
এখনকার মূর্তির বয়সও দু’শ বছরের কম নয়
দীপ্তিময় রায়
নদীয়া জেলার সব ডিভিসন শহর রানাঘাট কলকাতা থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার উত্তরে। শহরটিতে লোকবসতি ঘন, ভাল বাজার হাট, পৌর প্রতিষ্ঠান, স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল সবই আছে – এক কথায় বলা যায় স্বয়ংসম্পূর্ণ শহর। অতীতে রানাঘাট অঞ্চলে খুব ঘন বনজঙ্গল ছিল। সেখানে ছিল রণা দস্যুর ঘাঁটি। সম্ভবত সে কারণে স্থানটির নাম রানাঘাট। এই রণাডাকাত ছিল খুব কালীভক্ত ও গরীবদের কাছে দেবতা। এরূপ জনশ্রুতি যে সে জঙ্গলে কালী বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করে পূজা করত। সেই দেবীমূর্তিই রূপান্তরিতা হয়ে আজ রানাঘাটের অধিষ্ঠাত্রী দেবী শ্রীশ্রীসিদ্ধেশ্বরীরূপে অর্চিতা হচ্ছেন।
আজ থেকে কত বছর আগে রণাডাকাত বেঁচেছিল তার কোনও প্রামাণ্য ইতিহাস নেই (তবে লোকে বলে ৫০০/৬০০ বছর আগে)। কালীভক্ত রণা কোনো দেবীমূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছিল অথবা কোনও প্রতীক স্থাপনা করে কালীপূজা করত কিন তা আজ নিশ্চিত বলা যায় না। তবে জনশ্রুতি যে মহারজ কৃষ্ণচন্দ্র নাকি রণাডাকাতের আরাধ্যা দেবী কর্তৃক স্বপ্ন পেয়েছিলেন যে দেবী জঙ্গলে বহুকাল অনাদৃতা পড়ে আছেন, কৃষ্ণচন্দ্র যেন তাঁকে এক উত্তম স্থানে প্রতিষ্ঠা করে তাঁর পূজার ব্যবস্থা করেন। মতান্তরে বলা হয় যে কোনো একসময়ে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র তাঁর রানাঘাটের জায়গীরে ঐ দেবীমূর্তিটি পেয়েছিলেন এবং সেটি রণাডাকাতের আরাধিতা দেবীবিগ্রহ বলে জানতে পেরেছিলেন, তখন তিনি যেখান থেকে মূর্তিটি পাওয়া গিয়েছিল তার কাছেই জঙ্গল পরিষ্কার করিয়ে একটি মাটির ঘর তৈরি করে দেবীকে সেখানে প্রতিষ্ঠিত করেন।
বলাবাহুল্য দেবীমূর্তি সেসময় মৃন্ময়ী ছিল। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র বর্ধমান থেকে এক ব্রাহ্মণ বংশকে এনে দেবীর সেবার ভার দিয়েছিলেন (কিংবদন্তী যে এ ব্যাপারেও দেবীর স্বপ্নাদেশ ছিল)। এখন যেখানে মন্দিরটা রয়েছে তখন ঠিক ঐ স্থানেই দেবী বিরাজিতা ছিলেন। মহারাজা দেবত্র হিসাবে সমগ্র চত্বরটি সেবাইতদের দান করেন। এ ছাড়াও দেবীর সেবার জন্য ধর্মপরায়ণ মহারাজা আরও অনেক জমি দেবত্র হিসাবে দান করেছিলেন।
এই দেবীকে সিদ্ধেশ্বরী নামে অবহিত করা হয় যদিও দেবীমূর্তি দক্ষিণাকালিকা বিগ্রহ। সম্ভবত মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র দেবীর এ নামকরণ করেছিলেন – দেবী সিদ্ধিদাত্রী তাই তিনি সিদ্ধেশ্বরী। একথাও আজ জানা যায় না দেবীর মৃন্ময়ী মূর্তিটি রণাদস্যুর প্রতিষ্ঠিত ও অর্চিত ছিল কিন আথবা মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র স্বপ্নাদেশ পাওয়ার পর ঐ মূর্তি গড়িয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন কিনা, মূর্তিটি কিরূপ ছিল অর্থাৎ সিদ্ধেশ্বরী বিগ্রহ বা দক্ষিণাকালীর মূর্তি তা জানা যায় না। ঐ মৃন্ময়ী মূর্তিকে এক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিসর্জন দেওয়া হয়েছিল এবং পরিবর্তে বারাণসী থেকে এখনকার কষ্টিপাথরের মূর্তিটি এনে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। তখন অবশ্য মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র জীবিত ছিলেন না। সে সময়টা ছিল ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর যুগের মধ্যাহ্ন