
সংগীতশিল্পী শান্তিদেব ঘোষের নৃত্য পারদর্শীতা ও গবেষণার কথা
কল্যাণীয়েষু শান্তি,
কেবল দুটি উপদেশ আমার আছে। এই আশ্রমেই তুই মানুষ। সিনেমা প্রভৃতির সংস্পর্শে কোনও গুরুতর লোভেও নিজেকে যদি অশুচি করিস তাহলে আমার প্রতি ও আশ্রমের প্রতি অসম্মানের কলঙ্ক দেওয়া হবে। দ্বিতীয়, আমার গানের সঞ্চয় তোর কাছে আছে—বিশুদ্ধ ভাবে সে গানের প্রচার করা তোর কর্তব্য হবে। আমি তোর পিতার পিতৃতুল্য। আশা করি আমার উপদেশ মনে রাখবি।
শুভার্থী
রবীন্দ্রনাথ
মৃত্যুর প্রায় আট মাস আগে রবীন্দ্রনাথ শান্তিদেব ঘোষের উদ্দেশ্যে এ চিঠি লিখেছিলেন। কিন্তু, বিশ্বভারতীর স্বদেশ প্রেমিক শিক্ষক কালীমোহন ঘোষ-এর পুত্র, তাঁর স্নেহের ‘শান্তি’কে হঠাৎ এহেন চিঠি লিখতে গেলেন কেন?
শান্তিদেব ঘোষ রবীন্দ্রনাথের কতটা কাছের মানুষ ছিলেন, তা সেসময় বিশ্বভারতীর সকলেই জানতেন। এই কারণে অনেকেরই চক্ষুশূল হয়ে উঠেছিলেন শান্তিদেব, তাঁর আত্মজীবনী ‘জীবনের ধ্রুবতারা’-য় এর কারণ ব্যাখ্যাও করেছিলেন। বিশ্বভারতীর তরুণ অধ্যাপকরা তাঁদের দলে টানতে চেয়েছিলেন তাঁকে। কিন্তু তাঁদের কার্যকলাপে প্রথম থেকেই তাঁদের প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষোণ করতেন শান্তিদেব। তার ফলস্বরূপ ওই দলটি তাঁর বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথের কাছে হামেসাই বিভিন্ন ধরনের ভুয়ো অভিযোগ পেশ করতেন। রবীন্দ্রনাথ কান দিতেন না। শান্তিদেবকে বারবার শুধু একটা কথা বলতেন, ‘নিজের মতো কাজ করে যাও’। তবু শুধু একবার, তাঁর প্রিয় শান্তি-কে অবিশ্বাস করে ফেলেছিলেন। সেবার অভিযোগকারীরা এমন ভাবে তাঁদের অভিযোগ পেশ করেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ সেসব সত্যি ভেবে শান্তিদেবকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। ঘটনাটি ঘটে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর আট মাস আগে। অভিযোগ ছিল : অর্থলোভে শান্তিনিকেতন ত্যাগ করবেন শান্তিদেব এবং সিনেমায় যোগ দেবেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে অবিশ্বাস করেছেন শুনে প্রায় কেঁদেই ফেলেছিলেন শান্তিদেব। সেদিন বিস্তর কথাবার্তার পর, ভুল বোঝাবুঝি শেষে শান্তিদেবের মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ।
রবীন্দ্রনাথ ও শান্তিদেব
রবীন্দ্রসঙ্গীত (১৯৪২), রূপকার নন্দলাল (নন্দলাল বসুর জীবনী, ১৯৫৬), ভারতীয় গ্রামীণ সংস্কৃতি (১৯৫৬), রবীন্দ্রসংগীত-বিচিত্রা, জীবনের ধ্রুবতারা (আত্মজীবনী) গ্রন্থগুলি ছাড়া শান্তিদেব ঘোষের লেখা নাচ সম্বন্ধীয় বইগুলি হল: জাভা ও বালির নৃত্যগীত (১৯৬৩), রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শে সংগীত ও নৃত্য, গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ও আধুনিক ভারতীয় নৃত্য (১৯৮৬), নৃত্যকলা ও রবীন্দ্রনাথ, গ্রামীণ নৃত্য ও নাট্য।
