অত্যাধুনিক অডিটোরিয়াম রূপে ফিরছে মরিস ব্যান্ডম্যান-রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত রক্সি সিনেমা

রক্সি ফিরছে!

কক পর্দার সিনেমা হলগুলো কলকাতা শহরের ইতিহাসের সঙ্গে মিশে গিয়েছে। হয়ে উঠেছে শহরের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ! সিঙ্গেল স্ক্রিনগুলোই ছিল আম শহরবাসীর বিনোদনের উপাদান, যেখানে কেরানি থেকে শিক্ষক, চিকিৎসক থেকে চালক এক আসনে বসে ছবি দেখতেন। ভিড় জমাতেন আট থেকে আশি। বিজলি, উজ্জ্বলা, ভবানী, ছায়া, মিত্রা, রূপবাণী, শ্রী, উত্তরা, রাধা, খান্না, দর্পণা, মিনার, বীণা, পূর্ণশ্রী, বিদুশ্রী, সুরশ্রী, টকিশো হাউস… একে একে শহরের বুক থেকে হারিয়ে গিয়েছে একক পর্দার সিনেমা হলগুলো। নয়ের দশকে বাংলায় প্রায় হাজারের কাছাকাছি সিঙ্গেল স্ক্রিন সিনেমা হল ছিল। এখন সংখ্যা একশোর কিছু বেশি। তাও অধিকাংশের অবস্থা নিভু নিভু। তবে আশা যে একেবারেই নেই এমনটা নয়। ব্যক্তিগত উদ্যোগে ফিরেছে গ্লোব। সরকারি উদ্যোগে বিনোদিনী থিয়েটার (স্টার) এখনও রমরমিয়ে চলছে।

এক সময়ের এম্পায়ার থিয়েটার

রক্সির পুনরুদ্ধারের কাজে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা ব্যয় করবে ক্রেডাই। রক্সি সিনেমাকে মডার্ন অডিটোরিয়াম হিসেবে গড়া হবে। আগামী বছরের মার্চের মধ্যে নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে নির্মাণ সংস্থা।

এবার ফেরার পালা রক্সি সিনেমা-র। কলকাতা পৌরসংস্থা সূত্রে খবর, খুব তাড়াতাড়ি রক্সিকে ফেরানো হবে। জানা যাচ্ছে, এই বিষয়ে ইতিমধ্যেই ক্রেডাইয়ের (দ্য কনফেডারেশন অফ রিয়েল এস্টেট ডেভোলপারস অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়া) সঙ্গে একটি মউ (MoU) স্বাক্ষর করেছে কলকাতা পুরসভা। রক্সির পুনরুদ্ধারের কাজে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা ব্যয় করবে ক্রেডাই। রক্সি সিনেমাকে মডার্ন অডিটোরিয়াম হিসেবে গড়া হবে। আগামী বছরের মার্চের মধ্যে নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে নির্মাণ সংস্থা। এখন সংস্কারের কাজ শুরু হওয়া সময়ের অপেক্ষা মাত্র।

ইতিহাসের জীবন্ত দলিল রক্সি সিনেমা, ঠিকানা ৪এ এবং ৪বি, চৌরঙ্গি প্লেস। হেরিটেজ তকমা পাওয়া রক্সি ১৯০৮ সালে অপেরা হাউস হিসাবে সফর শুরু করেছিল। রবীন্দ্রনাথ, সুভাষচন্দ্র, শিশির ভাদুড়ী, সত্যজিৎ, উদয়শঙ্কর কার পা পড়েনি এখানে! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে সেনাবাহিনী রক্সি অধিগ্রহণ করে ব্যারাক তৈরি করেছিল।

সিনেমা হলে রূপান্তরিত হওয়ার প্রাককালে ‘এম্পায়ার থিয়েটার’ নামে পরিচিত ছিল রক্সি। বিশ্বখ্যাত নাট্য-ব্যক্তিত্ব মরিস ব্যান্ডম্যান এবং গ্র্যান্ড হোটেলের স্থপতি আরাথুন স্টিফেনের উদ্যোগে কলকাতা পুরসভার বর্তমান সদর দপ্তরের বিপরীতে গত শতকে তৈরি হয়েছিল এই থিয়েটার। থিয়েটার থাকাকালীন ১৯১৯ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এখানে ‘দ্য সেন্টার অব ইন্ডিয়ান কালচার’ বক্তৃতাটি পাঠ করেছিলেন। এখানেই ১৯২৩ সালে ৬২ বছরের রবীন্দ্রনাথ ‘বিসর্জন’ নাটকে জয়সিংহের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। তিনের দশকে একাধিক রবীন্দ্র-নাটক মঞ্চস্থ হয়েছিল এম্পায়ার থিয়েটারে।

চারের দশকে এম্পায়ার থিয়েটার বদলে হল রক্সি সিনেমা। ১৯৪১ সাল, সিঙ্গল স্ক্রিন রক্সি সিনেমায় প্রথম শোয়ে দেখানো হয়েছিল অশোক কুমার অভিনীত ‘নয়া সংসার’। দ্বিতীয় সিনেমা ‘বসন্ত’ ৫০ সপ্তাহ চলেছিল। শোনা যায়, অশোক কুমার অভিনীত ‘কিসমত’ দেখতে নেতাজি সুভাষচন্দ্রও এসেছিলেন এখানে।

