বাংলা ছড়ায় লুকিয়ে থাকা ইতিহাস

সমাজচিত্রের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পাল্টে যায় ছড়ার বিষয়বস্তু

ছেলেবেলার ঘুম না আসা দুপুরগুলোয় মা-ঠাকুমাদের থেকে ছড়া শোনেনি এমন মানুষ পাওয়া দুষ্কর। এ যেন সেই সোনার কাঠি, যার অমোঘ স্পর্শে আমাদের মনের ক্যানভাসে ভেসে ওঠে এক রূপকথার জগৎ। যেখানে আছে ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী, লালকমল-নীলকমল কিংবা রাক্ষসের হাত থেকে রাজপুত্রের রাজকন্যাকে বাঁচিয়ে আনার রোমাঞ্চকর সব গল্প। বিশ্বব্যাপী লোকসাহিত্যের একটি বিশেষ অংশ জুড়ে আছে এই ছড়াগুলি। তবে সাহিত্যচর্চার মতো সুচিন্তিত-সচেতনভাবে কথা বসানো নয়, শব্দের চলন এখানে বড়োই অনায়াস আর স্বতঃস্ফূর্ত। সৃষ্টির আদি থেকেই, অর্থাৎ যখন থেকে মানুষ নিজের মনের ভাব প্রকাশ করতে শিখেছে তখন থেকেই সৃষ্টিসুখের উল্লাসে তৈরি হয়ে আসছে নানান ছড়া। দেশ-কালের সীমানা ছাড়িয়ে এক যুগ থেকে অন্য যুগে সঞ্চারিত হয়ে যাওয়া এইসব ছড়াগুলির রচয়িতার নাম হয়তো অজানা, তবুও তাঁদের সৃষ্টি রয়ে গেছে আজও। সরল গ্রামীণ জনসাধারণ তাদের চারপাশে দেখা জগৎকেই জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে মৌখিকভাবে এই ছড়াগুলির মাধ্যমে ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন।

প্রথমদিকে এগুলির কোনো লিখিত রূপ না থাকার ফলে লোকের মুখে মুখেই প্রচারিত হয়ে এসেছে ছড়াগুলি। মৌখিক প্রচারের ফলে অনেক সময়ই এগুলির বেশ কিছু বদলও হয়ে যেত; এভাবেই পরিবর্তন, পরিমার্জন কিংবা সংযোজনের মধ্যে দিয়ে ছড়াগুলির ক্রমবিবর্তন ঘটেছে। এছাড়াও, অঞ্চলভেদে বাংলা ভাষাভাষী বিভিন্ন জায়গায় একই ছড়ার বিভিন্ন পাঠ প্রচলিত আছে। তবে যখন থেকে এগুলি লিপিবদ্ধ করা শুরু হল, তখন থেকে এই পরিবর্তনের পথ গেল প্রায় বন্ধ হয়ে এবং কালক্রমে কম জনপ্রিয় পাঠগুলি গেল হারিয়ে। অনেকের মতে, ১৮৭৩ সালে ভাষাতত্ত্ববিদ স্যার জর্জ গ্রিয়ারসন্ ইংরাজি অনুবাদসহ যে বাংলা ছড়াসংগ্রহ প্রকাশ করেন সেটির ‘দুগ্ধ মিঠা, চিনি মিঠা, আরো মিঠা ননী…’ ছড়াটিই বাংলা ছড়ার প্রাচীনতম সংগ্রহ। তবে ১২৭১ বঙ্গাব্দ বা ১৮৬৫ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত দুর্গাচরণ চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘বিক্রম’ নাটকে আমরা এই ছড়াটি পাই – ‘নিম তিতো, কল্লা(করলা) তিতো, তিতো মাকাল ফল।/ তা হইতে অধিক তিতো দু’সতীনের ঘর।।’ এর থেকে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় যে, ১৮৬৫ খ্রিষ্টাব্দে দুর্গাচরণ চট্টোপাধ্যায়ের উদ্ধৃত ছড়াটিই বাংলাভাষায় সংগৃহীত প্রাচীনতম মৌখিক ছড়ার নিদর্শন।

