ঠগ-জোচ্চোরদের যুগে কুল-মান হারিয়েছে ‘সিঁধেল চোর’

সিঁধেল চোর – বাংলার রোমাঞ্চকর চুরির ইতিহাস

জোড়াসাঁকো এলাকায় মদের দোকানে দেওয়াল কেটে চুরির অভিযোগে পাঁচ 'সিঁধেল চোর'কে গ্রেফতার করেছে বড়বাজার থানার পুলিশ। তাদের থেকে চুরি যাওয়া ৩০ বোতল মদ উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশ সূত্রে খবর, প্রত্যেকেই ফুটপাথবাসী। চুরি করা মদ ফুটপাথেই লুকিয়ে রেখেছিল তারা। সেখান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, "এরা ছোটখাটো চোর বলেই মনে হচ্ছে। যেহেতু লকডাউনে মদের দোকান বন্ধ তাই বিভিন্ন জায়গায় মদের কালোবাজারি হচ্ছে। দ্বিগুণ-তিনগুণ দামে মদ বিক্রি হচ্ছে। সোনার থেকেও মদ এখন দামি। তাই মদ চুরি করে বিক্রি করতে পারলে সোনার থেকেও বেশি দাম পাওয়া যাবে, সেজন্যই হয়ত দেওয়াল কেটে চুরি করেছে এরা।"

সংবাদমাধ্যমে এই খবর বেরিয়ে ছিল ১৯ এপ্রিল, ২০২০-তে। তার মানে এখনও রয়ে গিয়েছে সিঁধেল চোরেরা? উল্লিখিত ঘটনায় চোরেরা চুরি করার জন্য দেওয়াল কেটেছিল ঠিকই, তবে আসল ‘সিঁধেল চোর’দের গল্প ছিল অন্য। সিঁধ কেটে চুরি করা ছিল রীতিমত একটা শিল্পকর্ম, এই ঘটনায় তার ছিটেফোঁটাও পাওয়া না। সেইসব সময় চলে গিয়েছে, যখন চুরি ছিল রোমাঞ্চকর একটা ঘটনা। শুধু পেটের খিদে নয়, তখন চুরির সঙ্গে জড়িয়ে থাকত মনের খিদেও। আর সেকারণেই বিভিন্ন সময়ে চৌর্যবৃত্তি হয়ে উঠতে পেরেছিল শিল্প-সাহিত্যের রসদ। সাহিত্যে, সিনেমায়, টেলিভিশনে বারবার নজর কেড়েছে ‘সিঁধেল চোর’।

কি ছার কপাল মোর      আমি মাসি হব তোর।

মাসি মাসি কয়ে           ছিলি বাসা লয়ে

কে জানে সিঁধেল চোর।।

অষ্টাদশ শতকের শ্রেষ্ঠ বাঙালি কবিদের অন্যতম রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র তাঁর মালিনী নিগ্রহ (বিদ্যাসুন্দর, অন্নদামঙ্গল কাব্য, ২য় খণ্ড)-তে সিঁধেল চোরদের নিয়ে এমন কাব্য রচনা করেছিলেন।‘সিঁধেল চোর’ হল সিঁধকাঠি দিয়ে সিঁধ কেটে চুরি করে এমন চোর, এটা সকলেরই জানা। সবচেয়ে কঠিন এবং সূক্ষ চুরিবিদ্যা। অনেক দিন ধরে ভক্তি সহকারে একজন গুরুর কছে এ 'বিদ্যা' অর্জন করতে হয়। খুবই বুদ্ধিমত্তার কাজ। সাহস এবং শিল্প দুটোই খুব বেশি পরিমান লাগে এই কাজে।

