
ভারতে এই খেলা প্রথম দেখিয়েছিলেন পিসি সরকার (সিনিয়ার)
যে ঐতিহাসিক ম্যাজিক নিয়ে এই লেখা, শুরুতেই মনে পড়ে যাচ্ছে আট বছর আগে শোনা একটি রোমহর্ষক গল্প (সত্যি ঘটনা অবলম্বনে)। আমরা তখন কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। ঝাড়খণ্ডের এক বন্ধু সৌর্য ওর মা-কে নিয়ে গিয়েছিল এক ম্যাজিক্যাল সন্ধ্যায় সময় কাটাবে বলে। মঞ্চে আলো স্থির হয়ে আছে। কিছুক্ষণ পরেই এন্ট্রি নিলেন পিসি সরকার (জুনিয়ার)। এক মহিলা দিব্যি হাত-পা নেড়ে মঞ্চের এদিক-ওদিক ছুটে বেড়াচ্ছিলেন। কিছুক্ষণ পর একটা বাক্স এল। বাক্সে ঢুকিয়ে দেওয়া হল সেই মহিলাকে। পিসি সরকার এবার দেখাবেন সেই জাদু, যেখানে তিনি মহিলাকে দ্বিখণ্ডিত করবেন। পেট থেকে মাঝ বরাবর ফালা-ফালা করে কেটে দেবেন শরীর। জাদু দেখানো শেষ। প্রত্যেক দর্শক স্থির। সৌর্য আর ওর মা কিছু বলতে চাইছে, পারছে না। তারপরেই বমি করে ফেলবেন সৌর্যর মা, অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবেন। আর সৌর্য চিৎকার করে পিসি সরকারের উদ্দেশে চেঁচিয়ে বলবে, ‘স্যার আমার মা-কে বাঁচিয়ে দিন স্যার’।
পিসি সরকার এক তরুণীর শরীর করাত দিয়ে দুই ভাগ করে দিচ্ছেন
আট বছর আগের একদিন। আমাদের হস্টেল জীবন। এমন সমস্ত সত্যিকারের গল্পে মুখর হয়ে থাকত একেকটা সন্ধে। আর থাকতেন জীবনানন্দ দাশ। আজ মনে পড়ে আট বছর আগের একদিনের কবিতা – “লাশকাটা ঘরে, চিৎ হয়ে শুয়ে আছে টেবিলের পরে”। ২০২১ সালে এই ঐতিহাসিক শ্বাসরোধকারী ম্যাজিক ১০০ বছর পূর্ণ করল। ম্যাজিকের আসল নাম, ‘শইং আ উওম্যান ইন হাফ’। ১৯২১ সালের ১৭ জানুয়ারি বিখ্যাত ব্রিটিশ জাদুকর পিটি সেলবিট এই ম্যাজিক প্রথম দেখিয়েছিলেন লন্ডনে। তারপর থেকে পৃথিবীতে এমন কোনও ম্যাজিশিয়ান নেই, যিনি এই খেলা দেখাননি। একসময় বলা হত, তরুণীকে দ্বিখণ্ডিত করতে না পারলে তিনি জাদুকরই নন, তাই ম্যাজিকবিদ্যায় সকলেই শিখে ফেলতে চাইতেন এই ভয়ানক খেলাটি।
আরও পড়ুন: এবিটিএ-র শতবর্ষ
সমান মাপের একটি বাক্স। বাক্সের দুই ধারে দুটি দুটি করে চারটি ফুটো। তরুণীর গলায় এবং পায়ের কাছে একজোড়া করে। ফুটোর মধ্যে মোটা দড়ি গলিয়ে বাক্সের এ-প্রান্ত থেকে সে-প্রান্ত চেপে ধরে রাখতে হয়। ফলে শায়িত তরুণীর নড়াচড়ার কোনও উপায় থাকে না। বাক্স তালা বন্ধ হয়। এরপরেই ঘটে সেই দুর্বিষহ মুহূর্ত। ম্যাজিশিয়ান করাত চালিয়ে বাক্স-সহ সেই তরুণীকে মাঝখান থেকে কেটে ফেলছেন। বাক্স দুইভাগে আলাদা হয়ে যাচ্ছে। আর তরুণীর বীভৎস চিৎকারে গুম মেরে আছে প্রেক্ষাগৃহ। এর কিছুক্ষণ পর বাক্সের তালা খোলা হবে। অক্ষত অবস্থায় সেই তরুণী মঞ্চের সামনে এসে নমস্কার করবেন। আর দর্শকমহল হতচকিত হবেন, মুগ্ধ হবেন; ভাববেন, আহা কী দেখিলাম! জন্ম-জন্মান্তরেও ভুলিব না। জানা যায়, সেলবিটের সঙ্গে প্রথম এই ম্যাজিকে তরুণীর ভূমিকায় ছিলেন যুক্তরাজ্যের বেটি বার্কার। অতএব পিটি সেলবিটের সঙ্গে বার্কারের নামও জাদুর ইতিহাসে অমর হয়ে রয়ে গিয়েছে।