ভারতীয় উপমহাদেশে ছড়া চর্চার ইতিহাস যদিও প্রায় দেড় হাজার বছরের পুরোনো। সেই সময়ের অধিকাংশ ছড়াই ছিল নীতিমূলক, উপদেশসূচক বা ভবিষ্যৎ গণনার দিকে নির্দেশিত, প্রসঙ্গত খনার বচনের কথা উল্লেখ্য। এছাড়াও, বিশেষত নারীদের রচিত ও নিয়ন্ত্রিত বাঙালির একান্ত নিজস্ব বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব – অনুষ্ঠান – পার্বণ – ব্রত বিষয়ক রচনাগুলির মধ্যেও ছড়ার গঠনমূলক উপাদান পাওয়া যায়। তারপরের কয়েকশো বছরের বাংলার ইতিহাস রাজনৈতিক টানাপোড়েনের ইতিহাস। ‘শক-হুন-দল, পাঠান-মোগল’ থেকে ব্রিটিশ রাজশক্তির বাংলা দখল… ক্রমশ পাল্টে যাওয়া সমাজচিত্রের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পাল্টে যেতে থাকে ছড়ার বিষয়বস্তুও। ইতিহাস লেখার কথা ভেবে তৈরি না হলেও ছড়াগুলির মধ্যে ফুটে ওঠে তৎকালীন সামাজিক অবস্থান, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বরূপ, জনমানসের বিচিত্র সব অনুভব আর বিশ্বাস, ফলে ঐতিহাসিক ও সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেও এদের গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের অতি পরিচিত কিছু ছড়ার দিকে তাকালেই এ কথার যথার্থতা যাচাই করা যায়। যেমন –

“খোকা ঘুমালো, পাড়া জুড়ালো বর্গি এল দেশে।
বুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দেব কিসে?
ধান ফুরল, পান ফুরল খাজনার উপায় কী?
আর ক’টা দিন সবুর কর রসুন বুনেছি।।
ধনিয়া পিঁয়াজ গেছে পচে সর্ষে ক্ষেতে জল।
খরা-বন্যায় শেষ করিল বর্ষ এর ফসল।।
ধানের গোলা, চালের ঝুড়ি সব শুধু খালি।
ছিন্ন কাপড় জড়িয়ে গায়ে শত শত তালি।।”

আমাদের সকলেরই খুব চেনা এই ছড়াটি আদতে একটি ঘুমপাড়ানি ছড়া হলেও এর মধ্যে লুকিয়ে আছে অষ্টাদশ শতকে মারাঠা শক্তির বাংলা আক্রমণের ইতিহাস। ১৭৪২ থেকে ১৭৫১ সাল পর্যন্ত একাধিকবার বাংলার পশ্চিম সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলিতে লুটতরাজ চালায় মারাঠা বর্গিরা। এই বর্গি শব্দটি এসেছে একটি ফারসি (মতান্তরে মারাঠি) শব্দ থেকে, যার অর্থ ‘অশ্বারোহী মারাঠা যোদ্ধা’। বাংলায় তখন চলছে আলিবর্দি খাঁ’র শাসন। যুদ্ধক্ষেত্রে প্রভূত বীরত্বের পরিচয় দিলেও মারাঠা আক্রমণ ঠেকাতে তিনি ব্যর্থ হন। ভাস্কর পণ্ডিতের নেতৃত্বে অশ্বারোহী মারাঠা সৈন্যরা সমগ্র বাংলা জুড়ে নিরীহ মানুষের ওপর নির্মম অত্যাচার চালাতে থাকে। গ্রামবাসীদের কাছ থেকে জোর করে তারা খাজনা বা করও আদায় করত। ‘বুলবুলিতে ধান খেয়েছে, খাজনা দেব কিসে’ — এখানে সেই খাজনার কথাই বলা হয়েছে। অন্যদিকে বাংলার ব্যবসা-বাণিজ্যও তখন বন্ধ হওয়ার জোগাড়, সঙ্গে অজন্মা আর খরা মিলে অবস্থা আরও ভয়াবহ করে তোলে, সেই বর্ণনাও পরের লাইনগুলোয় আমরা পাই। বলে রাখা ভালো, এই মারাঠা বর্গিদের ঠেকাতেই কলকাতায় ‘মারাঠা ডিচ’ খনন করা হয়। তবে এতকিছু করেও বাংলা থেকে তাদের তাড়ানো যায়নি, শেষমেশ ১৭৫১ সালে এক সন্ধিচুক্তি করে আলিবর্দি খাঁ মারাঠাদের হাতে উড়িষ্যা ছেড়ে দেন এবং বাংলা নিস্তার পায় বর্গি জুলুমের হাত থেকে। তবে আক্রমণের ভয়াবহতা এতটাই ছিল যে, বর্গি হানার এই ভয়াবহ স্মৃতি বাংলার ঘুমপাড়ানি গানেও পাকাপাকিভাবে ঠাঁই পেয়ে যায়।

