বাংলার লোকসংস্কৃতি সংরক্ষণ: মহতী উদ্যোগ জার্মান উপদূতাবাসের

ভার্চুয়াল জাদুঘরের পরিকল্পনাও রয়েছে বলে জানা গিয়েছে

গোমিরা নৃত্য : ছবি – নীলাঞ্জন রায় (বঙ্গদর্শন আর্কাইভ)

রৎচন্দ্রের ছিনাথ বহুরূপীকে মনে পড়ে? তারাশঙ্করের ‘রসকলি’র বহুরূপী মতিলাল কিংবা বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর ‘বাঘবাহাদুর’ সিনেমায় বহুরূপী ঘুনারামকে? স্মৃতিপটের ধুলো মুছলে এমন অনেক কিছুই আমাদের মনে পড়বে বৈকি!

আবার চৈত্র সংক্রান্তির দিনে গাজনের উৎসবে জেলেপাড়ার সঙ মাতিয়ে রাখত এই শহরবাসীকে। এমন উল্লেখ করেছেন খোদ হুতোম। রূপচাঁদ পক্ষী, দাদাঠাকুর, অমৃতলাল বসু, সজনীকান্ত দাস প্রমুখেরাও জেলেপাড়া সঙের জন্য ছড়া, গান ও পালা লিখতেন। এসব কখনও ছাপা হত না। কেবল লোকের মুখে মুখেই ঘোরাফেরা করত। তারপর কেটে গিয়েছে অনেক কাল। জেলেপাড়ার সঙ এখন পুরোপুরি মুছে গেছে শহরের বুক থেকে। গ্রামের বুকে বহুরূপীদের দেখা মিললেও তাঁদের আর্থিক অবস্থা করুণা উদ্রেক করে। কালের গ্রাসে বাংলার এমন কত শিল্পই না হারিয়ে গিয়েছে।

বাংলার লুপ্তপ্রায় লোকসংস্কৃতি সংরক্ষণের আগ্রহ দেখিয়েছে জার্মানির বিদেশ মন্ত্রক। তাদের অর্থনৈতিক সাহায্যে প্রায় হারিয়ে যাওয়া বাংলার লোকজ উপাদানে সমৃদ্ধ হবে ভার্চুয়াল মিউজিয়াম।

বিষ্ণুপুরের মল্ল রাজাদের হাতে শুরু হয়েছিল রাবণকাটা নাচ। একসময় রাজাদের আনুকূল্যে ধুমধাম করে এই লোকশিল্পের উদযাপন চলতো। এরকম করে একে একে হারাতে চলেছি বাংলার সাপুড়িয়ার গান, হাপু গান, চাঙ গান, পাতা ঝুমুর, কুড়মালি নাচনির মতো লোকসংস্কৃতি। বাস্তবিকই এমনই একটা সাংস্কৃতিক উদ্বেগের মধ্যে রয়েছি আমরা। গবেষকরা মনে করছেন, সারা পৃথিবী জুড়েই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সঙ্কটে রয়েছে।

প্রাকৃতিক বিপর্যয়, জলবায়ু পরিবর্তন বা পরিবেশগত পার্থক্যকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য লোপাটের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হয়। দীর্ঘদিনের লোকসংস্কৃতি গবেষক শিবব্রত কর্মকার বঙ্গদর্শন.কম-কে বলেন, “বাংলার সংস্কৃতি হারিয়ে যাওয়ার পিছনে মূলস্রোতের মিডিয়ার কম দায় নেই। নিজস্বতার জায়গা থেকে লোকসংষ্কৃতিকে মিডিয়াই সরিয়ে আনছে। পাশাপাশি লোকসংস্কৃতির প্রচার এবং প্রসার ঠিকভাবে করা হয়নি।”

জার্মান কনসাল জেনারেল মানফ্রেড আউস্টার

এরকম অবস্থায় বাংলার লোকসংস্কৃতির হৃতগৌরব পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলার লুপ্তপ্রায় লোকসংস্কৃতি সংরক্ষণের আগ্রহ দেখিয়েছে জার্মানির বিদেশ মন্ত্রক। তাদের অর্থনৈতিক সাহায্যে প্রায় হারিয়ে যাওয়া বাংলার লোকজ উপাদানে সমৃদ্ধ হবে ভার্চুয়াল মিউজিয়াম। এই লক্ষ্যে গত ১৩ মার্চ কলকাতার মধুসূদন মঞ্চে জার্মান উপদূতাবাসের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে সামঝোতাপত্র স্বাক্ষরিত হয়েছে। ছিলেন জার্মান কনসাল জেনারেল মানফ্রেড আউস্টার।

গত ১৩ মার্চ কলকাতার মধুসূদন মঞ্চে জার্মান উপদূতাবাসের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে সামঝোতাপত্র স্বাক্ষরিত হয়েছে। ছিলেন জার্মান কনসাল জেনারেল মানফ্রেড আউস্টার।

অখণ্ড বাংলার লোকসংস্কৃতির নানা উপাদান ছড়িয়ে আছে গ্রামে গ্রামে, জেলায় জেলায়। কালীপ্রসন্ন সিংহ থেকে হাছন রাজা, তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণ, শরৎচন্দ্র, অদ্বৈত মল্লবর্মন-সহ বহু কথাসাহিত্যিকদের রচনায় যে সমস্ত নাচ, গান, বয়ন, চিত্রণ, কথকতা-সহ বিভিন্ন আঙ্গিকের উল্লেখ রয়েছে, তা আজকের মানুষের কাছে অধরা, অজ্ঞাত। বাংলার ব্রতকথা থেকে বিয়ের গান, মাঝি মাল্লার গান, দোতারার বিশুদ্ধ সুর থেকে চাঙ গানের হাত ধরে যুগের পর যুগ ধরে শিকড়ের সন্ধান করে গিয়েছে বাংলার মানুষ।