রবীন্দ্রগানের সাধক হিসেবে বিশ্বখ্যাত হলেও নৃত্যশিল্পী ও নৃত্য-গবেষক শান্তিদেব ঘোষ আজও অচেনা। রবীন্দ্রনাথের ইচ্ছেতে নাচ শিখেছিলেন শুধু তাই নয় পরবর্তীতে হয়ে উঠেছিলেন নৃত্য-গবেষক। হয়ে উঠেছিলেন শান্তিনিকেতন ঘরানার নৃত্যের অন্যতম কান্ডারী। রবীন্দ্রনাথের নৃত্যনাট্য পরিবেশন করেছেন বহু দেশে। শান্তিদেবকে ১৯৩৪ সালে সাউথ ইস্ট এশিয়ায় পাঠিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ৪০ জন সদস্য নিয়ে গিয়ে শান্তিদেবই প্রথম ভারতীয় ধারায় ‘শাপমোচন’নৃত্যনাট্য পরিবেশন করেন ওখানে। পরে একা শ্রীলঙ্কা গিয়েছিলেন ক্যান্ডি ডান্স শেখার জন্য। নানা ধারার নাচ শিখে তিনি কখনও ‘চিত্রাঙ্গদা’র অর্জুন চরিত্রে, কখনও বা ‘শ্যামা’র কোটাল চরিত্রে, কখনও ‘চণ্ডালিকা’য় প্রহরীরূপে আবার রাজদূতরূপেও অভিনয় করেছেন। স্বরক্ষেপ, চলন এবং হাতের মুদ্রায় আলাদা হয়ে যেত তাঁর অর্জুন, বাউল অথবা কোটাল।
চিত্রাঙ্গদা-র কলাকুশলীদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ, দিল্লিতে
রবীন্দ্রসঙ্গীত (১৯৪২), রূপকার নন্দলাল (নন্দলাল বসুর জীবনী, ১৯৫৬), ভারতীয় গ্রামীণ সংস্কৃতি (১৯৫৬), রবীন্দ্রসংগীত-বিচিত্রা, জীবনের ধ্রুবতারা (আত্মজীবনী) গ্রন্থগুলি ছাড়া নাচ সম্বন্ধীয় শান্তিদেব ঘোষের লেখা বইগুলি হল: জাভা ও বালির নৃত্যগীত (১৯৬৩), রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শে সংগীত ও নৃত্য, গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ও আধুনিক ভারতীয় নৃত্য (১৯৮৬), নৃত্যকলা ও রবীন্দ্রনাথ, গ্রামীণ নৃত্য ও নাট্য। “গত ত্রিশ বৎসর যাবৎ নানা প্রকার গ্রামীণ নৃত্য ও অভিনয় দেখে বেড়িয়েছি। বিভিন্ন পত্রিকায় তার পরিচয়ও প্রকাশ করেছি বারে বারে। গ্রামীণ নৃত্য বিষয়ে নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে উত্তর দিতে হয়েছে সাময়িক পত্রের সাহায্যে।” ১৩৬৬ বঙ্গাব্দে শান্তিনিকেতনে এক বিজয়া দশমীর দিন একথাগুলি লিখেছিলেন শান্তিদেব। তাঁর ‘গ্রামীণ নৃত্য ও নাট্য’ বইয়ের মুখবন্ধে। সত্তরের দশকে ‘বাল্মীকি প্রতিভা’য় বাল্মীকি চরিত্রে, শান্তিদেবের ছাত্র সংগীতশিল্পী মোহন সিং খাংঙ্গুরা’র কথায় “‘তাসের দেশ’-এ রাজা ও রাজপুত্র চরিত্রে শান্তিদা অসাধারণ নাচ করতেন।” অনেক বয়সে কলকাতার এক অনুষ্ঠানে ‘ফাল্গুনী’-তে বাউল বেশে গান গেয়ে নেচেছিলেন। তাঁর সঙ্গে সেবার নাচের সুযোগ পেয়েছিলেন প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী অলকানন্দা রায়; তখন তিনি কিশোরী।

