
তাহলে চল মাঞ্জা–লাটাই তোদের নিয়ে মেটে বুরুজ যাই
কেন এত সেকাল নিয়ে মাতামাতি ? কেন এত সেকাল সেকাল বলে হাপিত্যেশ করা? ও তো চলে গিয়েছে, তবু কেন এমন আজগুবি পিছুটানের গল্প তৈরি করতে বসা ? এর উত্তর বাঙালির জানা নেই। কিন্তু এটুকু বলতে পারা যায় ঘুড়ি সেই কবেই গোঁত্তা খেয়েছে কোনও বাড়ির চালে। কিন্তু আজ যে সহসাই চিলে কোঠার ঘর থেকে পাওয়া গেল একটা বাক্স। আর সেটার ভেতর থেকে বেরিয়ে পড়ল একটা কাঁচ মাঞ্জার পোড় খাওয়া সুতো-লাটাই। সঙ্গে আরও আছে। ঠাকুরদাদার লাপিজ লাজুলি নীল কাঁচের সেন্টের বোতল, বু্লুম অব রোজ, ফরগেট মি নট শিশি, অ্যান ইভিনিং ইন পারি, কাঁচের বিড়াল চোখ গুলি, ছোট্ট ক্যাপ বন্দুক আর সাথে আমার আদরমাখা তেরঙ্গা পতাকা আর পাট কাঠি। গোল বাঁধল সেখানেই।
তাহলে চল মাঞ্জা–লাটাই তোদের নিয়ে মেটে বুরুজ যাই। ওয়াজিদ আলি নবাবের জোড়া মাছের দরজা পার করে মেটে বুরুজেই যাই চল। ও পাড়ায় নবাবের পরিবার লতায় নাম আছে করিম মিয়াঁর ঠাকুর দাদার আব্বাজানের। চল লাটাই সেখানে যাই করিম মিয়াঁর পতঙ্গ মকানে। তার পর চাঁদিয়াল খরিদ করে আকাশে আর মেঘের মাথায় লুটোপুটি করে একবার একটু নামা ওঠা খাই ওই বাড়িটার বত্তিরিশ তলায়। ওই বত্তিরিশ তলা বাড়িটা কলকাতার যে জমিতে মাথা চারা দিচ্ছে সেটা আবার দ্বারভাঙ্গার রাজাদের এস্টেট। তার পর চল রে চাঁদিয়াল তোকে নিয়ে আকাশ জুড়ে রাজ করি। আর তখন তুই আমার ডানা মেলা দূরবীন হয়ে যা। আকাশ জুড়ে রাজ করতে করতে তোর যদি চোখে পড়ে কোথাও সিংহমামার মুখ থেকে জল পড়ছে তাহলে একটু জানান রাখিস বাপু। কিম্বা যদি দেখিস কোনও গাজির মাজারে টিপু সুলতানের নাতির নাতির পুতি – বুড়ো শাহজাহানের মতো চিরাগ চরাচ্ছে তাহলেও একটু খবর লাগাস আমায়। অথবা যদি দেখিস কোনও ডুবন্তও জাহাজ থেকে দুড়ুম করে ভেসে উঠেছে কোনও ডানা মেলা পরী তাহলেও কিন্তু খবর দিবি আমাকে।
শুনেছিলাম গঙ্গা পাড়ের ভাগ্যকুলের রাজাদের যে বাড়ি ছিল তার ছাঁদ সীমানায় নাকি একটা কামান বসানো ছিল। একদিন বিকেলে ছাদে হাওয়া খেতে খেতে সহসাই সে বাড়ির ছোটকর্তার চোখে পড়ল গঙ্গা দিয়ে পাল তুলে, পতাকা হাঁকিয়ে দুলে দুলে চলেছে এক পরী লাগানো জাহাজ সুন্দরী। আর তখনি ভাগ্যকুলের ছোটকর্তার মর্জি হল সেটাকে সলিল সমাধি দেওয়ার। দিলেনও তাই ছাঁদে বসানো কামানটা থেকে তোপ দেগে। ওটা ছোটবাবুর একটু মস্করা করা আর কী। জাহাজ তো ডুবলই সাথে ডুবল সেই জাহাজের আরেক সুন্দরী ‘নাইক অব সামোথ্রেস’। স্কটল্যান্ডের আবলুশ কাঠের শিল্পী কারিগররা বড় আদর করে বানিয়েছিল তাঁকে। শেষে কিনা এই হল! ওই কাঠের কারিগর বেচারিরা এখন ডিকয় বানিয়ে শিকারিদের বেচে বেড়ায়।