এরপর আসা যাক খেলার ছড়ায়। ছোটোবেলায় ভাইবোন কিংবা বন্ধুবান্ধবরা মিলে আঙুল গুনে-গুনে ‘ইকিড়-মিকিড়’ তো আমরা সবাই খেলেছি। লোডশেডিং-র সন্ধেই হোক বা ঝড়-বৃষ্টির রাত, ছন্দ মিলিয়ে একসঙ্গে আমরা সকলে বলে উঠতাম –

“ইকিড় মিকিড় চামচিকির
চামে কাটা মজুমদার।     
ধেয়ে এল দামোদর।    
দামোদরের হাঁড়িকুড়ি      
দুয়ারে বসে চাল কুড়ি।      
চাল কুড়িতে হল বেলা   
ভাত খায়নি দুপুরবেলা।  
ভাতে পড়ল মাছি,  
কোদাল দিয়ে চাঁছি।  
কোদাল হল ভোঁতা  
খ্যাঁকশিয়ালের মাথা।”

এই ছড়াটির মধ্যেও ধরা আছে বাংলা ইতিহাসের তুলনামূলক অনালোচিত একটি পর্ব। মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গিরের নির্দেশে তাঁর সেনাপতি মানসিংহ বাংলায় আসেন তৎকালীন বারো ভুঁইঞাদের অন্যতম প্রতাপাদিত্যকে পরাজিত করতে। কারণ ১৫৯৯ সাল নাগাদ প্রতাপ বাংলার মুঘল সুবাদারকে অমান্য করে রাজ্য শাসন করা শুরু করেন এবং একজন স্বাধীন রাজ্যের নৃপতি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন। তবে জলঙ্গি নদী পার হতে গিয়ে মানসিংহ ঝড়ের কবলে পড়েন। এই সময় তাকে প্রভূত সাহায্য করেন বাংলার তিন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব, যাদের প্রত্যেকেরই পদবি ছিল ‘মজুমদার’ – তারা হলেন লক্ষ্মীকান্ত মজুমদার, ভবানন্দ মজুমদার এবং জয়ানন্দ মজুমদার। এঁদের মধ্যে ভবানন্দ তাঁকে নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে খাতির-যত্ন করেন, বিশাল সেনাবাহিনীর থাকার বন্দোবস্ত করে দেন এবং নৌকা জোগাড় করে দিয়ে নদী পার হতেও সাহায্য করেন।

ছড়ার প্রথম লাইনে ‘চামচিকির’ কথার অর্থ যে খুব সুবিধের নয় তা বোঝা সহজ। পরের লাইনে ‘চামে কাটা’ কথার মানে ‘চামড়া নেই’ যার অর্থাৎ নির্লজ্জ–বেহায়া। আর দামোদরের বন্যা তো সেই সময় প্রায় প্রবাদে পরিণত হয়েছিল। যে কোন নদীর ভয়ঙ্কর রূপকে কিংবা বর্ষায় তার ফুঁসে ওঠাকে দামোদরের ধেয়ে আসার সঙ্গেই তুলনা করা হত। এখানে ঝড়বৃষ্টির রাতে ফুঁসে ওঠা জলঙ্গিকেই হয়তো দামোদরের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। অন্যদিকে ভবানন্দ মজুমদার প্রভাব-প্রতিপত্তির লোভে মানসিংহ ও তাঁর বিশাল সৈন্যবাহিনীর তোষামোদ করলেও তার কর্মচারী বা রাঁধুনি-ঠাকুররা কেনই বা বাংলা আক্রমণ করতে আসা দুর্বৃত্তদের সেবাযত্ন করবেন! তাই বাধ্য হয়েই এতোজনের খাবার আয়োজন করতে গিয়ে তাদের বেলা গড়িয়ে যেত। এভাবেই শুধু বাংলায় মুঘল আক্রমণের ইতিবৃত্তই নয়, সমকালীন সাধারণ মানুষের অবস্থার কথাও উঠে এসেছে এইসব ছড়ায়। আরও একটি সুপরিচিত খেলার ছড়া –

