
‘কী পার্থ কী সুদীপ্ত তাঁদের মতের সঙ্গে আমাদের মিল আংশিক’
সাংবাদিক সুদীপ্ত সেনগুপ্ত ও শিল্পী পার্থ দাশগুপ্ত গুণী মানুষ। পরিচয়ের সূত্রে জানি, দুজনেই স্পষ্ট ও অপ্রিয় সত্য বলতে ভালোবাসেন। স্বাভাবিক ভাবেই সুদীপ্ত তাঁর চিরাচরিত ভঙ্গিতে আক্রমণ শানান। সমস্যা হল তাঁর শাণিত আক্রমণে মুড়ি ও মুড়কি উভয়েরই প্রাণসংশয় ঘটে। এভাবেই তিনি সাব্যস্ত করেন সামগ্রিক ভাবে পুজোকেন্দ্রিক সব শৈল্পিক প্রচেষ্টাই 'ঝুলন শিল্প'। এ নেহাতই চরম সাধারণীকরণ বলেই মনে হয়। অপ্রিয় সত্য বলার এক সমস্যা হল, স্থান-কাল-পাত্র ভেদে তা অপ্রিয় হয় বটে কিন্তু সর্বদা অমোঘ সত্য হয়ে ওঠে না। একশো কিংবা হাজার স্কোয়ার ফুট পরিসরের স্থাপনাশিল্পের সঙ্গে কলকাতার ভিক্টোরিয়া কিংবা রোমের সিস্টিন চ্যাপেল-এর তুলনামূলক আলোচনা অপ্রিয় বটে সত্যনিষ্ঠ নয়।
পার্থ এ-কথা বলার যোগ্য মানুষ। সে পথে না হেঁটে তিনি শিল্পের অপমানের শোধ তুলতে সংবাদমাধ্যমকে টেনে নামালেন। তাও সাধারণীকরণ। যা এই সাংবাদিকের কাছে অবিসংবাদী মনে হয়নি। একসময় এই উৎসব বললে উৎসব, ঝুলন বললে ঝুলনে নীরদ মজুমদার, বিকাশ ভট্টাচার্য, পরিতোষ সেনদের মতো চিত্রশিল্পী বা মীরা মুখোপাধ্যায়, উমা সিদ্ধান্তের মতো ভাস্করদের ডাক পড়েছিল দুর্গার মূর্তি গড়ার জন্য। প্রথিতযশা শিল্পীরা কিন্তু গণশিল্পে যোগ দিলেন। সময়টা আশির দশক, মচ্ছবের ফোয়ারা ছোটানো, নবযুবক দাপিত বারোয়ারি পুজোর বিপরীতে – যাদের উত্তরসূরি নবো মুন্সি, ছিঁড়ি বেনে, ছুঁচো শীল- তখন এক অন্য পুজোর বোধনের কাল। সেই সময় 'শারদ সম্মান'-এর বিজ্ঞাপনে লেখা হত, 'শুদ্ধ শুচি ও সুস্থ রুচি'। পার্থ সে পথে হাঁটলেন না। ফলত, কী পার্থ কী সুদীপ্ত তাঁদের মতের সঙ্গে আমাদের মিল আংশিক। আপাতত, আমরা আমাদের কথা বলি। শুরু করি, অবন ঠাকুরের উদ্ধৃতি দিয়ে।
"পুঁথিকার দেবতা – সমস্তের ধ্যান দিলে শিল্পে, সেই ধ্যান মতো গড়ে চলল- এই ঘটাই যদি পুরোপুরি ঘটত তবে আমাদের আর্ট কেবলমাত্র ধ্যানমালার ইলাস্ট্রেশন হয়ে যেত কিন্তু এর চেয়ে বড় জিনিস হয়ে উঠল বুদ্ধ, নটরাজ প্রভৃতি নানা দেবমূর্তি সেটা ধ্যানমালার লিখিত ধ্যানের অতিরিক্ত শুধু শিল্পের শিল্পক্রিয়া তাদের অমরত্ব দিল বলে এবং শুধু সেইটুকুর জন্য আর্ট জগতে এই সব দেবতার স্থান হল।"
আরও পড়ুন
পুজোশিল্প – পার্থ দাশগুপ্ত
বলার যে কথা আমাদের তা হল, কলকাতার পুজো এক প্রধান চরিত্র তার আমূল বদল। কুমোরটুলি ও ডেকরেটর সংস্কৃতি ভেঙে তৈরি হয়েছে নয়া ঘরানা। বাঁশ-বাটাম-নারকেল দড়ি-কাপড়ে কুচির কাজ আর ঝাড় লণ্ঠনের যুগ পেরিয়ে আসার চেষ্টা গত অন্তত আড়াই-যুগ ধরে চলছে। চলছে, শিল্পীদের ভাষায় যা হল, মিথষ্ক্রিয়-স্থান নির্দিষ্ট-স্থাপনাশিল্প। পরিভাষায় ইন্টারাআকটিভ-সাইট স্পেসিফিক-ইনস্টলেশন