
– বাড়ি কোথায়?
– জলপাইগুড়ি।
– বাড়ি কোথায়?
– কোচবিহার।
– বাড়ি কোথায়?
– আলিপুরদুয়ার।
– ও উত্তরবঙ্গে!
আমরা যারা উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে বড়ো শহরে পড়তে বা চাকরি করতে আসি, তাদের আর কোনও জেলা থাকে না। উত্তর-দক্ষিণ দিনাজপুর বা মালদার কথা খানিক ভিন্ন; কিন্তু কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, এমনকি দার্জিলিং থেকে আসা ছাত্রছাত্রীদের ক্ষেত্রে গল্পটা মোটামুটি একই। এক শিলিগুড়ি বাদে বাকি সব ‘উত্তরবঙ্গ’, জেনেরিক, আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যহীন। আমার নেপালি বন্ধুদের গল্প শুনলে তো আরও তীব্র ধাক্কার সম্ভাবনা রয়েছে পাঠকের জন্য। মোঙ্গলয়েড মানুষদের দেখে মূল ভূখণ্ডের মানুষ বোঝেই না তারা কোথাকার! কে লেপচা, কে নেপালি! ‘ওই তো, ওরা সবই এক’— বলে এড়িয়ে চলি আমরা। কখনোই তাদের নিজেদের মতো একই পরিসরের ভাবা হয়ে ওঠে না। একইভাবে আমরা যারা জন্মসূত্রে পশ্চিমবঙ্গের উত্তরপ্রান্তের বাঙালি তাদের দেখলেই, ‘তোদের বাড়ির পাশে হাতি বের হয়?’, ‘তোরা লেপার্ড দেখেছিস?’ বা ‘তোদের ভাষা এতো অদ্ভুত কেন?’— এই ধরনের প্রশ্নের সম্মুখীন হতেই হয়। এইসব প্রশ্নে যেমন লুকিয়ে থাকে অজানার প্রতি ঔৎসুক্য, তেমনই এই প্রশ্নগুলোই আরও দূরে সরিয়ে দেয় উত্তরবঙ্গকে। সমগ্র উত্তরবঙ্গ যেন হয়ে যায় একটি পৃথক রাজ্য, যেখানে পর্যটন ছাড়া আর কোনও কিছুরই কোনও মূল্য নেই। বেশিরভাগ মানুষই মনে রাখেন না উত্তরবঙ্গ মানে শুধু হাতি, জঙ্গল, চা বাগান আর লেপার্ড নয়। আসলে যে কোনও পর্যটনস্থলের এইটেই ভবিতব্য। জায়গাগুলো শুধু ট্যুরিস্ট স্পট হয়েই থাকে। হারিয়ে যায় সেই অঞ্চলের বাকি সকল আইডেন্টিটি। এই মানসিকতা শতাধিক বছরের। ধীরে ধীরে তৈরি এই মানসিকতা একদিনে যেমন বদলানো সম্ভব নয়, তেমন আচানক একদিনে দায় নিয়ে সবটা বদলে ফেলা যাবে, এমনটাও নয়।
সেবক-রংপো রেল প্রকল্প
মানুষ শুধু পাহাড়ের কাছ থেকে নিয়ে গেছে। পাহাড়ও হাসি মুখে দিয়েছে অনেক। তবে এবার যেন ক্লান্ত তার হৃদয়, ফুরিয়ে আসা বয়স্ক বৃদ্ধের মতো আর কিছু দিতে পারে না সে। ভীষণ ব্যাধিতে খিটখিটে হয়ে পড়েছেন গিরিরাজ। অজস্র না পাওয়ার রাগ উগরে দিচ্ছেন তিনি।