ঠাকুর জমিদারদের প্রজারপিনার খবরটা নেওয়া দরকার। বেলগাছিয়ার বাগান বাড়িতে দিব্যি ছিল। কিন্তু জাহাজি কারবার করতে গিয়ে শেষে পারলে পানের দোকান দিয়ে খায়। সেসব বাবুদের কারবার এমনই যে ঘরের লক্ষ্মী কানা চোখ দেখিয়ে পালিয়ে গেলে। তখন প্রজারপিনাকে পারলে প্রায় নিলামে তুলে দেয়। নিলামে গিয়ে পাথুরেঘাটার ঠাকুর-রা কোনও রকমে সেটাকে ঘরে তুলল। কিন্তু ভেবে দেখ চাঁদিয়াল, আমার কারবার কিন্তু ঠিক ওটিকে নিয়ে নয়। তাহলে কী নিয়ে? শুনলুম এসব মূর্তি বানানোর অনেক হ্যাপা। নগর জুড়ে খবর দেওয়া হত সুন্দরী সুন্দরী রমণীদের। তারপর কারও মুখ, কারও চোখ, কোনও রমণীর টসটসে ঠোঁটের গড়ন, কারও বা নাকের গঠন, কোনও রমণীর নাভির গভীরতা তো কারও স্তনযুগল এসব নিয়ে চলত বিস্তর লাইফ স্কেচ। তার পর সেই সব সুন্দরীদের অঙ্গের সৌন্দর্য জুড়ে জুড়ে বানানো হত এসব মূর্তি। শোনা যায় এভাবেই ভেনাস-ডি মিলো-কে তৈরি করার পর থেকেই শুরু হয়ে গেল এমন রীতি। প্রজারপিনাও সেই জাতের। পুরুষদের ব্যাপারেও ওই একই নিয়ম। ওই নিয়মে বানানো বেশ কিছু মূর্তি কলিকেতায় এসেছিল জাহাজে করে। চল চাঁদিয়াল সেসবের হদিশ করি।
আর একটা পারস্যের গালিচা আছে দু’পুলিয়ার রাজবাড়ির অবু বাবুর মতো। সেটাতে আবার শ্রীক্ষেত্রের পাণ্ডা ভূতেদের আশীর্বাদ আছে। ‘নমো নমো করিচি’ বললেই ওঁরা জেগে ওঠে। আর তাতে করে গালিচা আকাশে উড়তে পারে। তখন তোকে কষ্ট থেকে খানিকটা ছাড় দেব। কিন্তু দুজনে মিলে ওটাতে করে উড়ে উড়ে দেখব ভাঙা বাড়ির ছাঁদ, পঙ্খের নক্সা কাটা থাম, গ্যাস বাতির স্তম্ভ, বুড়ো বদল খাঁ সারেঙ্গি সাধছে, আর বাড়ির পাঁচিলে পরীর নক্সা।
আরে বল না ওসব বাড়ির সব বাবু কী আর বুলবুলি ওড়াতেন। তাঁদের মধ্যে অনেকে ছিলেন গুণীর রাজা। ওই যে ওই যে দ্যাখ না মল্লিক বাড়ির ছাদের পরীগুলো-র ডানা ভাঙা। কেন বলত চাঁদিয়াল?
শোন তবে বলি। আজও ও বাড়ির দেওয়ালে কান পাতলে শোনা যায় সেজোছেলের দীর্ঘ শ্বাস। ওই যে, সে শখ করে ইংলন্ড দেশে পড়তে গিয়েছিল স্থাপত্যকলা বিদ্যা। সে ছেলের প্রবল প্রতিভা। সাহেবদের আল্পস পর্বতের মতো কঠিন কঠিন পরীক্ষা ডিঙিয়ে মানপত্র পেল সে রানী মা-র কাছ থেকে। পেল সোনার মেডেল। রয়্যাল কলেজের ফার্স্ট কেলাস ফার্স্ট। রানী-র হুকুমে পাতা হল লাল কার্পেট। সাহেবগুলোর মুখও লাল হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে। ইংল্যান্ডে-র মহা রানী আদর করে তাঁকে নৈশ ভোজের টেবিলে জিগালেন এখানে সে কী দেখতে চায়। সে বলল মহারাণী-র উইন্ডসর। তথাস্তু।
ঘুরে ঘুরে সব দেখলে ফুল মল্লিক। তার পর লেখা পড়া শেষ করে জাহাজ চড়ে সটান কলকাতায়। ওর বুড়ো বাপ বেলু বাবু ছেলের জন্যে রওশন চৌকি দিলেন, ইংরেজি বাজনা দিলেন, গড সেভ দা কিং- কুইন বাজানোর আয়োজন করলেন, বাড়িতে হরির লুঠ দিলেন, বিকেলে সবাইকে খাওয়ালেন বর্ধমানের সরপুরিয়া। ছেলে ঘরে এল। এবার তার বাই হল নিজে একটা বাড়ি বানাবে। এমন ছেলে এই ফুল মল্লিক সে ওই যে উইন্ডসর দেখতে গিয়েছিল তখনই করেছিল এক কাণ্ড। সে উইন্ডসর দেখতে দেখতেই মনের মানচিত্রে রানীর প্রাসাদের হুবহু ছবি এঁকে রেখেছিল। এবার কলকাতায় এসে বানাতে লাগল ঠিক সেরকম একটা বাড়ি। বাড়ির অন্দর, বাহির, ছাদ, দালান কোঠা, থামের নক্সা, আর্কেড, হল ঘরের আইল, নেভ, সিলিং সব যায়গা থেকে বেড়িয়ে আসতে লাগলো উইন্ডসর-উইন্ডসর গন্ধ। লোকে ফুল মল্লিক