আর্ট। ইতালির মিলানবাসী বাঙালি শিল্পী সফিকুল কবির চন্দনের ভাষায়, এ হল স্থাপনাশিল্পের গণতন্ত্রিকরণ। সর্বজনীন ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নন্দনতত্ত্ব। আর একটু ব্যাখ্যা করে বোঝাতে ইতিহাসবেত্তা ও শিল্প-ঐতিহাসিক তপতী গুহ ঠাকুরতার স্মরণ নিতে পারি। এক সাক্ষাৎকারে তিনি এই কলমচিকে বলেছিলেন, 'নিজস্ব অধিকারেই এ হল পাবলিক আর্ট। খোলা আকাশের নীচে একটি অনুপম কর্মকাণ্ড। শিল্পী সমাজ, শিল্পের সঙ্গে সাধারণ সমাজের একটা ভাবের আদান-প্রদান ঘটে চলেছে। পুজোর আঙিনায়। তাঁরা কেউ শিল্পদীক্ষিত, কেউ-বা সীমিত শিক্ষার অধিকারী, কারও এখনও তেমন করে চোখ ফোটেনি। তবু, এই জানা-না-জানা প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াচ্ছে না উপভোগের আদান-প্রদানের।'
তবে কী এই যে শত-শত পুজো প্রাঙ্গনে আর্ট-আর্ট রব উঠল, তার সবই কি যোগ্য শিল্প হয়ে উঠল? না নিশ্চয়। শিব গড়তে গিয়ে আমরাতো বাঁদরও গড়ি। তা বলে গড়ে তোলার প্রচেষ্টাকে সজোরে নস্যাৎ করে দিতে পারি না। তবে, তা হবে কালাপাহাড়ি কাণ্ড। এই পুজো-স্থান, পাড়ার নির্দিষ্ট স্থানটি সে গলি হোক কিংবা পার্ক। চার পাশের বাড়ি-ঘরের মাঝে একটুকরো মাঠ হোক – সেই স্থানটুকু আসলে শিল্পীর কাছে হল একটা সাদা ক্যানভাস। ভবতোষ সুতার এমনই জানিয়েছিলেন এক পুজো-সন্ধ্যায়। যেখানে শিল্পের স্বাক্ষর, শিল্পীর স্বাক্ষর ফুটে ওঠে।
এই পুজোতেই তো কলকাতার আম-নাগরিক দেখল আমেরিকার স্ট্রিট আর্ট শিল্পী ট্রেসি লি স্টাম-কে। তিনি ত্রিমাত্রিক ছবি আঁকেন শহরের রাস্তায়। যা বিভ্রম ছড়ায়। পার্থ দাশগুপ্ত, দীপ্তিশ ঘোষ দস্তিদার ও শান্তনু মিত্ররা মিলে সেই ত্রিমাত্রিক ছবিতে সাজালেন পুজো মণ্ডপ। দীপ্তেশের ত্রিমাত্রিক কিন্তু ভার্টিকাল ছবি দিয়ে তৈরি হল সিলিং। সে ছবি চতুর্থমাত্রা বয়ে আনল। দর্শক ঘাড় উঁচু করেই দেখল, তার পরিচিত শহর যেন সশরীরে আকাশযাত্রী হয়ে উঠেছে। বিগত দু-আড়াই দশকের ইতিহাস থেকে এমন অজস্র উদাহরণ উঠে আসতে পারে। ইতোমধ্যে এ-বিষয়ে গবেষণালবদ্ধ গ্রন্থ রচিত হয়েছে। আর মাটির ভাঁড়ের কিংবা কাঁচের চুরির দেবীমূর্তি শিল্প না কারিগরি তা নিয়ে বিতর্ক চলতেই পারে, কিন্তু মণ্ডপে-মণ্ডপে,বছরের পর বছর পট-গালার কাজ, মাটির পুতুল, বস্তারের ডোকরা থেকে মধুবনী, মাদুর-শীতল পাটি-টেরাকোটা-তাঁত-বাঁশের কাজের প্রদর্শনী যখন নাগরিক পল্লির আঙ্গিনায় উদ্ভাসিত হয়, তখন তা এক সুদূরপ্রসারী অভিঘাত সৃষ্টি করে। রুচির বদল ঘটে, ভিন্ন রুচির সৃষ্টি হয়। আজ মধ্যবিত্তের গৃ্হসজ্জাতে তার পরিচয় পাচ্ছি, ক্যালেন্ডার-আর্টের বিপরীতে। যা ছিল কতিপয় শিক্ষিত মানুষের অর্জিত চর্চা, তা একটি মাত্রায় বহু মানুষের চর্চার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই-বা কম কথা কী?