ব্রিটিশ জাদুকর পিটি সেলবিট এই ম্যাজিক প্রথম দেখিয়েছিলেন লন্ডনে
বাঙালি সাহিত্যিক অজিতকৃষ্ণ বসুর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘যাদুকাহিনি’। সেখানে তিনি লিখছেন উনিশ শতকের আরেক ফরাসি জাদুকরের কথা। তাঁর নাম টরিনি। অজিতকৃষ্ণ বসুর মতে, এই খেলার বিবরণ পড়ে প্রথম সেলবিটই এটি মঞ্চস্থ করেন। তবে একথা ভুললে চলবে না, এই ম্যাজিকের ভারতীয় তথা বাংলা সংস্করণ কালজয়ী করেছিলেন প্রতুলচন্দ্র সরকার ওরফে পিসি সরকার (সিনিয়র)। তাই আজও সেলবিট নয়, পিসি সরকারকে মনে রেখেছে দুনিয়া। ভারতীয় জাদুকরদের মধ্যে তিনিই প্রথম বৈদ্যুতিক করাত দিয়ে দ্বিখণ্ডীকরণের ম্যাজিক প্রকাশ্যে আনেন এবং নাম দিয়েছিলেন, ‘দ্বিখণ্ডিত তরুণী’।
আরও পড়ুন: ১০০ ডিঙিয়েও আজও অমলিন ‘সন্দেশ’-এর স্বাদ
সর্বভারতীয় এক সংবাদ মাধ্যমকে পিসি সরকার (জুনিয়ার) একবার বলেছিলেন, এই জাদুর উৎস ভারতে। তিনি মনে করেন, “ভারতীয় প্রাচীন সাহিত্যে সন্তানকে খণ্ড খণ্ড করে কেটে আবার জোড়া লাগানোর কাহিনি প্রচুর। এমনকি, বাংলার ব্রতকথা, মঙ্গলকাব্যেও এর উদাহরণ রয়েছে। এ দেশের মাদারিরা এখনও বিনা আড়ম্বরে, খোলা রাস্তায় এই খেলা দেখিয়ে থাকেন।”
বিদেশের মাটিতে দ্বিখণ্ডিত তরুণী এবং জাদুকর
ঠিক-বেঠিকের তর্কে যাওয়ার চেয়ে বরং আলোচনা হওয়া ভালো দেশের জন্য পিসি সরকার সিনিয়ারের অবদান। প্রত্যেকটি জাদুকে তিনি যেভাবে জনতার দরবারে পেশ করেছেন এবং জনপ্রিয় করেছেন, তা পৃথিবীর ইতিহাসে দুর্লভ। ২০২০ সালের বেশিরভাগটাই আমরা করোনা এবং লকডাউনের মধ্যে দিয়ে কাটিয়েছি। এই সময় বিনোদনের প্রত্যেকটি পথই কার্যত বন্ধ ছিল। ২০২১ সালে ঐতিহাসিক দ্বিখণ্ডিত তরুণী ১০০ পূর্ণ করল। এবং এমন ম্যাজিক কেটে যাচ্ছে প্রায় নিঃশব্দে। যদিও এই খেলায় এখনও ভাটা পড়েনি। এমন খেলা জন্ম দিয়ে গেছে হাজার হাজার পিসি সরকারকে। রুজিরুটি বাঁচিয়ে রেখেছে কত মানুষের। আমার বন্ধু সৌর্যর মতো কত কত মানুষ এই ম্যাজিক দেখে ভয়ে শিউরে উঠেছেন, তাঁদের গা গুলিয়ে উঠেছে। আর তত বেশি করে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে দ্য গ্রেট ‘‘শইং আ উওম্যান ইন হাফ’, বাংলায় আমরা বলব ‘দ্বিখণ্ডিত তরুণী’।
তথ্যসূত্রঃ
যাদুকাহিনিঃ অজিতকৃষ্ণ বসু, আনন্দবাজার পত্রিকা এবং বর্তমান পত্রিকা
