পরিবেশ বাঁচাতে রাজপথেও অবাধ হোক সাইকেল

দূষণ ঠেকাতে সাইকেলকে আপন করে নিতে বলছে সাইকেল সমাজ

সে ছিল এক ছোটোবেলা আমাদের! দু-চাকার সাইকেলে সওয়ার হওয়ার লোভ আমাদের ডাকত। প্রথমে হাফ প্যাডেল, তারপর ফুল। কেউ বা প্রথমেই ফুল। তাদের যেন বা একটু কদর বেশি! পেছনে কেউ একটা সাইকেলটা ধরে থাকত , যাতে না-পড়ে যাই! এভাবে শিখতে গিয়ে  যখন প্রথম দেখি যে পেছনে কেউ আর ধরে নেই, ঠিক সেই মাহেন্দ্রক্ষণের অনুভূতি বলে বোঝানোই যাবে না। যেন উড়তে শিখেছি। দু’পাশ দিয়ে কেটে-কেটে যাচ্ছে হাওয়া। আর অমনি ধড়াম করে সাইকেল নিয়ে ভূ-পতিত। বিনি পয়সার সাইকেল-টিউটরের সেই শাশ্বত বাণী, ‘কষ্ট না করলে কি আর কেষ্ট মেলে!’… বড়ো হয়ে ওঠার পথে গ্রাম-বাংলা হোক কিংবা শহর-বাংলাই হোক, ছেলে হোক কিংবা মেয়ে, সাইকেল যে আমাদের জীবনে কখন যে এক অযান্ত্রিক ‘স্বজন’-এর সম্পর্ক নিয়ে হাজির হয়।

আজ ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’। দু’দিন আগেই ৩রা জুন গেছে ‘বিশ্ব বাইসাইকেল দিবস’। যদিও এইসব দিবস-টিবস আমাদের মতো সাধারণ পাঁচজন বানায় না। আর বানানোর পেছনের গল্পসল্প সবসময় সমর্থনযোগ্যও নয়। কিন্তু বাইসাইকেল আর পরিবেশের ক্যালেন্ডারে খুব কাছাকাছি স্থান পাওয়া খুবই প্রতীকী মনে হয়। 

চারপাশটায় তাকালে আরোই এই অনুভব চাগাড় দিয়ে ওঠে। সারা দেশে অরণ্যরাজি কমতে কমতে একেবারে শ্মশানভূমিতে পরিণত হওয়ার জোগাড়। খাতায়-কলমে দেশে অবশ্য বন বেড়েছে। তার কারণ, নতুন নীতিতে ফসলের ক্ষেতও নাকি বন। এ এক দারুণ মজা। বন আদতে হাওয়া হয়ে গেলেও গুগল ম্যাপে বন দেখাতেই থাকবে। আর, বায়ু দূষণের নিরিখে আমাদের দেশেরই ৬-৭টি শহর লাগাতার বিশ্বে প্রথম কুড়ির মধ্যে অনায়াসে জায়গা করে নেবে। রাস্তায় বেরোলে মুখে-মুখে মাস্ক চোখে পড়বে। প্রতি ৬ জনে ১ জন বায়ুদূষণে আক্রান্ত।

এই অবস্থায় পুরুলিয়া থেকে যশোর রোড, তারকেশ্বর থেকে লাটাগুড়ি— সমস্ত জায়গায় মানুষ গাছকাটার বিরুদ্ধে জড়ো হচ্ছে। আজ পরিবেশ দিবসে আমাদের ভেতর অনেকেই নতুন গাছ লাগানোর উৎসবে অংশগ্রহণ করবেন, জলা বোজানোর বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলবেন। খুবই প্রয়োজন এইসব। বড়ো গাছের শীতলছায়ায় বিশ্রাম নেওয়ার রেওয়াজ আমাদের আরোই বাড়ানো উচিত, বাড়ানো উচিত জলার জল ব্যবহার। তাতে আমাদের প্রকৃতি-ভাবনা আরো সহজ সরল সাবলীল হয়ে ওঠার রসদ খুঁজে পায়।

পরিবেশ বাঁচাতে ব্যবহার বাড়ানো উচিত সাইকেলের। এই বিষয়টি আমি খুব ভালো করে অনুভব করেছি ‘কলকাতা সাইকেল সমাজ’-এ অংশগ্রহণের পর।

প্রকৃতি-অসংবেদী পরিবহন নীতির কারণে কলকাতার অনেক রাস্তাতেই এই কিছুদিন আগে অবধি সাইকেল চালানো নিষিদ্ধ ছিল। ‘কলকাতা সাইকেল সমাজ’-এর যাত্রা শুরুর পর থেকে একের পর এক সাইকেল র্যা লি, কর্মশালা, সাইকেলশুমারি, আইন, আদালত, দরবার করা ইত্যাদির মাধ্যমে আজ অনেক রাস্তাতেই অবাধে সাইকেল চালানো সম্ভব হয়েছে। যদিও আইনরক্ষকদের জুলুমবাজি শূন্য হয়ে যায়নি এখনো। 

শুধু সাইকেল চালানোর উপযুক্ত নাগরিক পরিকাঠামোর যথোপযুক্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে নয়, ‘কলকাতা সাইকেল সমাজ'-এর অন্যতম লক্ষ হল শহরজুড়ে সাইকেল-সংস্কৃতি গড়ে তোলা। অর্থাৎ সবাই মিলে চলুন আগে সাইকেলটা চালাই। সেই উদ্দেশ্যে কখনো অলিগলি-কলিকাতায় আট থেকে আশি মিলে সাইকেল নিয়ে মহানন্দে বেরিয়ে পড়া হয়েছে। আবার কখনো শহর ছাড়িয়ে স্নিগ্ধ প্রকৃতির সংস্পর্শে আসতে শীতকালে প্রভাতী সাইকেল ফেরিতে বেরিয়ে পড়েছি আমরা।

