রামচন্দ্রের বঙ্গবিজয়

রাম তুমি কার? আমার? না, বিজেপি-র, না তৃণমূল কংগ্রেসের?

বছর দুই আগেও এই নিয়ে ভাবতে হয়নি, এ-বছর ভাবতেই হচ্ছে। রামনবমী-র উচ্ছ্বাস-উল্লাস দেখে, শাসক আর বিজেপি সমর্থকদের নাচন-কোঁদন দেখে না ভেবে উপায় নেই। যা ঘটেছে তা এককথায় অশ্রুতপূর্ব! কোথাও হিন্দু-মুসলমান এই দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মাঝে উপস্থিত হয়েছে অবিশ্বাস, সংশয়, অভিমান। দাঙ্গা না বাঁধলেও একরকম উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশ তো তৈরি হয়েছেই। প্রাণ গেছে। কোথাও অস্ত্র নিয়ে মিছিলে শিশুরা হেঁটেছে, কোথাও কেউ লাঠিখেলায় মেতেছেন তো কেউ বেরিয়েছেন তলোয়ার নিয়ে, কাউকে দেখা গেছে ত্রিশূল হাতে, কেউ নেমেছেন গদা হাতে, কেউ জয় শ্রীরাম বা ভারতমাতা কী জয় ধ্বনিতে মেদিনী কাঁপাতে কাঁপাতে এগিয়েছেন। পরিবর্তনের পর পরিবর্তন, আরও পরিবর্তন, আরও আরও…। পরিবর্তন তো এই রাজ্যের মানুষ চেয়েছিল, কিন্তু কে চেয়েছিল এমন পরিবর্তন?

মানুষ চেয়েছিল বাম-অপশাসনের অবসান। চেয়েছিল গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা। প্রথম ইচ্ছা পূরণে মানুষের হাতে অস্ত্র ছিল, সে অস্ত্রের নাম ব্যালট; বুট-বুলেটের আস্ফালনেও সে অস্ত্র কেড়ে নিতে পারেনি সেদিনের শাসক। শাসক বদলাল, মানুষকে স্বস্তি দিয়ে বদলাল উন্নয়নের ধরনধারণ। কিন্তু গণতন্ত্র? কোথায় মানুষের স্বপ্নের সেই বহুস্বর গণতন্ত্র? এরমধ্যে কেন্দ্রেও সরকার তথা শাসক বদলেছে।

আমরা হিন্দু মহাসভা দেখেছি, জনসংঘ দেখেছি, জনতা দল দেখেছি, দেখেছি বিজেপি শাসন। কিন্তু মোদীর শাসন? এই রাজ্যে আগেও কিছু আর এস এস-এর শাখা ছিল বটে, কিন্তু শাখায় বসে কুচক্রীরা অস্ত্র শানাচ্ছে এমন তো শুনিনি। তখন মাথায় তাদের এমন ভ্রাতৃঘাতী শাসক ছিল না বলেই কি? এই রাজ্যের শাখায় শাখায় এমন ভ্রাতৃঘাতী মুখ, এমন ‘পরম্পরা’ ছিল না তো! ফ্রিজ খুলে মাংস পরীক্ষার পরম্পরাই বা কোনকালে ছিল?

মানছি – রামনবমীর পরম্পরা ছিল, অস্ত্র নিয়ে নাচানাচি একেবারে ছিল না এমনও নয়। তবে, সে সব ছিল নিছক খেলা বা মজা। কাঠিতে বা কঞ্চিতে সিগারেটের খালি প্যাকেট গুঁজে গুঁজে, তা রাংতা দিয়ে মুড়ে তলোয়ার বানানো দেখেছি, শুনিনি তা নিয়ে ‘আমরা’–‘ওরা’ ভাগের কথা বা হিন্দু-ভারত গঠনের দাবিতে উন্মত্ত উল্লাসধ্বনি। মহরমের দিন মিছিল বেরোয়, কিন্তু সে তো কর্তৃত্ব জাহির করতে নয়; কারও ধর্মবিশ্বাসে আঘাত হানতে নয়; সে তো এক শোকলাঞ্ছিত ঘটনা স্মরণে।

