিনে আনত। বৌদি প্রায়ই সে নারকেলে আমার দাঁতের চিহ্ন আবিষ্কার করত। বৌদির মাধ্যমে দাদাও সেটা জানতে পারত। কনডেন্সড মিল্কের ছোটো ছোটো কৌটো কিনে আনত দাদা। সে কৌটোর ঢাকনায় হাতুরি আর পেরেক ব্যবহারে দুটো ফুটো করা হত। তারপর, কাগজ মুড়ে ঢুকিয়ে দিয়ে সেই ফুটো বন্ধ করে রাখা হত। চা করার সময় সেই ঘন দুধ ঢেলে ব্যবহার করত বৌদি। আমাদের ঘরের জানলার ওপরে একটা তাক ছিল। সেই তাকে টুকি-টাকি অনেক জিনিসের সঙ্গে ঐ কনডেন্সড মিল্কের কৌটাটাও তোলা থাকত। আমি ছোটদির কাঁধে দাঁড়িয়ে ঐ কৌটোটা আমার হাঁ মুখে উপুড় করতাম। ভিতরের ঘন দুধ আমার মুখে এসে পড়তে একটু সময় নিত। এর মধ্যে আমার ভার বইতে না পেরে ছোটদি ছটফট করলে আমি ওকে গাল পারতাম। একদিন বৌদি সে সময়ে ঘরে ঢুকে পড়ায় ব্যাপারটা কেঁচে গিয়েছিল—সেদিন রাতের রিপোর্টিং-এ সেড়া স্বাভাবিকভাবেই অন্তর্ভুক্ত হয়ে গিয়েছিল।
এই ধরণের নানা রিপোর্টের সঙ্গে একটা রেগুলার রিপোর্টিং আইটেম ছিল—আমি স্নান করতে গেলে আমার দড়িওয়ালা প্যান্টের পকেট সার্চ করে বৌদি কত পেল, তার হিসেব দাদার কাছে পেশ করা। আমাকে মুদির দোকান থেকে কিছু কিনতে পাঠালে দু’চার আনা অনায়াসে কামিয়ে নিতাম। বৌদিও অবশ্য কয়েকদিনের মধ্যে আমাকে জব্দ করার বিদ্যে আয়ত্ত করে ফেলেছিল। কম কম জিনিস কিনতে পাঠাত, তার জন্য পয়সাও দিত কম—তা থেকে আর রোজগারের উপায় থাকত না আমার। এসব কারণে বৌদিকে আমরা দুজনেই খুব একটা পছন্দ করতাম না। বড়ো হলে আমরা চাকরি খোঁজার চেষ্টা করব আর একটা আলাদা বাড়ি ভাড়া নিয়ে চলে যাব—এমন কত পরিকল্পনাই না করতাম আমরা। ছোটদি বলত—‘প্রথম মাসের মায়না পাইলে কনডেন্সড মিল্কের একটা বড়ো কৌটা কিন্যা দুজনে আরাম কইর্যা খামু, কী কস্?’ আমি বলতাম, ‘দুইডা কৌটা কিনুম। তুই একডা খাবি আর আমি একডা খামু!’ ছোটদি সাবধান করত, ‘ঘন দুধ বেশি খাইলে পেট ছাইড়্যা দিতে পারে কিন্তু।’ আমি উড়িয়ে দিতাম সেসব—‘ছাড়ুক, তোর ডর লাগলে তুই খাইস না।’ ছোটদি উত্তর দিত, ‘আমি তোরে খাইতে দিলে ত’!’
সেবার কয়েকদিনের জন্য বাবা কলকাতা এলেন। তখন বেলেঘাটা অঞ্চল জলা-জঙ্গলে ভর্তি। লোকে বলত—যার নাই পুঁজিপাটা, সে যায় বেলেঘাটা।’ জমির দামও ছিল সস্তা। দাদা বাবাকে বলল, ‘দ্যাশের জমিজমা যেটুক আছে তা বেইচ্যা তুমি আর মা এইখানে চইল্যা আসো। বেলেঘাটায় সে টাকায় এক খণ্ড জমি কিইন্যা একখান ছোটোখাটো বাড়ি বানাইয়া নিমু আমরা।’
বাবা দাদার মুখের দিকে কিছুক্ষণ অবাক হয়ে চেয়ে রইলেন। চোখদুটো ছলছল করে উঠল। বললেন—‘আমি পিতৃভিটা ত্যাগ কইর্যা আইতে পারুম না।’ ব্যাস, এইটুকুই। দাদাও আর ওই প্রশ্ন তুলে কোনো কথা বলল না। বেলেঘাটা পর্ব এখানেই ইতি হয়ে গেল।
বৌদি যে বাবার এই মত ভালোভাবে গ্রহণ করতে পারেনি, তা বোঝা গেল দাদা-বৌদির রাতের খাবার ‘মিটিং’-এ। আমাদের কানে বৌদির একটা কথাই এসেছিল—‘সুখে থাকতে ভূতে কিলানো এরেই কয়।’
আর, তার পরদিনই একটা সাংঘাতিক ঘটনা ঘটে গেল। রাম ব্যানার্জি লেনের বাড়ির তিন তলায় আমাদের রান্নাঘর ছিল আগেই বলেছি। তার পাশে ছিল একটুকরো ছাদ, সে ছাদ ছিল সর্বজনীন। সেই ছাদে কাপড় রৌদ্রে দেওয়া হত যেমন, তেমনই আচার-টাচারও রোদ খাওয়ানো হত। শীতের দিনে দুপুরের খাওয়া-দাওয়ার শেষে বৌদি, গীতার মা ও অন্যান্যরা পিঠগুলো রোদে তাতিয়ে নিত ওখানেই।