আজ সাইকেল নিয়ে মানুষ শুধু পাহাড় কিংবা উপকূলে যাচ্ছে না, প্রকৃতি-পরিবেশ বাঁচানোর জন্য বার্তা দিতে বিশ্বভ্রমণে বেরিয়ে পড়ছে। অন্তত মোটরবাইক করে পৃথিবী জুড়ে এই সচেতনতার প্রচারের চেয়ে এটি অনেক সৎ৷ 

আজ জাপান, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস ইত্যাদি বিভিন্ন দেশে ছোটো দূরত্ব যাতায়াতের জন্য সাইকেল চালানোতে সরকারিভাবে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। অফিসযাত্রী কিংবা স্কুল-কলেজে যাওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ সুযোগও দিচ্ছে কোনো কোনো শহর। সৌরশক্তি কিংবা ইলেক্ট্রিকচালিত যানবাহনেও আর চলছে না! দূষণ এমন জায়গায় পৌঁছেছে! কিন্তু আমাদের এখানে? বিশেষ করে যাপন-সংস্কৃতির দিক থেকে আমাদের মতো যত্ন-করে-চালিয়ে-নিতে-হবের দেশে জীবন-জীবিকার অধিকাংশ ক্ষেত্রে সাইকেল যেখানে অদ্বিতীয়।

শুধু কি আর বায়ুদূষণ! আজকালকার কানফাটানো, গা-গোলানো হর্নের আধিক্যের মাঝে সাইকেল বাস্তবতই একরকম থেরাপির মতো। বেল খারাপ হলে যেখানে ‘দাদা, বেল নেই! বামদিকে ঢুকবো’- বলে কাজ চালিয়ে নেওয়া যায়।

সাইকেলের মতো প্রকৃতি-পরিবেশ বান্ধব যান অপ্রতুল। শুধু সেটুকু নয়, খরচ বাঁচাতে, শরীর-স্বাস্থ্য-মন ভালো রাখতে সাইকেলের জুড়ি মেলা ভার। যারা নিজেদের জীবন-জীবিকার তাগিদে শহরের বুকে সাইকেল চালিয়ে, সচেতনভাবে হোক কিংবা অসচেতনভাবেই হোক, শহরের শ্বাসবায়ুকে সাধ্যমতো শ্বাসযোগ্য করে রাখছেন তারা এত ব্রাত্য কেন? নীতিগত দিক থেকে আগামীর পৃথিবীকে শিশুর বাসযোগ্য করে তোলার নিরিখে সাইকেল-আরোহীরা সহযোদ্ধা তথা সহযাত্রী নন? শহরে সবুজ-সাথী প্রকল্পটি পরিবেশ-বান্ধব দিকটির কোনো মানেই থাকবে না যদি তার সুষ্ঠু রূপায়নের দিকটিই উপেক্ষিত থেকে যায়। 

স্বাধীনতার পর থেকে যারাই দেশ চালিয়েছেন, তারা কেউই প্রকৃতি-পরিবেশের দিকটি যত্ন ও গুরুত্ব সহকারে দেখেননি। তার প্রমাণ দূষণ সূচকে ভারতের ঊর্ধ্বগামী দৌড়। অথচ এই দিকটি আগামীতে মানবের অস্তিত্বের সঙ্গে সবচেয়ে জড়িত সমস্যা সম্ভবত। আমাদের সকলেই যেমন এই সমস্যা সমাধানের দিকে চিন্তায় কাজে নতুন করে এগোতে হবে, তেমনি নীতিগতভাবে এই প্রশ্নে সার্বিক বদল ঘটানো অত্যন্ত জরুরি কাজ। পারলে আজই। এখুনি। তার ছাপ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই পড়তে হবে। ভরা গ্রীষ্মে কোকিল কেন ডাকছে —এইসব প্রশ্নের সমাধান খুঁজতে চাওয়া আর শহরবাসীকে পায়ে হাঁটা কিংবা সাইকেল চালানোকে উৎসাহিত করা কোথাও গিয়ে একই সুতোয় গেঁথে যাওয়ার সম্ভাবনা রাখে। 

অফিসে, বাড়িতে বাড়িতে, স্কুল-কলেজে যেতে কিংবা বাড়িতে বাড়িতে চিঠি পৌঁছে দিতে, কনস্ট্রাকশন কিংবা অন্যান্য কাজে যেতে, প্রেম করতে, বাজার করতে শহরজুড়ে যারা ভালোবেসে সাইকেল চালান। এই বিষয়টিকে সম্মান দিয়ে শহরজুড়ে সাইকেল পরিবহন ব্যবস্থাকে আরো ঢেলে সাজানোর নীতি প্রণয়নের কাজ শুরু হোক। বিশ্ববন্দিত বিজ্ঞানী আইনস্টাইন থেকে বাড়িতে বাড়িতে কাজ করা বকুলদিদের সাইকেলের সাথে অযান্ত্রিক সম্পর্ক আমাদের সকলের হয়ে উঠুক। 

এই বাংলাই ঐতিহ্য বজায় রেখে পথপ্রদর্শক হোক। City of joy-এর আরেক নাম City of cycle হয়ে উঠুক। কার তাতে কী, বিশ্বের এই মহাপ্রস্থানের পথে আমাদের প্রকৃতি-যাপন যদি নতুন করে জন্ম নেওয়ার স্বপ্ন দেখে? 

পোস্টার: কলকাতা সাইকেল সমাজ।
ছবি: শিলাদিত্য সিনহা।

Developed by DXDasia