আজ উত্তরের পাহাড়ের বিধ্বংসী অবস্থায় কলকাতার মানুষ যেভাবে সরব, সেই সরব হওয়ারও তাই নানা দিক রয়েছে। উত্তরবঙ্গের জন্য ব্যাকুল হয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করা কিন্তু সেই দায়ের আংশিক সূত্রপাত মাত্র। ‘মাউনটেইন ইজ কলিং’– প্রতি বছর উত্তরবঙ্গের পাহাড়ে যান হাজার হাজার পর্যটক। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে পাহাড়কে ভালোবাসা মানে শুধুই পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে দু-হাত ছড়িয়ে সেলফি তোলা কিংবা রিল বানানো আর তা দেখে সোশ্যাল মিডিয়ায় অগুনতি লাইক। এই যেন একমাত্র তুষ্টি। পাহাড় গাঁয়ের চোরাবাটোয় হারিয়ে যাওয়া মন, মেঘ মুলুকের সন্ধান, দাজু-বেহেনিদের হাতে তৈরি মোমো, ওয়াইওয়াই খেয়ে তৃপ্ত মনে বাড়ি ফেরেন পর্যটকেরা। ব্যাস্, পাহাড়কে ভালোবেসে এইটুকু সম্পর্কই গড়ে ওঠে একজন পর্যটকের মেঘের দেশের সঙ্গে। এককালে যে কৌতূহল, যে সৌন্দর্যবোধ, যে অনুসন্ধিৎসা মানুষকে নিত্যনতুন আবিষ্কারে ইন্ধন জুগিয়েছিল, আজ প্রযুক্তির কবলে সেই অনুসন্ধিৎসা মৃতপ্রায়। পাহড়ের বুকে সৃষ্টির গোপন পরশমণিটি হারিয়ে গিয়ে জায়গা করে নিয়েছে রাশি রাশি প্লাস্টিকের স্তুপ। শীতকালে যে সব পর্যটক পাহাড়ে যান একটু খেয়াল করলেই দেখতে পাবেন শুকিয়ে যাওয়া ঝোরা পথে স্তূপীকৃত প্লাস্টিকের অজস্র ইনস্টলেশন। আধুনিক মানুষের পৃথিবীকে সুস্থায়ী করে তোলার নমুনা ঐ প্লাস্টিকের ইনস্টলেশনগুলিই। বর্তমান ভারতের আধুনিকতার সংজ্ঞাটি খানিক এমনই। সারি সারি গাছের বদলে সেখানে জায়গা করে নেয় উঁচু উঁচু বাড়ি। পুকুর বুজিয়ে পাঁচতলা মল, মেঠো পথ ঢেকে যায় কংক্রিটের আস্তরণে। চিড় ধরে প্রকৃতি আর মানুষের পারস্পরিকতায়। যে পাহাড়ের কাছে যেতে হয় নতজানু হয়ে, সেই পাহাড়ের চূড়ায় চেপে প্রতিধ্বনিত হয় সস্তা জয়ের অট্টহাসি। যে পাহাড় তার দুবাহু ছড়িয়ে যুগ যুগ ধরে শুধু ভালোবেসেছে গাছ, ফুল, পাখি, মানুষকে— সেই পাহাড়ের হৃদয়কে সংকুচিত করেছে মানুষের আগ্রাসী কার্যক্রম। তাই উপচে পড়ছে নদী, ভাসছে মানুষের ঘরবাড়ি, যাচ্ছে অগণিত প্রাণ। প্রকৃতি যেমন উজাড় করে দেয় নিজের ঝুলি, তেমনই তার রোষ। একবার ধ্বংসলীলা শুরু হলে কারোর ছাড় নেই, দোষী নির্দোষের ফারাক করে না সে।
“অরণ্যের দিনরাত্রি, আমি চলচ্চিত্র যাত্রী…/ আমি শ্যুটিং করতে আসি, আমি সভ্যতা ভালোবাসি”— কবীর সুমনের এই গানটি বিশেষ এক অঞ্চলকে উদ্দেশ্য করে লেখা হলেও এর মূল কথা দেশ-কাল-সীমানা অতিক্রম করে আসলে আধুনিক মানুষের অবস্থানের কথাই বলে। আধুনিক মানুষ ভালোবাসে সভ্যতা। আর আধুনিক সভ্যতার মূল কাণ্ডারী প্রযুক্তি। প্রযুক্তিবিহীন মানুষ অচল একথা সত্যি, কিন্তু কীভাবে হবে সেই প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার সে বিষয়ে শেষ দুশো বছরের বেশি সময় ধরে বেশ কিছু ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে আধুনিক মানুষের সমাজ। প্রযুক্তির প্রয়োজন অনস্বীকার্য, কিন্তু প্রযুক্তির অছিলায় সমগ্র প্রকৃতি জুড়ে যে শোষণ চলেছে তার ফলস্বরূপ পৃথিবীর ফুসফুস থেকে নির্গত হচ্ছে অসুস্থ বাতাস। এখনও যদি আমরা সকলে পৃথিবীকে সুস্থ করার দায় না নিই তবে ঐ অসুস্থ বাতাস থেকে নির্গত বিষে ধ্বসে পড়বে বিশ্বজুড়ে মানুষের তৈরি তাসের ঘর। তারই একটি নগণ্য উদাহরণ উত্তরবঙ্গের এই বন্যা, ভূমিধ্বস।
তিস্তা ড্যাম
মানুষের প্রয়োজনের জলবিদ্যুৎ, সেচের জলের চাহিদা মেটাতে তিস্তার বুকে বসানো হয়েছে প্রায় কুড়িটি বাঁধ। বাঁধন-ছাড়া তিস্তাবুড়িকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে সুখী হয়েছি আমরা। সবুজ জলের ছটফটে তিস্তা আজ পাহাড়ের গ্লানি মেশানো পলি ঘোলা জলধারা মাত্র।
জন্মসূত্রে উত্তরবঙ্গে বড়ো হওয়ার সুবাদে সাতদিন একটানা বৃষ্টির মেঘলা দিনের মনখারাপটুকুই ছিলো আমাদের প্রাপ্তি। বেশ কিছু বছর অবধি আমরা রাস্তায়-ঘরে জল ওঠা দেখেছি। ঘরে বসে শুনেছি তিস্তাবুড়ির গর্জন। পাহাড়ের বাতাসে ছিলো মিঠে বিষণ্ণতার গন্ধ। কিন্তু তার ভয়াবহ এই রূপ পাহাড়বাসীর কাছেও খুব বেশি দিনের নয়। এই ভয়াবহতার বীজ বপন করা হয়েছিল সেই ঔপনিবেশিক সময়ে। ব্রিটিশরা যখন সিকিমের রাজার কাছ থেকে দখল করে নিল দার্জিলিং। লেপচাদের বহুকালের ভূমি হয়ে গেল ব্রিটিশ শাসকদের হোম ওয়েদারের সুবাস-মাখা আধুনিক হিল স্টেশন। ডুয়ার্স ও পার্বত্য হিমালয়ের আদি নিবাসী ওক, বার্চ, চেস্টনাট, রডোডেনড্রন গাছগুলি হারালো তাদের জন্মভূমি। মুনাফা লাভের আশায় পোঁতা হলো ডুয়ার্স জুড়ে শাল ও পাহাড়ের অনেকটা অংশে জাপানি পাইন। শুরু হলো আমাদের ঔপনিবেশিক গর্বের চা-বাগানগুলি। সেই থেকে হিমালয়ের মাটি আলগা হতে শুরু করেছে। প্রবল আত্মবিশ্বাসে দাঁড়িয়ে থাকা নবীন ভঙ্গিল হিমালয় পর্বত, ক্রমাগত বাড়িয়ে চলেছে নিজের উচ্চতা। তার উপর মাটি আলগা হয়ে পড়ায় হিমালয়ের অস্থির চিত্তে লেগেছে আরও ভাঙনের স্বাদ। ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পরও মুনাফার লোভে হিমালয়ের মাটিতে চলেছে সেই এক ট্র্যাডিশন। মানুষ শুধু পাহাড়ের কাছ থেকে নিয়ে গেছে। পাহাড়ও হাসি মুখে দিয়েছে অনেক। তবে এবার যেন ক্লান্ত তার হৃদয়, ফুরিয়ে আসা বয়স্ক বৃদ্ধের মতো আর কিছু দিতে পারে না সে। ভীষণ ব্যাধিতে খিটখিটে হয়ে পড়েছেন