চুরিবিদ্যা বড় বিদ্যা, কথাটা তো আর এমনি এমনি আসেনি, চুরিবিদ্যা দশমহাবিদ্যার অন্তর্গত অন্যতম এক বৃত্তি। এখন পাঠক যদি প্রশ্ন তোলেন “কি হবে চুরির গল্প অথবা চুরির কৌশল জেনে? চৌর্যকর্ম বিহিত-কর্ম তো নয়ই, বরং নিষিদ্ধ-কর্ম”, তবে তাদের উদ্দেশ্যে বলে রাখি, এই প্রশ্নের সম্মুখীন সব চৌর্য-শাস্ত্রকে হতে হয়েছে এবং এই প্রশ্নের উত্তর তাঁরা দিয়েছেন এইভাবে যে– চোর-শাস্ত্র জানলে মানুষের বুদ্ধি বাড়ে, মানুষ চতুর হয়।সিঁধ (সংস্কৃত ভাষায় সন্ধি) কাটা আবার যেমন তেমন ব্যাপার নয়, খন্তায় করে ধীরে ধীরে শুরু করতে হবে মাটি কাটা-অত্যন্ত নরম হাতের কাজ। সঙ্গী লোক দু-হাতে অঞ্জলি পেতে সিঁধের নিচে ধরে থাকবে। মাটি যা পড়বে সব হাতের উপর। সঙ্গে হাড়ি থাকলে ভাল। হাত ভর্তি মাটি হাড়িতে করে ফেলে আসতে হবে দূরে। সিঁধ কেটে দেয়াল একেবারেই ফাঁক করতে নেই, কিছু বাকি রেখে দিতে হয়। মুরুব্বিদের অভিমত হল মেটে দেওয়াল হলে চার-পাঁচ ইঞ্চির মতো, ইটের গাঁথনি হলে একখানা ইট বাকি রেখে দেবে। বলে রাখা ভাল সিঁধ বস্তুটা আজকের নয়। হাজার দু’য়েক বছর আগেও উৎকৃষ্ট সিঁধের খবর মিলছে। এই সিঁধ সাত প্রকার :

“পদ্মব্যাকোশং ভাস্করং বালচন্দ্রং/ বাপী বিস্তীর্ণং স্বস্তিকং পূর্ণকুম্ভম।”

পদ্মব্যাকোষ অর্থাৎ ফুটন্ত পদ্মফুলের মতো সিঁধ, ভাস্কর অর্থাৎ সূর্যের মতো গোলাকার, বালচন্দ্র অর্থাৎ কাস্তের আকারের চাঁদের মতো, বাপী অর্থাৎ পুকুরের মতো চৌকোণা, বিস্তীর্ণ অর্থাৎ অনেকখানি চওড়া। এ ছাড়া রয়েছে স্বস্তিকের চেহারার সিঁধ আর পূর্ণকুম্ভের চেহারার সিঁধ। মোট এই সাত। মুরুব্বিদের অভিমত হলো সিঁধ কেটে দেয়াল একেবারে ফাঁক করতে নেই, কিছুটা বাকি রেখে দিতে হয়। মেটে দেয়াল হলে চার-পাঁচ ইঞ্চির মতো, ইটের গাঁথনি হলে একখানা ইট।

যেন-তেন প্রকারেণ সিঁধ কাটলে চলবে না, দেহের মাপজোক সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকা চাই, যাতে সিঁধের মধ্যে দিয়ে নিজের পুরো শরীর গলিয়ে দেওয়া যায়। সিঁধকাঠি ছাড়াও সঙ্গে রাখতে হবে সুতো। সুতোর অনেক কাজ। হয়তো দরজায় খিল দেওয়া আছে- সুতোর মাথায় বড়শি গেঁথে দাও নামিয়ে। তারপর বড়শি দরজার খিলে আটকে গেলে সন্তর্পণে সুতোতে দাও টান। এছাড়াও আছে। রাত্রিবেলা অন্ধকারের মধ্যে বসে কাজ- হয়তো সাপে দিলো কামড়ে। ঐ সুতোয় তাগা বেধে তখন যাওয়া যাবে ওঝার বাড়ি। ব্রাক্ষ্মণ হলে অবশ্য একটা সুবিধা আছে। সুতো নিয়ে যেতে ভুলে গেলেও গলায় আছে উপবীত। খুলে হাতে জড়িয়ে নিলেই হল। শর্বিলকের ক্ষেত্রেই ঘটেছে এই ঘটনা:

“হায়! কি কষ্ট! পরিমাণ সূত্রটি আনিতে বিস্মৃত হইয়াছি! এই যজ্ঞোপবীত টিই পরিমাণ সূত্র হইবে।”