যাত্রায় দেখেছি রাম-রাবণের যুদ্ধ, ক্যালেন্ডারে দেখেছি রাজা রবি বর্মার আঁকা ছবির কপি, শুনেছি কৃত্তিবাসী রামায়ণকথা – কিন্তু ও মুসলমান বা, ও দলিত, তাই ওকে মারো, জাতপাতের নামে সন্ত্রাস বা ভীমের নামে জয়ধ্বনি এসব শুনিনি। আনাচেকানাচে হয়তো ছিল, কিন্তু সন্ত্রাস-সংঘাতের ‘পরম্পরা’ নিশ্চয় ছিল না। শোকে বা সন্ত্রাসে রাম বা ভীম বা রহমান ছায়া ফেলেননি; তাঁদের সাথে আলাপ হয়েছিল রূপকথায়। জীবনে আর যাত্রা নেই, রূপকথা নেই, বনলতা সেন নেই – মুখোমুখি বসে আছে এক রাক্ষুসে আতঙ্ক।

এমনটা হল কার ভুলে? কার বা কাদের মদতে? একবার করসেবকরা এসেছিলেন বটে; মাথায় ইট নিয়ে, রামমন্দির বানানোর সংকল্প নিয়ে তাঁরা পথে নেমেছিলেন। তাদের সাথে রাজ্যের কিছু মানুষ যোগও দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁরা এই রাজ্যের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাঁধন ছিঁড়তে পারেননি। তাতে কী, মানতেই হবে যে তাঁদের প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছিল। কৌশল! যারা কৌশল করেছিল, যারা প্রশ্রয় দিয়েছিল তারা আজ কোথায়? প্রশ্রয় দেননি লালুপ্রসাদ। তিনি জেলের আড়ালে থাকলেও আজও তিনি বিহার ও জাতীয় রাজনীতির ময়দানে গুরুত্বপূর্ণ।

বামজমানায় আরও সর্বনাশা যে কর্মযজ্ঞ দেখেছি তা হল বিরোধী শক্তি নিকেশ করা। একদা, মেদিনীপুর জেলায় সি পি আই দলের প্রভাব ছিল সি পি এম-এর তুলনায় অনেক অনেক বেশি। ক্ষমতায় এসে সি পি এম বিরোধী রাজনীতিকে এক ইঞ্চি জমি ছাড়ব না এমন নীতিতে প্রাণ দিল আর প্রাণ কাড়ল বহুস্বর গণতন্ত্রের। রামসীতা সম্পর্কিত বেশ কিছু উপকথা সারা ভারতীয় উপমহাদেশের সর্বত্র – পাহাড়ে, জঙ্গলে, জনপদে ছড়িয়ে আছে। কোথাও শোনা যায় সীতার গায়ে হলুদের গল্প, কোথাও বনবাসের কথা। সে গল্পগুলি তেমন ছড়াতে পারেনি বটে এই বাংলায়, কিন্তু রামপুর বা রামরাজাতলা বা তেমন নামের অভাব নেই।  কিছু প্রভাব খুঁজলে হয়তো মেলে। তবে একটু পরিশ্রম করতে হবে এই যা। এমনটা অন্তত উত্তর ভারতের মানুষ ভাবতেই পারে না। বাংলায় হনুমানজিও তেমন কলকে পাননি। সমাজ জীবনে না, ধর্মীয় আচারে না, সাহিত্যে না, শিশু ভোলানো ছড়াতে না। তা বলে অশ্রদ্ধাও করা হয়নি।  ছোটবেলায় ভূতের ভয়ে কাতর হয়ে কে না আউড়েছে ‘ভূত আমার পুত, পেত্নী আমার ঝি…’। তবে ঐটুকুই।

এখন লাঠির জবাবে লাঠি, খুনের বদলে খুন! বাংলার মানুষ সে হিংসা মানবে?

ওদের রাজনীতি ঠেকাতে বাম রাজনীতি, জাতীয় কংগ্রেসের ধর্মনিরপেক্ষতা কোথায়? বিজেপিকে ঠেকাতে ময়দানে কার্যত আর কেউ নেই। দায়িত্ব নিতে কেউ এগোচ্ছে না। দায়ও সবই শাসকের।

ভুলব কী যে, মানুষ যা চায় তাই হবে, হবার যেটা সেটাই হবে। যারা প্রতি পেটে ভাত যোগাতে পারেনি, প্রতি হাতে কাজ জোটাতে পারেনি তাদের পাশে কেন দাঁড়াবে মানুষ?

কিছু নেতা, কিছু নেতৃস্থানীয় কর্মী হয়তো ভাবছেন তাঁরা ছাতা বদলে বেঁচে যাবেন – ভাবছেন না বারবার মানুষকে বোকা বানানো যাবে না। রামের বঙ্গবিজয় সম্ভব হোক বা না হোক, রামরাজত্ব আসুক বা না আসুক এই রাজ্যের মানুষ কৌশলের রাজনীতি, হিংসার রাজনীতি বরদাস্ত করবে না।

Developed by DXDasia