একদিন ছাদে এসে আমি দেখি, একটি পাথরের বাটিতে অনেকগুলো লেবু নুনজলে ডুবিয়ে ছাদের রোদে এসে রেখে গেল হেলি। আমি তখন ছাদের গঙ্গাজলের ট্যাঙ্কটার উপর বসে ঘুড়ি ওড়ানো দেখছিলাম। হেলি আমাকে দেখতে পায়নি। আমি ট্যাঙ্কের ওপর থেকে লাফিয়ে নেমে একটা লেবু তুলে মুখে পুরে দিয়েই ‘ওয়াক’ করে বমি করে ফেললাম ছাদের রেলিং থেকে নিচের রাস্তায়। ঠিক সেই সময়ে হেলি কাপড় রোদে দিতে এসে লেবুর বাটিতে একটা লেবু কম দেখে চেঁচামেচি জুড়ে দিল। আমি হেলির সামনে দিয়ে চোরের মতো দৌড়ে নেমে গেলাম নিচে। হেলি আমাকে ‘লেবু চোর’ বলে গাল দিয়ে বাড়ি মাতিয়ে তুলল। বৌদির ওপর তার পুরোনো রাগ তো ছিলই। এই সুযোগে সেই রাগ সে ঝালিয়ে নিল ফের। বৌদি আমাকে কান ধরে ছাদে নিয়ে এসে হেলির সামনে দেওয়ালে আমার মাথা ঠুকে দিয়ে প্রমাণ করল—বাঙালরা চোর-চোট্টামোকে প্রশ্রয় দেয় না এতটুকুও।
আরও পড়ুন
বাস্তুহারাদের বাস্তুশাপের গল্প
ঐ অপমানের বদলা নিতে আমার দেরি হল না। বাবা দেশ থেকে এসেছেন। দু’দিন বাদে চলে যাবেন। বৌদি রান্নাঘরে ভাতের হাঁড়ি উপুড় করে দিয়ে নিচে কী একটা করতে গেছে। বাবা দোতলায় আমাদের ঘরে বসে দেশ থেকে বয়ে আনা হুঁকো টানছে। দাদা কাজে যাওয়ার আগে বাজার থেকে জ্যান্ত ল্যাটা মাছে এনেছে, বৌদি একটা হাঁড়িতে জল দিয়ে মাছগুলোকে জিইয়ে রাখছে। বৌদিকে নিচের ঘরে যেতে দেখে আমি চোঁ করে ওপরে রান্নাঘরে চলে গেলাম। একটা ল্যাটা মাছ হাঁড়ি থেকে বের করে নিয়ে গঙ্গার জলের ট্যাঙ্কের ঢাকনা খুলে তাতে ছেড়ে দিয়ে মাছটা ঘোলাজলে কী করছে দেখায় ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। এমন সময় হেলি ওদের সেই লেবুসমেত পাথর-বাটিটা রোদে দিয়ে তার ওপর একটা ঝুড়ি চাপা দিয়ে নিচে নেমে গেল। আমিও সেই সুযোগে গঙ্গাজলের ট্যাঙ্ক থেকে লাফ দিয়ে নেমে এদিক-ওদিক দেখে হেলিদের লেবুর বাটির ঢাকনা উলটে তার মধ্যে হিসি করে দিলাম ছরছর করে। আমি লক্ষ্যই করিনি—বৌদি কখন আমার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে। আমার এই কাণ্ড দেখে বৌদি আর সহ্য করতে পারল না। আমার গলাটা টিপে ধরে রাগে গরগর করতে করতে বলতে লাগল—‘আজ তোরে মাইর্যাই ফালামু, শেষ কইর্যা দিমু একেবারে।’
আত্মরক্ষার তাগিদে চিৎকার করে বাবাকে ডাকতে লাগলাম—‘ও বাবা, বৌদি আমারে মাইর্যা ফালাইলো। আমারে বাঁচাও…’ বাবা আমার চিৎকার শুনে ছাদে পৌঁছে রণরঙ্গিণী বৌদির হাত থেকে আমায় ছিনিয়ে নিয়ে বললেন, ‘তোমার এত দুঃসাহস! তুমি আমার পোলাটারে মাইর্যা ফালাইতে চাও! আমি কাইলই অ’রে দ্যাশে ফিরত নিয়া যামু। দরকার নাই লেখাপড়া কইর্যা।’
রাতে দাদা বাড়ি ফিরলে বাবা বলল, ‘আমি কাইলই দ্যাশে ফিইর্যা যামু। নেপুরেও সঙ্গে লইয়্যা যামু।’ নেপু আমারই ডাকনাম।
আসল ঘটনাটা কী, তার রিপোর্ট সে রাতেই দাদা পেয়ে গেল বৌদির কাছ থেকে। ছোটদি আমার কানে কানে বলল—‘ভাই, তুই বাবার সঙ্গে যাইস না। তা হইলে আর তর লেখাপড়া হইব না।’ লেখা-পড়াটা যে কতখানি দরকারি তা আমি ছোটদির পরামর্শ থেকে মুহূর্তেই বুঝে ফেললাম।
বাবা তার পরের দিনই দেশে ফিরে গেলেন। যাওয়ার সময় তাঁর সাধের পোলা নেপুকে কেউ খুঁজেই পেল না। নেপু তখন বাড়ি থেকে হাওয়া।
