বাস্তবতা আর সরলীকরণ এর ছন্দে গড়ে উঠল তাঁর ছবির শৈলী

বাংলার চিত্রকলায় আধুনিকতার অনুসন্ধানে যে সব শিল্পীর পরীক্ষা নিরীক্ষা অপরিহার্য ভূমিকা পালন করেছে তাঁদের মধ্যে  রফিকুন নবী অগ্রগণ্য। এই উপমহাদেশের নক্ষত্র প্রতিম শিল্পী তিনি। আসলে সময়ের বৃত্তকে স্বীকার করে নিয়ে তার ভিত্তিতে প্রতিক্রিয়া জানানোর যে চিত্র ভাষা সেই ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছেন রফিকুল নবী। পাশাপাশি শৈলী নির্মাণে বরাবর থেকেছেন আত্ম-সচেতন। তাঁর মতে বিষয়বস্তু উপলক্ষ্য মাত্র। একটা আঙ্গিক হয়তো একটা শৈলী গড়ে তোলার উপলক্ষ্য। বিষয়বস্তুকে কখনই আধিপত্য বিস্তার করতে দেননি এই শিল্পী। এখানেই আর দশজন শিল্পীর থেকে নিজেকে আলাদা করে ফেলেন তিনি। আসলে বিষয় শুধুমাত্র উপলক্ষ্য এমন ভাবতে গেলে প্রবল দাপটের দরকার হয়। অথচ ছবিতে বিষয় সজীব থাকে নক্ষত্রের আলোর মতো।

রফিকুন নবীর আরও ছবি দেখতে

দেশভাগের পর ১৯৪৮ সালে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, সফিউদ্দীন আমেদ, আনওয়ারুল হক, কামরুল হাসানের মতো শিল্পীদের একচ্ছত্র প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠা হয় ঢাকা আর্ট ইনস্টিটিউটের। সেখান থেকেই বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পচর্চার যাত্রাপথের সূচনা। সেই পরম্পরাতেই রয়েছেন রফিকুন নবী। ১৯৬৪-তে ঢাকা চারুকলা অনুষদ থেকে স্নাতক হন। ৬০ থেকে ৭০ দশক জুড়ে ক্রমাগত সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা বাংলাদেশের সব মানুষকে স্বাধীনতার যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে শুরু করে। এই সময়ে রফিকুন নবী যে প্রয়াস নিলেন সেখানে দেখা গেল জনজীবন ও শিল্পকলা অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠল। জনজীবনের নানা ক্ষেত্রে শিল্পকলাকে কী ভাবে প্রয়োগ করা যায় সেই পথ দেখালেন শিল্পী। ‘স্বাধীন শিল্পচর্চার আর্থিক সীমাবদ্ধতা, শিল্পীর ভবিষ্যৎ, রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির সঙ্গে শিল্পীর স্বাভাবিক সংলগ্নতা ইত্যাদি বিষয় তাঁকে ভাবিত করত।’ ফলে দেখা গেল রফিকুন নবী শিল্পের প্রয়োগবাদী সম্ভাবনাকে এমন ভাবে এগিয়ে দিলেন যার হাত ধরে বাংলার চিত্রকলা খুঁজে পেল এক নতুন পথ। বইয়ের প্রচ্ছদ, পোস্টার, বিজ্ঞাপন কোথায় না শিল্পের প্রয়োগকে নতুন মাত্রা দিলেন তিনি। বাস্তবতা আর সরলীকরণ এর ছন্দে গড়ে উঠল তাঁর ছবির শৈলী। কিন্তু ছবির বিষয় হল প্রবল ভাবে মানবতাবাদী।

সাধারণ ও পরিশ্রমী মানুষ, পল্লী জীবনে বেঁচে থাকার লড়াই, মৎসজীবীদের জীবন এসবের মধ্যে এক গণবাদী শিল্পীর নিবিড় পরিচয় উঠে আসে ছবিতে। ড্রইং নির্ভর বৃহদাকৃতির কাজের দিকে ঝোঁক এই মানুষটির। তা ছাড়া রাজনৈতিক অভিঘাত থেকে কার্টুনের দিকেও ঝুঁকেছিলেন তিনি। ‘টোকাই’, শীর্ষক কার্টুন চরিত্র সৃষ্টির কারণে তিনি জগত খ্যাত। এই কার্টুন চরিত্রকে সামনে রেখে একের পর এক পূর্ণ মাত্রার ছবি এঁকেছিলেন তিনি। তার মধ্যেও ছিল শিল্পের সমাজ প্রয়োগের দিক। শিল্পের সমাজভিত্তিক প্রয়োগের ব্যবহৃত যে দিক রফিকুন নবী খুলে দিয়েছেন তা নিঃসন্দেহে বাংলার শিল্পকলাকে নতুন রাস্তা দেখাল।

সম্প্রতি ঢাকা আর্ট সেন্টার থেকে প্রকাশিত হয়েছে ‘দ্য আর্ট অফ রফিকুন নবী।’ সাঈদ আজিজুল হক আর সৌমিক নন্দী মজুমদার পৃথক পৃথক ভাবে বিশ্লেষণ করেছেন এই শিল্পীর জীবন ও সৃজনের নানা দিক। দু’জনের বিশ্লেষণাত্বক আলোচনাতেই স্পষ্ট হয়েছে সমকালীন বাংলার চিত্রকলার অধিক্ষেত্রে রফিকুন নবীর অবদান ও অবস্থানের দিকটি। একটি একক প্রদর্শনীর সূত্রেই এই গবেষণা মূলক ক্যাটালগ ধর্মী গ্রন্থটির প্রকাশ। যা বাংলার শিল্প ইতিহাস চর্চার একটি প্রয়োজনীয় সংযোজন।

Developed by DXDasia