
১৯ বছর বয়সে বিশ্বভারতীতে ছাত্র হিসেবে যোগদান করেন আনন্দ সামারাকুন
১৯৬২ সালের ৫ এপ্রিল। এইদিনই স্বেচ্ছায় গভীর ঘুমের অতলে তলিয়ে যাবেন আনন্দ সামারাকুন (Ananda Samarakoon), শ্রীলঙ্কার জাতীয় সংগীত (Sri Lankan National Anthem) লেখক। একদিন তাঁর লেখা গান নির্বাচিত হয় শ্রীলঙ্কার জাতীয় সংগীত হিসেবে। স্বাধীন শ্রীলঙ্কার নিজস্ব জাতীয় সংগীত। আবেগে বিহ্বল প্রতিটি মুহূর্তে শ্রীলঙ্কাবাসী গেয়ে যাবে এই গান। আনন্দ সামারাকুন এই গর্বিত মুহূর্তগুলির শরিক হতে পারবেন না আর। আসলে আত্মহত্যার সিদ্ধান্তটা তাঁর নিজস্ব। প্রকৃত কারণ আজও জানা যায়নি। কাজেই তাঁর আকস্মিক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে জমে ওঠে সংশয়ের মেঘ। শুরু হয় নানা বিতর্ক। আজও।
১৯৩০ সালে তরুণ সামারাকুন বিশ্বভারতীর (Visva-Bharati) কলাবিভাগের ছাত্র হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। খুব তাড়াতাড়ি তিনি হয়ে ওঠেন রবীন্দ্রনাথের প্রিয় ছাত্র। রবীন্দ্রসংগীতের (Rabindra Sangeet) সুর ও কথা বরাবর মুগ্ধ করত সামারাকুনকে। বিশ্বভারতীতে যখন তিনি ছাত্র হিসেবে যোগদান করেন, তখন তাঁর বয়স মাত্র উনিশ। বিশ্বভারতী থেকে শ্রীলঙ্কায় ফিরে আসার পর নিজের নামের আগে ‘আনন্দ’ উপাধি যোগ করেন। এর অন্তরালে বৌদ্ধ প্রভাবের কথা অনেকে বলেন। রবীন্দ্রনাথের (Rabindranath Tagore) বৌদ্ধধর্ম প্রীতির প্রভাবও হতে পারে। শ্রীলঙ্কায় মাহিন্দ্র কলেজে ১৯৩৮ থেকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত অধ্যাপনা করেছিলেন সামারাকুন। তখন শ্রীলঙ্কায় প্রচলিত গানগুলির মধ্যে সেরকম সাহিত্যিক মেধার নজির ছিল না। সামারাকুন শ্রীলঙ্কার গানের এক নতুন ঘরানা তৈরি করতে চাইছিলেন। অবশ্যই সেখানে ছিল রবীন্দ্রচর্চা এবং রবীন্দ্রসংগীতের প্রভাব। একটি গানে তিনি দুই গ্রাম্য তরুণ তরুণীর মধ্যে সংলাপের ধরনে গান লিখেছিলেন। এই গানটির প্রবল সাফল্যের পর সামারাকুন অসংখ্য গান লেখেন এবং সঙ্গীতজ্ঞ হিসেবে সাফল্য পান। তবে সুখ দুঃখ পাশাপাশি থাকে। ১৯৪৫ সালে সামারাকুনের পাঁচ বছরের ছেলের মৃত্যু হয়। সামারাকুন মনের শান্তির জন্য আবার ভারতে চলে আসেন এবং সেখানে গিয়ে চিত্রকর হিসেবে নতুনভাবে সম্মান পান। তিনি আবার গানের জগতে ফিরে আসেন ১৯৫১ সালে। আদর্শ শিল্পী ছিলেন তিনি। তাই যন্ত্রণা আর বিতর্ক তাঁর পিছু ছাড়েনি কখনও। শ্রীলঙ্কার জাতীয় সংগীত নিয়ে বিচিত্র বিতর্ক আজও চলছে।
সামারাকুন শ্রীলঙ্কার গানের এক নতুন ঘরানা তৈরি করতে চাইছিলেন। অবশ্যই সেখানে ছিল রবীন্দ্রচর্চা এবং রবীন্দ্রসংগীতের প্রভাব। একটি গানে তিনি দুই গ্রাম্য তরুণ তরুণীর মধ্যে সংলাপের ধরনে গান লিখেছিলেন। এই গানটির প্রবল সাফল্যের পর সামারাকুন অসংখ্য গান লেখেন এবং সঙ্গীতজ্ঞ হিসেবে সাফল্য পান।

শ্রীলঙ্কায় রবীন্দ্রনাথ, ২০ মে ১৯৩৪
১৯৩০ সালে বিশ্বভারতীতে যে পঠনপাঠন শুরু করেছিলেন সামারাকুন, ১৯৪০-এ তা সমাপ্ত করে দেশে ফেরেন। শোনা যায় এই সময় তিনি ‘নমো নমো মাতা’ (Namo Namo Mata) এই স্বদেশপ্রেমমূলক গানটি লিখেছিলেন এবং সুর দিয়েছিলেন। গানটি রেকর্ড করা হয়েছিল ১৯৪৬ সালে। শ্রীলঙ্কা স্বাধীনতা পেয়েছিল ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। ১৯৫০ সালে শ্রীলঙ্কায় একটি কমিটি তৈরি হয়। সামারাকুন সেই কমিটির কাছে ‘নমঃ নমঃ শ্রীলঙ্কা মাতা’ (Namo Namo Sri Lanka Mata) গানটি জমা দিয়েছিলেন। গানটির পংক্তির সংখ্যা ছিল ৪৪ এবং গাইতে সময় লাগত ৩৫ সেকেন্ড। ১৯৫২ সালে এই গানটিই নির্বাচিত হয়েছিল শ্রীলঙ্কার জাতীয় সংগীত হিসেবে। গানটি তামিল ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন এম নালাথাম্বি। পরে অবশ্য তামিল অনুবাদটি নিষিদ্ধ করা হয়। সামারাকুন মাহিন্দা কলেজে অধ্যাপনা করার সময় এই গানটি ওই কলেজের ছাত্রছাত্রীরা গেয়েছিলেন। পরে মিউসেস কলেজের ছাত্রছাত্রীরা গানটি এমনভাবে পরিবেশন করেছিলেন যে গানটি প্রবল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। এই গানটিই যে শ্রীলঙ্কার জাতীয় সংগীত হবে, এই নিয়ে সংশয় ছিল না কোনো। কিন্তু বিতর্কের মেঘ ঘনিয়ে এল কিছুদিন পরেই। এই গানটিকে ঘিরে দুই ধরনের বিতর্কের মেঘ জমাট বাঁধে। প্রথমটির মূলে ছিল কুসংস্কার আর দ্বিতীয় বিতর্কটির অন্তরালে ছিল সংশয়পূর্ণ রটনা। কোনো বিতর্কই সামারাকুনকে স্বস্তি দেয়নি। তাঁর মতো রবীন্দ্রবিশেষজ্ঞের কাছে এ ছিল চরম অপমান।
১৯৫৭ সালে গানটির প্রথম লাইনটিকে ঘিরে প্রথম বিতর্ক শুরু হয়। পংক্তিটি ছিল— ‘নমো নমো মাতা’। এই বাক্যের সঙ্গে শ্রীলঙ্কার প্রথম দুজন প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যুর সম্পর্ক ঠিক কোথায় বোধগম্য হয় না। কিন্তু শ্রীলঙ্কার মানুষের এক সিংহভাগের মনে হতে থাকে এই প্রথম বাক্যটি দুর্ভাগ্যের কারণ। এই বিতর্কের জের টেনে ১৯৬১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে গানটির প্রথম বাক্যটির পরিবর্তন করা হয়। ‘নমো নমো মাতা’-র পরিবর্তে লেখা হয় ‘শ্রীলঙ্কা মাতা, আপা শ্রীলঙ্কা নমো নমো নমো মাতা’। কিন্তু এই পরিবর্তনে মত ছিল না আনন্দ সামারাকুনের। তাঁর আপত্তি সত্ত্বেও শুধুমাত্র কুসংস্কারের বশে এই পরিবর্তন মেনে নিতে পারেননি। অনেকে মনে করেন এই কারণেই তাঁর আত্মহত্যা। এই আত্মহত্যা তাঁর প্রতিবাদও হতে পারে।
শ্রীলঙ্কার জাতীয় সংগীত
কিন্তু গানটিকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হল আবারও। ২০১৭ সালে ভারত-শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট (India-Sri Lanka Cricket) খেলার সময় দুই দেশের জাতীয় সংগীতের তুলনামূলক আলোচনায় বারবার উঠে এসেছে রবীন্দ্রনাথের নাম। অনেকের অনুমান গানটি আসলে রবীন্দ্রনাথেরই লেখা। কিন্তু এর পাশাপাশি আরেকটি মতও উঠে এসেছে। গানটির রচয়িতা সামাকুরান ছিলেন রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠ ছাত্র। তিনি নাকি রবীন্দ্রনাথকে অনুরোধ করেছিলেন তাঁর দেশের জন্য একটি গান লিখে দিতে। তখনই নাকি ‘নমো নমো মাতে’ গানটি লিখে দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। শিখিয়েও দিয়েছিলেন সামারাকুনকে। দেশে ফিরে এই গানটিই শ্রীলঙ্কার ভাষায় অনুবাদ করেন সামারাকুন। তবে এইসবই অনুমান। এই গানটির হদিশ রবীন্দ্রনাথের গানের কোনো সংগ্রহের মধ্যে পাওয়া যায় না। বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষের তরফ থেকেও কোনোরকম বাধা আসেনি। কাজেই শুধু অনুমানের উপর ভিত্তি করে শ্রীলঙ্কার জাতীয় সংগীত সম্পর্কে বিতর্ক তৈরি করা উচিত নয়। রবীন্দ্রনাথের প্রভাবে প্রভাবিত ছিলেন আনন্দ সামারাকুন। সেই কারণে তাঁর লেখায় রবীন্দ্রনাথের প্রভাব থাকা স্বাভাবিক।
একজন শিল্পীর মন বড়ো জটিল। ঠিক কোন অভিমানে সামারাকুন আত্মহত্যা করেন তা কেউ জানে না। শুধু সেই মৃত্যুকে ঘিরে তৈরি হয় অনেক প্রশ্ন, বিতর্ক এবং সংশয়। সামারাকুন এবং রবীন্দ্রনাথ দুজনেই সেই বিতর্কের পৃথিবী থেকে অনেক দূরে। শ্রীলঙ্কার জাতীয় সংগীতের অন্তরালে রবীন্দ্রনাথ রয়েছেন কিনা সেই সমস্যা অমীমাংসিতই রয়ে যায়।
সহায়ক প্রবন্ধঃ
শ্রীলঙ্কার জাতীয় সংগীতের রচয়িতা, ড মোহম্মদ আমীন
শ্রীলংকার জাতীয় সংগীতের রচয়িতা ও সুরকার কি আনন্দ সামারাকুন নন?, মুজিব মেহদী