“আগডোম বাগডোম ঘোড়াডোম সাজে। 
ঢাক মৃদং ঝাঁঝর বাজে।।
বাজতে বাজতে চলল ঢুলি।  
ঢুলি গেল সেই কমলাফুলি।। 
কমলাফুলির টিয়েটা। 
সুয্যিমামার বিয়েটা।। 
আয় রঙ্গ হাটে যাই।  
এক খিলি পান কিনে খাই।।  
পানের ভিতর ফোঁপড়া। 
মায়ে ঝিয়ে ঝগড়া।।
হলুদ বনে কলুদ ফুল। 
মামার নামে টগর ফুল।।”

‘ছেলেভুলোনো ছড়া’ গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ বলছেন যে, এই ছড়াটির প্রথম কয়েকটি ছত্রে বিবাহ যাত্রার বর্ণনা রয়েছে। অভিজাত পরিবারের বিয়ের শোভাযাত্রা আগে ছিল যুদ্ধযাত্রারই পরিমার্জিত রূপ। কারণ একটা সময় পর্যন্ত জোর করে তুলে আনা বিজিত গোষ্ঠীর মেয়েদের বিয়ে করবে বিজয়ী গোষ্ঠীর ছেলে, এমনটাই ছিল প্রথা। এমনকি ‘শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত’ গ্রন্থে আমরা উল্লেখ পাই তখনকার বিয়েতে জয়ঢাকও বাজানো হত। এই ছড়াটিতে তেমনই একটি বিবাহযাত্রার কথা বলা হয়েছে। তবে মূল ছড়ার প্রথম অংশটি আসলে ‘ডোম চতুরঙ্গের’ বর্ণনা।

সাতগাঁ বা সপ্তগ্রামের বাগদি রাজা হরিবর্মার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন, তাঁর ছিল বাগদি আর ডোম সেনা। বাগদি সেনারা যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াই করে, আর ডোম সেনারা রাস্তা তৈরি করে, শত্রুর উপর নজর রাখে। রাজনগরের সামন্তরাজাদের, বিষ্ণুপুরের মল্লরাজাদের এই ডোম সেনা ছিল। এখানে ‘আগডোম’ মানে অগ্রবর্তী ডোম সেনাদল, ‘বাগডোম’ মানে বাগ বা পার্শ্বরক্ষী ডোমসেনা আর ‘ঘোড়াডোম’ মানে অশ্বারোহী সৈন্যদল। যুদ্ধের দামামা বেজে উঠলেই এই ডোমসেনারা আগে গিয়ে রাস্তার অবস্থা দেখে আসতেন, পথ তৈরি করতেন এবং ঘোড়ায় চড়ে সমস্ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতেন আর সেই খবর পৌঁছে দিতেন অন্যদের। এরা হলেন রাঢ় অঞ্চলের সেই সমস্ত অন্ত্যজ, অস্পৃশ্য জনগোষ্ঠীর শরিক, যাদের নির্ভীক আত্মবলিদানের জোরেই সমাজের ওপর তলার রাজা-মহারাজারা যুদ্ধ জয় করতে পারতেন। আমাদের তথাকথিত ইতিহাসে ভুরিভুরি যুদ্ধবিগ্রহ, রাজারাজড়ার কথা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকলেও, ডোমসেনাদের মতো মাঠে নেমে যুদ্ধ জেতানোর কারিগরদের বীরগাথা ঠাঁই পায়নি সেখানে। বরং তাদের বীরগতির কথা, যুদ্ধের ফলে সাধারণ মানুষের ক্ষয়ক্ষতির কথা ধরা আছে এরকম সব খেলার ছড়ায়, প্রবাদে, বাংলার লোকসঙ্গীতে আর লোকগাথায়। তবে ছড়াগুলি গড়ে ওঠার কোনও লিখিত ইতিহাস যেহেতু নেই, তাই বিশ্লেষণগুলি নিয়ে ভিন্নমত থাকতেই পারে। কিন্তু এগুলির ঐতিহাসিক ভিত্তি এবং মূল্য কোনটাই ফেলনা নয়।
দেশে ইংরেজ শাসন কায়েম হওয়ার পর বাংলার একান্ত নিজস্ব এই ছড়াগুলিতে বিদেশি শব্দ, বিশেষত ইংরাজি শব্দের অনুপ্রবেশও লক্ষনীয়। ওপরের ছড়াটিরই একটি পরিবর্তিত রূপ নিচে দেওয়া হল। এটিও আমাদের খুব চেনা একটি ছড়া, তবে ইংরাজি কথাগুলো বোঝার সুবিধার্থে ইংরাজি হরফেই লেখা হল, যা থেকে এর অর্থ খুব সহজেই অনুমানযোগ্য হয় –