কাল। যে অঘটনের জন্য দেবীর মৃন্ময়ী মূর্তিটি বিসর্জন দেওয়া হয়েছিল সে ঘটনাটি হল – সেসময় বাংলায় মুসলমানের প্রাধান্য, ইংরাজের উত্থান সবে শুরু হয়েছে। একদিন এক ইংরাজ সাহেব যে-কোনো কারণে প্রাণভয়ে ভীত হয়ে প্রাণ বাঁচানোর জন্য দেবীর পর্ণমন্দিরে ছুটে এসে ঢুকে পড়েছিলেন এবং আত্মত্রাণের জন্য দেবীর চরণ স্পর্শ করে প্রার্থনা জানিয়েছিলেন। তখন ছিল রাত্রিকাল। ইংরাজটি সে রাত্রে রক্ষা পেয়েছিল কিন্তু অস্পৃশ্যদোষে দুষ্ট হওয়ায়, তখনকার সংস্কারাচ্ছন্ন মানুষের বিবেচনায় দেবীকে নদীগর্ভে বিসর্জন দেওয়া হয়েছিল, সেই সঙ্গে দেবীর পর্ণমন্দিরটিও ভেঙে ফেলা হয়েছিল।
আরও পড়ুন
শ্যামনগরের মন্দির-কাহিনী
এরপর সে সময়কার সেবাইতের চেষ্টায় স্থানীয় ঘটক বংশীয় দুইজন ভক্ত ও জমিদার পাল চৌধুরীদের এক কর্তাব্যক্তির সহায়তায় দেবীর শিলাময়ী মূর্তি কাশীধাম থেকে এনে কোঠা মন্দির অর্থাৎ চাঁদনী জাতীয় মন্দির (বর্তমান মন্দিরের গর্ভগৃহ) নির্মাণ করে দেবীকে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। তদবধি শিলাময়ী দক্ষিণা কালীর মূর্তিটিই সিদ্ধেশ্বরী নামে রানাঘাটের অধিষ্ঠাত্রী দেবী হিসাবে অর্চিতা হচ্ছেন। এই মূর্তিটিও প্রাচীন-বয়স দুশ’বছরের কম নয়। তখনও রানাঘাট আজকের এই জনবহুল শহর নয় – বিরল বস্তি ও জঙ্গলাকীর্ণ ছিল। মন্দিরের পাশে ছোট একটি মন্দিরে মহাদেব প্রতিষ্ঠিত আছেন। নাটমন্দির অনেক পরে তৈরি হয়, এ ব্যাপারে কতিপয় স্থানীয় লোকের আর্থিক সাহায্য ছিল। বর্তমানে রাজ্য সরকারের সাহায্য বাবদ কিছু টাকা পাওয়া যায়।
নাটমন্দির তৈরি হওয়ার আগে মন্দিরের দক্ষিণপূর্ব কোণে একটি বিরাট অশ্বত্থগাছ ছিল, ঐ গাছটি নাটমন্দির নির্মাণে বা মন্দিরের অন্যবিধ কাজে বাধা সৃষ্টি করেছিল, অথচ বিপদ আপদ ঘটে যাওয়ার ভয়ে কেউই গাছটি কাটছিল না। তখন একজন বিবাহিত যে তখনও পর্যন্ত নিঃসন্তান ছিল সে ‘যা মায়ের ইচ্ছা’ এই ভেবে গাছটিকে কুঠারাঘাতে কেটে ফেলে। আশ্চর্য তারপর অপুত্রক সেই লোকটির ভাগ্য ফিরে যায় এবং আর্থিক উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে তার একাধিক সুন্দর স্বাস্থ্যবান পুত্র লাভ হয়। লোকটির প্রত্যেক পুত্রই সুপুত্র এবং তারা জীবনে যথেষ্ট উন্নতি করেছিল। শ্বেতমর্মর প্রস্তরে তৈরি দুই ধাপ-বিশিষ্ট পঞ্চভুজ বা পঞ্চকোণ পঞ্চমুণ্ডের আসনোপরি দেবী-বিগ্রহ প্রতিষ্ঠিত। পূর্বেই উল্লিখিত হয়েছে যে সিদ্ধেশ্বরী নাম হলেও দেবী মূর্তিটি সিদ্ধেশ্বরী বিগ্রহ নয়, এই মূর্তি উৎকৃষ্ট কালো কষ্টিপাথর দ্বারা নির্মিত এবং শ্বেতপ্রস্তর খোদিত মহাদেব। প্রতি বৎসর দেবী মূর্তি রং দ্বারা অলঙ্কারিত করা হয়। মূর্তি উচ্চতায় তিন হাত মতো। মন্দির গৃহ সাবেক আমলের-কড়ি বড়গার ছাদ, মর্মর দ্বারা বাঁধান মেঝে। সম্মুখদ্বারাটি যে প্রাচীনকালের তা দেখলেই বোঝা যায়। মন্দিরের সামনে বলিদানের ‘থান’ তারপর নাট, মন্দির, নাট মন্দিরটি দালান জাতীয় সাদামাটা আচ্ছাদিত স্থান শিল্প-বৈশিষ্ট্য বর্জিত। সমগ্র মন্দির চত্বরটি বেশ বড়। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র দেবীর তত্ত্বাবধানের জন্য দেবত্র হিসাবে জায়গা দিয়েছিলেন এখন তা নেই। রানাঘাটের জনসাধারণ ও অন্যান্য দূর দূরান্তরের মানুষ দেবী সিদ্ধেশ্বরীকে অতিশয় জাগ্রত জ্ঞানে শ্রদ্ধাভক্তি করে। দেবী মূর্তি আয়তনয়না ভয়ঙ্করী আবার করুণাময়ীও।
(দীপ্তিময় রায়ের লেখা ‘পশ্চিমবঙ্গের কালী ও কালীক্ষেত্র’ বই থেকে)