গত ১৩ মার্চের অনুষ্ঠান

এবার পল্লিবাংলার সেই শিল্প ও ঐতিহ্যের ধারাকে সংরক্ষণ ও বিশ্ব জুড়ে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন শিবব্রতবাবু। ১৩ মার্চের অনুষ্ঠানে তিনি ছিলেন সঞ্চালক। বঙ্গদর্শন.কম-কে বলেন, “জার্মান সরকারের এই চেষ্টা উৎসাহজনক উদ্যোগ তো বটেই। ভ্রমরা নামে একটি সংগঠনের মাধ্যমে আমরা ৬২ বছর ধরে লোকগান সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছি সম্পূর্ণ নিজেদের সামর্থ্যে। এতেই দেখেছি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সমস্যা বড়ো বাধা।”

জার্মান উপদূতাবাসের আর্থিক সাহায্যে ঝুমুর, রাবণকাটা নাচ, বহুরূপী, সাপুড়িয়া গানের মতো লোকসংস্কৃতির উপাদানকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দেওয়ার প্রকল্প বাস্তবায়িত করবে কলকাতার স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা সুকৃতি ফাউন্ডেশন। শিবব্রতবাবু বলেন, “১০-১২ বছর আগে সুকৃতির অভিজিৎ দাশগুপ্তকে একটি তালিকা দিই। লোকসংস্কৃতির যে ধারা বিলীন হয়ে যাচ্ছে, তালিকায় তার উল্লেখ ছিল। এগুলি ইতিহাস হিসেবে বাঁচিয়ে রাখা প্রয়োজন। অবশেষে জার্মান সরকারের সহযোগিতায় কাজটি হতে চলেছে।”

জার্মান উপদূতাবাসের আর্থিক সাহায্যে ঝুমুর, রাবণকাটা নাচ, বহুরূপী, সাপুড়িয়া গানের মতো লোকসংস্কৃতির উপাদানকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দেওয়ার প্রকল্প বাস্তবায়িত করবে কলকাতার স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা সুকৃতি ফাউন্ডেশন।

‘কলকাতা সুকৃতি ফাউন্ডেশন’-এর প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দাশগুপ্ত বঙ্গদর্শন.কম-কে বলেন, “আমি ৫০ বছর ধরে এই নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। সে জন্য কিছু আন্তর্জাতিক পুরস্কারও পেয়েছি। আমরা একটা ভার্চুয়াল মিউজিয়াম করতে চেয়েছিলাম, যেখানে বাংলার লুপ্তপ্রায় সংস্কৃতি ধরে রাখা হবে। কয়েকজন লোকশিল্পী আছেন, যাঁদের গান জনপ্রিয়। অথচ বলিউডে বিন্দুমাত্র সাম্মানিক, স্বীকৃতি না দিয়ে তাঁদের গান ব্যবহার হচ্ছে। এদের গানকেও আমরা ভার্চুয়াল মিউজিয়ামে তুলে ধরব, যাতে সারা পৃথিবীর মানুষ জানতে পারেন।”

বহুরূপী : ছবি – বিজয় চৌধুরী (বঙ্গদর্শন আর্কাইভ)

গত বছর বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে নির্বাচিত হয় সুকৃতি ফাউন্ডেশন। তাই এই বছর তারা জার্মানির সরকারি অনুদান পাচ্ছে। এর সাহায্যে ভার্চুয়াল জাদুঘরের পরিকল্পনা রূপায়িত করা যাবে বলে জানিয়েছেন অভিজিৎবাবু। মিউজিয়ামে লোকশিল্প ও শিল্পীর কথা তুলে ধরা হবে বাংলা, ইংরেজি ও জার্মান ভাষায়। এই প্রসঙ্গে অভিজিৎবাবু বলেন, “লোকসংস্কৃতির ৬২ ধরনের উপাদান শনাক্ত করা হয়েছে। ২৫-৩০টি কমপক্ষে এই মিউজিয়ামে জায়গা পাবে বলে আশা রাখি। বিশ্বের সব প্রান্ত থেকে এই মিউজিয়াম দেখতে পাওয়া যাবে, শোনার পাশাপাশি তার সম্পর্কে জানাও যাবে।”

গত বছর বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে নির্বাচিত হয় সুকৃতি ফাউন্ডেশন। তাই এই বছর তারা জার্মানির সরকারি অনুদান পাচ্ছে। এর সাহায্যে ভার্চুয়াল জাদুঘরের পরিকল্পনা রূপায়িত করা যাবে বলে জানিয়েছেন অভিজিৎবাবু।

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আরণ্যক’ উপন্যাসে কিশোর ধাতুরিয়ার কথা মনে পড়ে? ‘ননী চোর নাটুয়া’ নেচে এই কিশোর লোকশিল্পী মন জয় করেছিল লেখকের। ধাতুরিয়া বলেছিল, “একবার কলকাতায় কেন নিয়ে চলুন না? ওখানে নাচের আদর আছে।” তারপর নাটুয়া বালক ধাতুরিয়ার মৃতদেহ পাওয়া যায় রেললাইনে।

লোকশিল্পীদের মর্মান্তিক এই অবস্থা যেন আর না হয়। সাম্মানিক আর স্বীকৃতির প্রকৃত প্রাপক যেন তাঁরা হয়ে ওঠেন। সেই লক্ষ্যে কাজ এগোচ্ছেও। আশা করা যায়, এরকম আরও উদ্যোগ নেওয়া হবে অদূর ভবিষ্যতে।

Post Tags
Developed by DXDasia