ধর্মের কাছে জাত-সমীক্ষা অবহেলিত কর্ণাটকে

ধর্মকে ব্যবহার করে ফায়দা তোলা অনেক সহজ।

এই দেশে সব কিছুই ভোটের নিরিখে ভাবা হয়, এবং তার জন্য নেতারা যা দরকার সব করতে পারেন। এই সত্য আবার প্রমাণিত হল কর্ণাটকে। ভোট এসেছে ওই রাজ্যে। এদিকে, গত পঁয়ত্রিশ বছরে সেখানে কোনও দল দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফেরেনি। অথচ কংগ্রেসের এখন যা দুর্দিন, তাতে ওই রাজ্য ফের ক্ষমতা দখল করা দলের জন্য ভয়ঙ্করভাবে জরুরি। না হলে একদা একচ্ছত্র দলটির হাতে থেকে যাবে মাত্র দুটি রাজ্য। পাঞ্জাব আর মিজোরাম। ২০১৪–র লোকসভা ভোটে প্রাপ্তি ছিল মাত্র ৪৪ আসন, যদিও পরের দিকে উপনির্বাচনে জিতে সংখ্যাটা সামান্য বাড়াতে পেরেছে তারা। এখন কর্ণাটকেও হেরে গেলে রাহুল গান্ধীর দলের দুর্দশা আরও বাড়বে। তারপর ডিসেম্বরে যদি বা রাজস্থানে দল জেতে, তাতেও আর পরিস্থিতির বিরাট কোনও হেরফের হবে না। কাজেই কর্ণাটকে জিততেই হবে।

এই যে জেতার তাগিদ তার জন্য রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধারামাইয়া বেছে নিলেন শর্টকাট। আটশো বছরের বেশি সময় ধরে হিন্দু শৈবদের একটি শাখা হিসাবে স্বীকৃত লিঙ্গায়েতদের পৃথক ধর্ম বলে ঘোষণা করল কর্ণাটক সরকার। সেইসঙ্গেই আর একটি পৃথক ধর্মের মর্যাদা পেলেন বীরশৈবরা, যাঁরা হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে হিন্দু ছিলেন। এখন দেশের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান যখন সরকারকে এই ক্ষমতা দিয়ে রেখেছে, তখন কেনই বা মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধারামাইয়া তার ব্যবহার করবেন না?এটাই তো এখন দস্তুর। আর এটাও তো ঘটনা যে ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান সংখ্যালঘুদের অনেক বাড়তি সুবিধা দিয়ে রেখেছে, যা হিন্দু হলে পাওয়া যায় না। সেই সুবিধাগুলো পেতে লিঙ্গায়েতরা চেয়েছিলেন পৃথক হতে। সেই লিঙ্গায়েতরা যাঁদের বিরাট গরিষ্ঠ অংশ বিজেপি–র সমর্থক। পাশা উল্টোতে সিদ্ধারামাইয়া অস্ত্র করলেন ধর্মকে।

আশ্চর্যের কথা হল, লিঙ্গায়েত–বীরশৈবদের পৃথক ধর্ম বলে ঘোষণা করতে যে অসাধারণ তৎপরতা দেখাল রাজ্যের কংগ্রেস সরকার, তার কণামাত্র দেখা গেল না রাজ্যজুড়ে জাতপাত নিয়ে সমীক্ষার ফল প্রকাশ করার ক্ষেত্রে। অথচ এই কাজের জন্য ইতিমধ্যেই কোষাগারের ১৭০ কোটি টাকা খরচা হয়েছে। এত টাকা খরচের পর কেন সমীক্ষার ফল বেরোচ্ছে না? সমীক্ষার বিষয়ে ওয়াকিবহাল ব্যক্তিরা বলছেন, সমীক্ষার ফল বেরোলে রাজ্যের জাতভিত্তিক রাজনীতির প্রেক্ষাপট বদলে যেতে পারে। কারণ, সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে রাজ্য রাজনীতি ও সামাজিক ক্ষেত্রে প্রায় নিয়ন্তার ভূমিকা নেয় যে দুটি জাত, সেই লিঙ্গায়েত ও ভোক্কালিগার উভয়েই জনসংখ্যার ৭–৮ শতাংশ মাত্র। তার থেকে অনগ্রসর শ্রেণীভুক্ত একটি জাতের মানুষের সংখ্যা ঢের বেশি। আর দলিতরাও কমবেশি ২০ শতাংশ। এই সমীক্ষা প্রকাশিত হলে অনগ্রসর–দলিতরা নিজেদের ক্ষমতায়ণের চেষ্টা শুরু করবে। লিঙ্গায়েত ও ভোক্কালিগারা রুখে দাঁড়াবে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে। সেই ঝুঁকি নিতে নারাজ সরকার। অথচ মুখ্যমন্ত্রী নিজে অনগ্রসর কোরাবা।