গিরিরাজ। অজস্র না পাওয়ার রাগ উগরে দিচ্ছেন তিনি। ধুঁকছেন জীর্ণ দেহখানি নিয়ে। পৃথিবীজোড়া বিশ্বায়িত উন্নয়নের মোড়কে নিজের প্রকৃত অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেছে পাহাড়। সমগ্র বিশ্ব একদিকে সুস্থায়ী উন্নয়ন বা সাস্টেইনেবিলিটি নিয়ে কথা বলছে, অন্যদিকে আধুনিক সেই বিশ্বের মানুষের সীমাহীন চাহিদা পূরণে অক্ষম হয়ে পড়ছে হিমালয়। মানুষের প্রয়োজনের জলবিদ্যুৎ, সেচের জলের চাহিদা মেটাতে তিস্তার বুকে বসানো হয়েছে প্রায় কুড়িটি বাঁধ। বাঁধন-ছাড়া তিস্তাবুড়িকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে সুখী হয়েছি আমরা। সবুজ জলের ছটফটে তিস্তা আজ পাহাড়ের গ্লানি মেশানো পলি ঘোলা জলধারা মাত্র। যে তিস্তার পারে বসে কেটেছে সমগ্র শৈশব-কৈশোর, আজ সেই নদীর কাছে গেলে কেমন আক্ষেপ গ্রাস করে। সে আক্ষেপ আমার না নদীর তা ঠিক বুঝতে পারি না। চেনা তিস্তার অচেনা রং আমাকেই এত পীড়া দেয়, তিস্তা কি চিনতে পারে নিজেকে? নাকি নিজেকে চিনতে না পেরেই তিস্তার এই রুদ্ররূপ? ২০১১ সালের ভূমিকম্পের পরে হাইলি সাইসমিক হিমালয়ান বেল্ট আগের চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয় হয়েছে, টেকটনিক প্লেট ও ফল্ট লাইনগুলিতে চলছে নানা অদলবদল। আর সেই বদলে ইন্ধন জুগিয়েছে তিস্তার বুকের বাঁধগুলো। দুর্বল হয়েছে নদী তীরবর্তী মাটি, অনিশ্চিত হিমালয় ডুবেছে আধুনিক আলোর গভীর অন্ধকারে।
সান্দাকফু রুটের আবর্জনা পরিষ্কার করছেন ট্রেক-যাত্রীরা
১৯০০ সালের ব্রিটিশ সরকারের তথ্য অনুযায়ী সেই সময় পর্যন্ত এই অঞ্চলে জঙ্গল ছিল ১,৫৫,৩৯৯.২৯ স্কোয়্যার কিমি। কিন্তু স্বাধীন, স্বনির্ভর ভারতবর্ষে ২০২৩ সালের আইএসঅফআর-এর তথ্য অনুযায়ী আজ সেই জঙ্গল দাঁড়িয়েছে ১,৫৭০ স্কোয়্যার কিলোমিটারে।
বছর দু-তিনেক আগে একবার শুনলাম জলপাইগুড়ি শহরে দেখা গেছে ভাল্লুক। যে ভাল্লুকের বাস জলপাইগুড়ি শহর থেকে বেশ অনেকটাই দূরে। চট করে একটু ঘুরতে আসেননি ভাল্লুক বাবাজি। সেই সময় জুড়ে বহু হরিণ, হাতি, এমনকি চিতাবাঘকেও দেখা গেছে লোকালয়ে। বলাই বাহুল্য, যথেচ্ছ জঙ্গল নিধন এর মূল কারণ। ১৯০০ সালের ব্রিটিশ সরকারের তথ্য অনুযায়ী সেই সময় পর্যন্ত এই অঞ্চলে জঙ্গল ছিল ১,৫৫,৩৯৯.