সিঁধ কাটার কৌলীন্য প্রচার করার জন্য শর্বিলক মহাভারতের সৌপ্তিক পর্বের অশ্বত্থামার সিঁধ কেটে পাণ্ডব-সন্তানদের হত্যার কথা উল্লেখ করেছেন। সিঁধ কেটে প্রথমে পাততে হয় কান। নিশ্বাসের শব্দ শুনে বুঝে নিতে হয় অন্দরের বাসিন্দাদের গতিবিধি। শর্বিলক ভেবেছেন: “ইহারা ছল পূর্বক নিদ্রিত অথবা পরমার্থতঃ নিদ্রিত হইয়া রহিয়াছে, অগ্রে পরীক্ষা করিয়া দেখা যাউক।” 

ব্যাপারটা এককথায় অসাধারণ। যদি মনে হয় কেউ হাল্কা জেগে আছে তার জন্য আছে ঘুমপাড়ানি মন্ত্র, যাকে চলতি ভাষায় বলে ‘নিদালী মন্ত্র’, বেদের কালে একে বলা হতো ‘অবস্বপনিকা’। এই মন্ত্রে হাল্কা ঘুম গভীর হয়, আর জেগে থাকা মানুষ ঘুমে অচেতন হয়ে যায়। মন্ত্র চলতি ভাষায় এমন শুনতে:

নিদ্রাউলি নিদ্রাউলি,

নাকের শোয়াসে তুললাম মঞ্চপের ধূলি

ঘরে ঘুমোয় কুকুর-বিড়ালি

জলে ঘুমায় বউ,

নিদালি-মন্তোরের গুণে

ঘুমাইয়া এক গিরস্তর বেটা-বউ।

রয়েছে হরেক রকমের গাছ-গুল্ম। ঘরে ঢুকে কিছু পাতা যে খাটে গৃহস্বামীর শুয়ে আছে তার খাটের তলায় রেখে আগুন ধরিয়ে দাও। আগুনটা নিভিয়ে দিলে ধোঁয়া বের হবে। ধোঁয়া নাকের ভিতর গেলে সমস্ত শরীর আচ্ছন্ন হয়ে আসবে। আরও আছে-সেই পাতার বিড়ি থাকবে চোরের মুখে। একদিকে চলবে নিপুণ হাতের কাজ, অন্যদিকে কান থাকবে মক্কেলের নিঃশ্বাস ওঠা-নামার উপর। উসখুস শুনলেই বিড়িতে টান দিয়ে পরিমাণ মতো ধোঁয়া ছাড়বে নাকে। ব্যস, কেল্লা ফতে!

সিঁধ কাটা আর ভিতরে ঢোকার আগে ভেতরে কেউ জেগে বসে আছে কিনা বোঝার জন্য ছিল নকল মানুষ প্রবেশ করানোর রীতি। এর নাম প্রতিপুরুষ – “প্রতিপুরুষং নিবেশয়ামি”। ঘরে ঢুকে প্রথম কাজ দরজা খুলে ভেজিয়ে রাখা যাতে পালাতে কোনো অসুবিধা না হয় – “আত্মরক্ষার্থং দ্বারমুদ্ঘাটয়ামি” আর পুরনো দরজা খুলতে গিয়ে যদি শব্দ হয়? তারও উপায় আছে– দরজার জোড়গুলো জল দিয়ে ভিজিয়ে দেওয়া। ঘরে ঢুকে অন্ধকারে মালের হদিশ পাবার উপায়? 

মৃচ্ছকটিক নাটকে আছে মন্ত্রপূত বীজ– ঘরে ঢুকে মেঝের উপর ছড়িয়ে দিতে হয়। মাল যেখানে আছে সেখানে বীজগুলো ফটফট করে ফুটে যাবে, অন্যত্র ফুটবে না। অর্বাচীন চোরেরা সাদা মটরদানা ছড়িয়ে দেয়। মটরদানা গড়িয়ে গিয়ে বিভিন্ন বিভিন্ন জিনিসে ধাক্কা খায় আর সেই বিভিন্ন প্রকার শব্দ শুনে চোরকে বুঝে নিতে হয় কোথায় কত দূরে কোন জিনিস আছে। “কথারত্নাকর” এ আছে একরকমের শিকড়ের উল্লেখ– বাক্স পেঁটরায় শিকড় ঝুলিয়ে মালের হদিশ পাওয়া যায়। রয়েছে যোগবর্তিকা জ্বালানোর কথা, যা জ্বালিয়ে দিলে গৃহস্থের চোখে ধাঁধাঁ লাগবে, চোরকে দেখতে পাবে না। কিন্তু সেই আলোয় সব কিছু চোরের নজরে পড়বে।