রবীন্দ্রনাথের নৃত্য ভাবনার দেহবিন্যাসের সঙ্গে যাঁরা যুক্ত ছিলেন তাঁদের মধ্যে নিঃসন্দেহে অগ্রগণ্য নাম শান্তিদেব ঘোষ। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যপ্রসূত দৃশ্যকাব্যের মাধ্যম ছিল দেহের সৌন্দর্যবর্ধক অঙ্গসঞ্চালন। এই অঙ্গসঞ্চালনের ভাষার জন্য তিনি তাকিয়েছেন আমাদের লোক আঙ্গিকের পাশাপাশি অন্য রাজ্যের শাস্ত্রীয় নৃত্য আঙ্গিকগুলির দিকে। তার মধ্যে মণিপুরি ও কথাকলির নাম সর্বাগ্রে করা হয়। শান্তিদেব ঘোষ সর্বপ্রথম মণিপুরি আঙ্গিক শিখতে শুরু করেন বুদ্ধিমন্ত সিংহ ও নবকুমার সিংহের কাছে, শান্তিনিকেতন আশ্রমে। কেরলে গিয়ে কথাকলি নৃত্য শিক্ষাও করেন। শ্রীলঙ্কার ক্যান্ডিনৃত্যের তালিমও তিনি নিয়েছিলেন। এ সবই হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের তত্ত্বাবধানে। কিন্তু শান্তিদেব ঘোষের নাম কখনওই এক জন মণিপুরি নৃত্যশিল্পী বা কথাকলি অথবা ক্যান্ডি নৃত্যশিল্পী হিসেবে আলোচিত হয় না। তাঁর শরীরকে নৃত্যোপযোগী করার প্রয়াসে রবীন্দ্রনাথ এই সব নৃত্যের তালিম করিয়েছিলেন এবং এই ‘শিক্ষিত’ দেহকে ব্যবহার করছিলেন তার নাট্য, নৃত্যনাট্য ও গানের দৃশ্যকাব্য তৈরিতে। শান্তিদেব ঘোষের নৃত্যনাট্যের চরিত্র চিত্রায়ণ তাই রবীন্দ্রনাথের নৃত্য ভাবনার ভাবধারাকেই প্রতিষ্ঠা করে। জনৈক সংবাদপত্রে স্মৃতিচারণা করেছিলেন শ্রুতি বন্দ্যোপাধ্যায় (মণিপুরি নৃত্যশিল্পী, বিভাগীয় প্রধান রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, নৃত্যবিভাগ)
আরও পড়ুন: নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু
মোহন সিং খাংঙ্গুরার সঙ্গে
বাংলায় রবীন্দ্রনাথ প্রবর্তিত নৃত্যের যে যুগান্তকারী ‘এক্সপেরিমেন্ট’— যা পরবর্তীতে বাংলার ঐতিহ্যপূর্ণ নৃত্যধারা ‘রবীন্দ্রনৃত্য’ নামে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে— সেই ‘এক্সপেরিমেন্ট’-এর ‘ইনস্ট্রুমেন্ট’ রূপে শান্তিদেব ঘোষের নাম উজ্জ্বল। রবীন্দ্র পরবর্তী যুগে তিনি বিশ্বভারতী প্রযোজিত নৃত্যনাট্যগুলির উপদেষ্টা হয়ে রবীন্দ্র ঐতিহ্যকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। আজীবন তিনি রবীন্দ্রনাথের নৃত্যভাবনার সংরক্ষণের প্রতি দায়িত্ববদ্ধ ছিলেন শান্তিদেব ঘোষ।
_____________
তথ্যসূত্র:
গ্রামীণ নৃত্য ও নাট্য : শান্তিদেব ঘোষ
শান্তিনিকেতনের শান্তিদেব : আনন্দবাজার আর্কাইভ