২৯ স্কোয়্যার কিমি। কিন্তু স্বাধীন, স্বনির্ভর ভারতবর্ষে ২০২৩ সালের আইএসঅফআর-এর তথ্য অনুযায়ী আজ সেই জঙ্গল দাঁড়িয়েছে ১,৫৭০ স্কোয়্যার কিলোমিটারে। একথা জেনে সেদিন বারবার নিজেকে প্রশ্ন করেছি, কী হলো এই জঙ্গল নিবাসীদের? কোথায় গেল তারা? উত্তর যদিও অজানা নয়। কালের নিয়মে হারিয়ে গিয়েছে কত নাম-না-জানা প্রজাতি, কত পাখি, কত পোকামাকড়, কত ভেষজ। সীমিত জঙ্গল থেকে প্রায়ই হাতি বেরিয়ে আসে লোকালয়ে। চাষের ভুট্টা, ধান খেয়ে অনেক সময় পথ হারায়, আবার মারাও পড়ে। কপাল ভালো থাকলে ফিরে যায় জঙ্গলে। স্থানীয় মানুষদের মতে যত জঙ্গলের পরিমাণ কমছে তত এই সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন তাঁরা। আর ঐ নির্দোষ জীবজন্তুরা মাশুল গুনছে সভ্যতার নির্মম পরিহাসের। সব হারিয়ে পাহাড়, জঙ্গল এখন শুধুই ক্ষিপ্ত। মানুষের এই সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ধ্বংস করেছে পাহাড়-জঙ্গলের আদিম রহস্য।
উত্তরের ভঙ্গুর হিমালয়ের কফিনের শেষ পেরেকটি হলো সেবক-রংপো রেল পথ। এ কথা আমি বলছি না, বলছে সেখানকার স্থানীয় মানুষরাই। পাহাড় ধ্বসে পড়ছে নীচে, জল উঠে আসছে তাঁদের দুয়ারে। তারা যায় কোথায়! ১০ নম্বর জাতীয় সড়কের পাশে তিস্তা নদী আর তার পাশেই সেবক-রংপো রেলওয়ে প্রোজেক্টের টানেল। ৪৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথ আধুনিক ভারতের উন্নয়নের প্রতীক বটে, কিন্তু এই রেল লাইন তৈরিতে সম্মতি ছিল না স্থানীয় মানুষদের। হিমালয়ান ভিলেজ অর্গানাইজেশনের মতে, এই রেলপথ তৈরির ফলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিঘ্নিত হচ্ছে এই অঞ্চলের। যদিও কর্তৃপক্ষ এ কথা মেনে নিতে রাজি হয়নি। তবে একথা বোঝার জন্য সাধারণ জ্ঞানই যথেষ্ট। নবীন ভঙ্গিল পর্বতে যে মনুষ্যসৃষ্ট কোনও কিছু দীর্ঘমেয়াদী নয় তা বুঝতে খুব একটা অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। ভূমিকম্পের ভয় এখানে সব সময়ের। ভূমিধ্বসের বাড়বাড়ন্তে আরও বেশি কেঁপে উঠছে হিমালয়। এই রেল লাইনের কাজ শুরু হওয়ার পর থেকে সেখানের মানুষের বাড়ির দেওয়ালে, মেঝেতে দেখা গেছে অকারণ ফাটল। তারপর থেকে আরও বেশি করে ফুঁসছে তিস্তা, রঙ্গিত, জলঢাকা।

১০ নম্বর জাতীয় সড়কের পাশে তিস্তা নদী আর তার পাশেই সেবক-রংপো রেলওয়ে প্রোজেক্টের টানেল। ৪৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথ আধুনিক ভারতের উন্নয়নের প্রতীক বটে, কিন্তু এই রেল লাইন তৈরিতে সম্মতি ছিল না স্থানীয় মানুষদের।