১০০ বছরেরও বেশি আগে রক্সির বাড়িটি বেঙ্গল প্রপার্টিজ নামে এক সংস্থাকে ৯৯ বছরের জন্য লিজ দেওয়া হয়েছিল। রক্সি হেরিটেজ গ্রেড ২ (এ) অধীনে। ২০০৫ সালে ভবন সংস্কারও করা হয়েছিল। লিজ চুক্তির মেয়াদ শেষ হয় ২০০৭-০৮ সালে। কিন্তু দখল মুক্ত করতে পারেনি কলকাতা পুরসভার তদানিন্তন বোর্ড। ২০১০-র পর থেকে বাড়িটি দখল মুক্ত করার উদ্যোগ শুরু হয়। পুনরায় লিজের আবেদন করলেও পুরসভা শর্ত অনুযায়ী টাকা দিতে পারেনি বেঙ্গল প্রপার্টিজ কর্তৃপক্ষ। জল গড়ায় আদালত অবধি। লিজ-অধিকারীদের আইন যুদ্ধে হারিয়ে বাড়ির মালিকানা লাভ করে কলকাতা পুরসভা। ২০১৭ সালে আদালতের রায়ের প্রেক্ষিতে পুরসভার পক্ষ থেকে রক্সি পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু হয়। 

ইতিমধ্যেই ক্রেডাইয়ের সঙ্গে একটি মউ স্বাক্ষর করেছে কলকাতা পুরসভা

থিয়েটার থাকাকালীন ১৯১৯ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এখানে ‘দ্য সেন্টার অব ইন্ডিয়ান কালচার’ বক্তৃতাটি পাঠ করেছিলেন। এখানেই ১৯২৩ সালে ৬২ বছরের রবীন্দ্রনাথ ‘বিসর্জন’ নাটকে জয়সিংহের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। তিনের দশকে একাধিক রবীন্দ্র-নাটক মঞ্চস্থ হয়েছিল এম্পায়ার থিয়েটারে।

২০২০ সালের ১২ মার্চ রক্সি সিনেমা হলে শেষ শো প্রদর্শিত হয়। তারপরই শুরু হয় করোনা পর্ব। পুরসভার আধার কার্ড সংক্রান্ত কাজ হত এখানে। এমনকী করোনা টিকাকরণ কেন্দ্র হিসাবে রক্সি সিনেমাকে দেখেছে মহানগরবাসী। রবীন্দ্রনাথ, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর স্মৃতিমাখা ভবনটি অচিরেই সরকারের নানা দাপ্তরিক কাজের জায়গায় পরিণত জয়। বিজ্ঞাপন, মার্কেট ও কর মূল্যায়ন বিভাগ কলকাতা পুরসভার মূল ভবন থেকে সরিয়ে অদূরে রক্সি সিনেমা হলে স্থানান্তরিত করার ভাবনা শুরু হয়। হেরিটেজ কনজারভেন্স কমিটিও পুর-পরিষেবার কাজে হল ব্যবহারের ছাড়পত্র দেয়।

প্রথম ভবনটি ভেঙে ফেলে পুনর্নির্মাণের কথা ভাবা হলেও, এখন ঠিক হয়েছে ভবনটি সংস্কার ও সংরক্ষণ করা হবে। মুম্বইয়ের ইরোজ সিনেমার আদলে তৈরি হবে রক্সি সিনেমা হল। রক্সির ভবনটি স্থাপত্যশৈলীতেও অনন্য। নির্মাণ শৈলীতে রয়েছে আর্ট ডেকো ঢঙের ছোঁয়া। শহরের একমাত্র অর্ধচন্দ্রাকৃতি হল রক্সি। প্রযুক্তিগতভাবেও ছিল একাধিক বিশেষত্ব। হল এমনভাবে তৈরি হয়েছিল যে মাইকের দরকার পড়ত না। শব্দ গমগম করতো অন্দর। তিনটি স্তরে বসার ব্যবস্থা, অর্ধচন্দ্রাকার বারান্দা, ভার্টিকাল স্ট্রিপ নকশা, বাহারি গ্রিল, সাদা মার্বেল পাথরের গোলাকার সিঁড়ি, ‘ড্রেস সার্কেল’, সবেতেই রক্সি ছিল সেরার সেরা। হলের মাথায় অবস্থিত গোলাকৃতি গম্বুজ শহরের ‘ল্যান্ডমার্ক’ হয়ে উঠেছিল।

প্রস্তাবিত নতুন রক্সি

জানা যাচ্ছে, রক্সির অন্দরের বিশ শতকের আর্ট ডেকোর আদল অক্ষুণ্ণ রেখেই সংস্কার হবে। অন্দরসজ্জার দায়িত্ব ক্রেডাইয়ের। বাইরে থেকে ভবনের কাঠামোগত সংস্কার করবে কলকাতা পুরসভা। গোটা কাজটি দেখাশোনা করবে কলকাতা হেরিটেজ কমিটি।

১১৭ বছরের প্রাচীন সিনেমা হলটি ভগ্ন দশায় শত শত ইতিহাস আঁকড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে। এবার তা নবকলেবরে ফিরবে। ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষায় এহেন সরকারি উদ্যোগ ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশে বিরল। রক্সি সিনেমা ঘুরে দাঁড়ালে দৃষ্টান্ত তৈরি হবে। আম জনতার সাড়া মিললে হয়তো আরও কয়েকটি একক পর্দার সিনেমা হলকে বাঁচানোর পদক্ষেপ করা হতে পারে।

_____________________
এখনও পর্যন্ত খবর পাওয়া অনুযায়ী প্রতিবেদনটি লেখা হয়েছে। আগামীদিনে নতুন তথ্য এলে এই লেখায় যোগ করা হবে।

 

Post Tags
Developed by DXDasia