কে বলতে লাগল কলকাতার বিশ্বকর্মা। তার পর বাড়ির ছাদ জুড়ে পাক্কা দুটি বছর ধরে পাঁচিলের কানায় কানায় বসল পরীর দল। তাঁরা এলেন বিলেত থেকেই। গ্রিসের প্যারস দ্বীপের পাথর কেটে তৈরি করা হয়েছে তাঁদের। আর তখনই এদেশের সাহেবদের ঘুম ভাঙল। কী, এত বড় স্পর্ধা ? বামুন হয়ে চাঁদে হাত। রানীমা -র প্রাসাদের নকল করা। নেটিব নেটিবের মতো থাকবে। সাহেবরা বারণ করলে। কিন্তু ফুল মল্লিক সে কথা শোনার পাত্র নয়।
অবশেষে কলকাতার আদালত থেকে শমন জারি হল। মামলা চলল দীর্ঘ দিন ধরে। মল্লিকের বুড়ো বাপ তত দিনে গঙ্গাজলী হয়েছেন। মা বিধবা হয়ে সেই কবেই গিয়েছেন কাশীধামে। খোঁজ রাখার মধ্যে দু-এক জন পাত্র-মিত্র আর নায়েব। লোক বেশি নেই সাথে। হাজার হোক রাজরোষে পড়েছেন ফুল মল্লিক। কিন্তু মামলা উঠলেই সম্বাদ চন্দ্রিকা জন্তরে ছেপে সমাচার প্রকাশ হয়। লোকে আদালতের সিঁড়িতে ভিড় করে। কেউ কালীঘাটে মল্লিকের নামে পাঁঠা মানত করে। আর ফুলের সুন্দরী বউটা আস্তে আস্তে হাড়গিলে হয়ে যায়। রোজের কাজ বলতে ঠাকুর দালানে মাথা ঠোকা আর চুল ছেঁড়া।
এরকম চলতে চলতেই একদিন বিকেলে মামলার রায় ঘোষণা হয়। দুশো ছেচল্লিশ পাতার রায়। পাতার পর পাতায় লেখা হল ফুল প্রশস্তি। ‘পৃথিবীর ইতিহাসে এত বড় স্থপতি আর দুটি নেই।’ লেখা হল ‘ঈশ্বরের দরবারেও এমন উজ্জ্বল স্থপতি আর একটিও নেই।’ রায়ের পাতায় লেখা হল ‘বাবু ফুল মল্লিক জীবন্ত কিংবদন্তী’। সাথে এমনও বলা হল ‘স্থাপত্যকলা শিল্পের যে ইতিহাস সিকন্দরের দেশে বা রোমকদের চর্চায় পৃথিবীকে আলো দেখিয়েছে সেই আলোক বর্তিকার একমাত্র বাহক এই ফুল মল্লিক’। এসব শুনে লোকে যখন বিচারক-কে ধন্য ধন্য করছেন তখনই সহসা বিচারপতির মুখের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। তিনি বললেন এবার জাজমেন্ট। আবহাওয়া থম থমে হয়ে গেল। দুশো ছেচল্লিশ পাতার শেষ স্তবক পর্যন্ত যেখানে এতো প্রশংসার বন্যা সেখানে অর্ডার মানে তো ফুলবাবুর জয়।
কিন্তু না! এবার যে আদেশ তাঁরা শুনলেন তার জন্যে তাঁরা নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারলেন না। আদেশ নামায় বলা হল –
‘সব কিছু বিচার করে ও মাননীয় জুরিদের মতামত বিশ্লেষণ করে আদালত এই নির্দেশ দিচ্ছে যে বাবু ফুল মল্লিকের বাড়ির ছাদে যে ষোলটা মনোরম পরী পাঁচিলের কোণে কোণে শোভা বর্ধন করছে সেগুলির প্রত্যেকটির একটি করে ডানা কেটে দেওয়া হোক’।
পরদিন কলকাতা তোলপাড়। সমাচার, প্রভাকর বিলি হচ্ছে রাস্তার মোড়ে মোড়ে। লোকে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে বিচারকের আদেশ নামার এ মাথা ও মাথা। আর ঠিক তখন ফুল মল্লিক বাড়ির ভেতরের একটা ঘরের দরজা বন্ধ। অনেক ডাকাডাকির পর বুড়ো নায়েব কুলি কামিন ডেকে দরজা ভাঙলেন। ভেতরে ঢুকে দেখা গেল আরাম কেদারায় চির-নিদ্রায় বাবু ফুল মল্লিক। পাশে ঢাকনা খোলা রুপোর কাজ করা জহরের কৌটো। আর বুকের কাছে পরম যত্নে ধরে রেখেছেন মহা রানীর মানপত্র।
চল গালিচা এই কলকাতাটারে ঘুরে ঘুরে একটু বঙ্গ দর্শন করি।