বর্তমান পৃথিবীর পরিস্থিতি ঔপন্যাসিক আর আর আর টোলকিনের কথা মনে পড়ায়। তাঁর লেখা বিশ্বখ্যাত ফ্যান্টাসি উপন্যাস ‘লর্ড অফ দ্য রিংস’-এর অন্যতম খল চরিত্র হোয়াইট উইজার্ড সারুমান ছিল বুদ্ধিমান, বারুদ আবিষ্কার করেছিল সে। তাঁর কাছে ছিল উন্নত প্রযুক্তির চাবিকাঠি। কিন্তু সেই প্রযুক্তিকে মানবতার কাজে ব্যবহার না করে সে ব্যবহার করেছিল ক্ষমতার লড়াইয়ে। প্রযুক্তি হয়ে উঠেছিল ক্ষমতা স্থাপনের একটা অস্ত্র মাত্র। জঙ্গলের পর জঙ্গল সাফ করে সারুমানের এই অনাচার অনেকটা কাল সহ্য করেছিল গাছেরা। কারণ গাছেরা সহজ, তারা প্রাজ্ঞ, তাই তারা সইতে জানে। কিন্তু সহনশীলতার মানে যে অন্যায়কে মেনে নেওয়া নয় এ কথা মানুষের থেকে বেশি জানে গাছেরাই। আর তাই সারুমানের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে লড়েছিল তারা। সে লড়াই অস্তিত্বের। পৃথিবী যতটা গাছের, ততটা মানুষের, আবার ততটাই পিঁপড়ের, ফড়িং-এর। এক সময় মানুষেরা এই কথা জানত। তারা জানত কীভাবে সাপেদের সঙ্গে, মাকড়সাদের সঙ্গে সহাবস্থানে থাকতে হয়। কীভাবে পরিষ্কার রাখতে হয় জঙ্গল, কীভাবে পাহাড়কে ভালোবাসতে হয়! কিন্তু ঔপনিবেশিক সিলেবাস আমাদের ‘আধুনিক’ করতে গিয়ে ভুলিয়ে দিয়েছে হাজার বছরের অর্জিত সেই জ্ঞান। আমরা ধরে রাখতে পারিনি আমাদেরই শিকড়। যে দেশে আধুনিকতা বলতে বোঝা হয় নিকোবরে, মধ্যপ্রদেশে, হিমাচলে নির্বিচারে জঙ্গল কেটে বহুজাতিকের হাতে দেশের খনিজ বা বনজ সম্পদ সমর্পণ করা অথবা অযথা ন্যাশনাল রিজার্ভ ফরেস্টের ভিতর ফোরওয়ে হাইওয়ে বা ফ্লাইওভার তৈরি করা, সেখানে গাছেদের রক্ত লেগে থাকা সারুমানের গজদন্তমিনারে আঘাত হানবে কে? আসবে কি কোনও মুক্তধারার অভিজিৎ? নাকি নিজের অস্তিত্ব রক্ষায় পাহাড়, জঙ্গল, নদী এরা নিজেরাই যথেষ্ট? প্রকৃতির এই ভয়াবহ রুদ্ররূপ কি তার একজোট হওয়ার লক্ষণ?
এবারে উত্তরবঙ্গের বন্যার পর নদীর কোনও কুলকুল গান ছিল না, ছিল শুধু প্রবল গর্জনদ। আর ছিল ঘরহারা, প্রিয়জনহারা মানুষের আশ্রয়তাঁবুর ভিতরের অবিরাম হাহাকার। জল জমা চিরকালীন নয়, জল বয়ে যায়। তার নিজের নিয়মেই বয়ে গেছে জল, সঙ্গে নিয়ে গেছে পাহাড় ও তরাই-ড়ুয়ার্সের মানুষের ঘরবাড়ি, কত স্মৃতিচিহ্ন। যাঁদের ঘর ভাসেনি সেখানেও রয়ে গিয়েছে জলের বহমানতার দাগ। জমে রয়েছে পলি-কাদা। নদীর এই প্রবল রোষে আজ যারা আক্রান্ত তারা কিন্তু জানে প্রকৃতির নিয়মাবলী। তারা লঙ্ঘন করেনি নিজস্ব সীমা। দায় যাদের তাদের ঘর যে ভাসে না। এখন থেকে সচেতন না হলে ভবিষ্যতে এই হিমালয় অঞ্চলের পরিণতি খুব একটা সুখকর নয়। তাই পাহাড়ের কাছে এলে তাকে ভালোবেসে আসুন। ভালোবাসার দায়িত্ব থাকে। দায়িত্ব নিতে হবে নিজেদেরই।
___________
মতামত লেখকের নিজস্ব