পৃথক ধর্মের মর্যাদা দিয়ে যত সহজে লিঙ্গায়েতদের বিজেপির থেকে সরিয়ে আনা সম্ভব, তত সহজে অনগ্রসর–দলিত ক্ষমতায়ণ সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে কোনও শর্টকাট নেই। প্রশ্ন হল, ভোটে সুবিধা হবে বলে শৈবদের একটি শাখাকে পৃথক ধর্ম হিসাবে ঘোষণা করা হবে, অথচ এত খরচ করে তৈরি করা জাত–সমীক্ষার রিপোর্ট প্রকাশ করা হবে না, এ কেমন কথা? এখন ভোটের নোটিস পড়ে গিয়েছে। কাজেই আর ওই সমীক্ষার রিপোর্ট প্রকাশ করা যাবে না। প্রশ্ন হল, লিঙ্গায়েতদের পৃথক ধর্ম বলে ঘোষণা করে না হয় ভোট পাওয়া গেল, কিন্তু তাছাড়া আর কার কী উপকার হবে? সংখ্যালঘু হওয়ার সুবাদে বড়লোক লিঙ্গায়েতদের  পরিচালিত বেসরকারি স্কুল ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান অনেক বেশি স্বাধীনতা ও টাকা পাবে। ফলে তাঁরা খুশি হবেন। তাঁদের দেখাদেখি আরও অনেক সম্প্রদায় এমন দাবি তুলতে পারে। বিজেপি এই দাবিগুলো মানতে চাইবে না, কারণ তারা চায় হিন্দু সমাজকে একত্র করতে। অর্থাৎ, দাবি মেনে নিলে কংগ্রেসের সুবিধা হবে। শুধুই ভোটের সুবিধা। কিন্তু এই কাজটা করতে গিয়ে এটাও তো স্পষ্ট হল যে কংগ্রেসও ভোটের জন্য ধর্মকেই অস্ত্র করে। তাতে কি বিজেপি–র ধর্মভিত্তিক রাজনীতিই বৈধতা পেল না?

ধর্ম নিয়ে রাজনীতি থেকে যে ফায়দা তোলা সম্ভব, জাত–সমীক্ষা প্রকাশ করে তেমন কোনও ফায়দা তোলা সম্ভব নয়। কারণ, অনগ্রসরদের জন্য সংরক্ষণ তো অনেক আগে থেকেই চালু হয়ে গিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী আগে ভেবেছিলেন, অনগ্রসর ভোট একত্র করে তিনি তাদের ক্ষমতায়ণের নেতৃত্ব দেবেন। তাতে সমাজেরও কিছু মঙ্গল হত। সংখ্যার তুলনায় অনেক বেশি প্রভাব খাটাচ্ছেন যাঁরা, তাঁদের সেই কর্তৃত্ব ধাক্কা খেত। তলার দিকের মানুষের ক্ষমতায়ণের প্রক্রিয়া জোরদার হত। কিন্তু তাতে সময় লাগবে। তার থেকে ধর্মকে ব্যবহার করে ফায়দা তোলা অনেক সহজ।

Developed by DXDasia