“I COME, ভাই COME তাড়াতাড়ি,
যদু MASTER শ্বশুরবাড়ি।
RAIN(/RAIL) COME ঝমাঝম,
পা পিছলে আলুর দম”।

এভাবেই সময়ের চালচিত্র হয়ে আমাদের সমাজজীবনের জীবন্ত দলিল বহন করে চলেছে এই ছড়াগুলি। বাঙালির ছড়া সংগ্রহের কথা বলতে গেলে সবার আগে যার নাম করতে হয় তিনি হলেন বাংলা ছড়ার প্রথম সংগ্রাহক ও বিদগ্ধ সমালোচক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। জমিদারির সুবিধা থাকায় বহু অঞ্চল থেকে তিনি নিজে যেমন ছড়া সংগ্রহের কাজ চালিয়েছেন, তেমনি অন্যদের দিয়েও সংগ্রহ করিয়েছেন এবং তাঁর বহু রচনাতেই এই ছড়াগুলির প্রভাব ও অনুপ্রেরনা আমরা দেখতে পাই। এছাড়াও, বাংলা ছড়ার আলোচকদের মধ্যে আছেন রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার, আশুতোষ ভট্টাচার্য প্রমুখরা। ছড়া সংকলনের কাজ করেছেন আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, যোগীন্দ্রনাথ সরকার, কমলকুমার মজুমদার, মহিলাদের মধ্যে আছেন রেণুকাবালা দাসী, নিরুপমা দেবী এবং আরো অনেকে। এঁদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল হিসাবেই আজ আমরা ছড়াগুলির বিষয়ে জানতে পারছি, বিভিন্ন পাঠগুলি পড়ার সৌভাগ্য হচ্ছে। এখন আমাদের কর্তব্য এগুলি সংরক্ষণ করা এবং পরের প্রজন্মে এগুলি সঞ্চারিত করে দেওয়া, যাতে তারাও তাদের শিকড়ের সঙ্গে পরিচিত হতে পারে ও জানতে পারে বাংলা সাহিত্যভাণ্ডারের মণিমাণিক্যের কথা। আর মনে রাখতে হবে রবীন্দ্রনাথের এই কথাটিকে, “ছড়াগুলি স্থায়ী ভাবে সংগ্রহ করিয়া রাখা কর্তব্য। কারণ, ইহা আমাদের জাতীয় সম্পত্তি। এই ছড়াগুলির মধ্যে অনেক দিনের অনেক হাসিকান্না আপনি অঙ্কিত হইয়াছে, ভাঙাচোরা ছন্দগুলির মধ্যে অনেক হৃদয়-বেদনা সহজেই সংলগ্ন হইয়া রহিয়াছে।”

তথ্যসূত্র : 
বাংলার লোকসাহিত্য (দ্বিতীয় খণ্ড) – ডঃ আশুতোষ ভট্টাচার্য
ছেলেভুলানো ছড়া – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অর্পিতা চন্দ

ছবি : সোহিনী রায়

Developed by DXDasia