তারাপদ রায় আবার তাঁর ‘কাণ্ডজ্ঞান’-এ লিখেছেন খাঁটি চোরেদের কথা। আসল ও আদি চোরেদের দুঃখের কথা। চোর দুই রকমের, এক পুরুষের নতুন চোর অথবা বংশানুক্রমে বনেদি চোর-বংশের সন্তান। এর মধ্যে নতুন চোরদের কষ্ট বেশি। সিঁধকাঠি দুর্লভ, যা দু-একটা গভীর রাতের অন্ধকারে কামারশালার পিছনের ঝোপে লুকিয়ে থাকে মশার কামড় খেয়ে কিনতে হয় তারও দাম বেশি। কিন্তু যাঁদের বাপ ঠাকুরদা চোর ছিলেন, তাঁরা উত্তরাধিকারসূত্রে জার্মান স্টিলের সিঁধকাঠি পেতেন, এ উদাহরণ কি আজ আর পাওয়া যাবে? পাকা ইঁটের দেওয়াল ফুটো করতে কাঁচা লোহার সিঁধকাঠির উপর নাকি ঠিক নির্ভর করা যেত না।

সিঁধেল চোরদের বিবরণ দিতে গিয়ে তিনি আরও বলেছেন, এই ধরণের চোরেদের মূল সমস্যা হল দু’টি—চুরি করার পোষাক, সিঁধকাঠি। এছাড়া গায়ে তেল মাখার একটা ব্যাপার ছিল। চুরি করার আগে শরীরের ওপরের অংশে ভালো করে তেল মেখে নিতে হত। তেলের আগে বিলিতি গ্রীজ মাখার চল ছিল।দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগে পর্যন্ত নিউমার্কেটে ম্যাকফারলন সাহেবের দোকানে ক্রিমরঙা গ্রীজের এক পাউন্ডের কৌটো পাওয়া যেতো দেড় টাকায়। প্যাচপ্যাচে ছিল না, গা কুটকুট করতো না। তারপর গ্রীজের চল উঠে গিয়ে তার জায়গায় আসে মাখেন পোড়া মবিল-অয়েল। দাম বেশি, সাংঘাতিক কুটকুটে এবং বিষাক্ত। এই পোড়া মবিলের কারণে শত সহস্র নিরাপরাধ তস্করের টাকায় চর্মরোগের ডাক্তারদের বিশাল রমরমাও হয়েছিল। শৌখন বা বড়লোক চোরেরা একটা বেশি দাম দিয়ে হোয়াইট ভেসলিন মাখত। আগেকার দিনে চোরেরা কদমছাঁট দিত, যাদের চুল মুঠো করে ধরার মতো দৈর্ঘ্যের ছিল তারা চুলেও ভালো করে তেল মেখে চুরি করতে যেত।

তারপর… জল এখন অনেক দূরই গড়িয়েছে, ডাকাত-ঠগ-জোচ্চোর এবং 'সাধু'দের যুগে ক্রমে কুল-মান হারিয়েছে ‘গুণী’ সিঁধেল চোরেরা, সেইসঙ্গে ভ্যানিশ হয়ে গিয়েছে 'অরগ্যানিক' চৌর্য রীতিনীতিও।   

গ্রন্থসূত্রঃ

কাণ্ডজ্ঞান, তারাপদ রায়

নিশি-কুটুম্ব, মনোজ বসু

ক্রাইম কাহিনীর কালক্রান্তি, সুকুমার সেন

মৃচ্ছকটিক শূদ্রক বঙ্গানুবাদ, বরদাপ্রসাদ মজুমদার

 

 

Developed by DXDasia