ঠাকুরবাড়িতে দ্বারকানাথের প্রবল প্রচারের আলোয় চাপা পড়ে গিয়েছিল প্রসন্নকুমারের বিপ্লব

হিন্দু কলেজে বাংলা শেখাবার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন প্রসন্নকুমার ঠাকুর

লকাতা শহরের বয়স তো কম হল না। সময়ের ভাঁজে ভাঁজে অন্ধকার ও আলোর গল্প লুকিয়ে আছে। কলকাতার (Kolkata) বুকে দৃপ্ত অহংকারের মতো মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল যে ঠাকুরবাড়ি, সেই বাড়ির কজন মানুষকেই বা আমরা ঠিকমতো চিনতে পেরেছি। কলকাতা জানে, সেই আমলের মেছুয়াবাজারের গোঁড়াদের অবদান কিছু কম নয়। ঠাকুরবাড়ি মানে তো শুধু রবীন্দ্রনাথ (Rabindranath Tagore) আর তাঁর পরিবার নয়। জোড়াসাঁকো ছাড়াও পাথুরিয়াঘাটার ঠাকুর বংশ তরুণী কলকাতার আমলে অনেক বিপ্লব, সমাজ সংস্কারের কাজ করে গিয়েছে। এ কলকাতার মধ্যে সত্যিই আছে আরেকটা কলকাতা। সেই আরেক কলকাতায় জন্ম নিয়েছিলেন প্রসন্নকুমার ঠাকুর (Prasanna Kumar Tagore)। হিন্দু কলেজের প্রতিষ্ঠাতা গোপীমোহন ঠাকুরের ছেলে। গোপীমোহন ঠাকুর ছিলেন ঠাকুরবাড়ির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা জয়রামের ছেলে। সেই সময়কার হিন্দুসমাজের জন্য তিনি সমাজসংস্কারমূলক কাজ করেছেন অনেক। দ্বারকানাথ ঠাকুরের প্রবল প্রচারের আলোয় চাপা পড়ে গিয়েছিল প্রসন্নকুমারের বিপুল কর্মকাণ্ড এবং বৈপ্লবিক ব্যক্তিত্ব। আজকের কথকতা হোক প্রসন্নকুমার ঠাকুরকে নিয়েই।

প্রসন্নকুমারের জন্মের আগে ভিন্ন হয়েছে পঞ্চানন ঠাকুরের পরিবার। কলকাতা শহরের অলিতে গলিতে তখন নীলমনি ঠাকুর আর দর্পনারায়ণ ঠাকুরের বিবাদের মুখরোচক গল্পের চর্চা চলছে। সেই দর্পনারায়ণের ছেলে গোপীমোহনের সন্তান প্রসন্নকুমার। তখন ১৮০১ সাল। শেরবার্ণ স্কুলে লেখাপড়া করতে গিয়ে তাঁর আলাপ হল তাঁরই জ্ঞাতিভাই রমানাথ ঠাকুরের সঙ্গে। রমানাথ ছিলেন নীলমনি ঠাকুরের বংশধর। দুই পরিবারের মধ্যে আবার সম্পর্কের সেতু তৈরি হল। দুই পরিবার আবার পারস্পরিক আদানপ্রদান শুরু করল। শেরবার্ণ স্কুলের পর প্রসন্নকুমার ভর্তি হলেন হিন্দু কলেজে (Hindu College)। ততদিনে শহরে ছড়িয়ে পড়েছে তাঁর আশ্চর্য মেধা, বহুভাষার চর্চা এবং আইন বিষয়ে তাঁর দক্ষতার কথা। বাড়িতে সাহেব শিক্ষকের কাছেও লেখাপড়ার চর্চা করতেন প্রসন্নকুমার। অঙ্কশাস্ত্র, ন্যায়শাস্ত্র এবং আইনবিধি একত্রে পড়তে শুরু করেন। তবে প্রথমেই ভাবেননি যে বিশিষ্ট আইন ব্যবসায়ী হবেন। দুটি মামলায় হেরে নিজের অর্জিত আইন জ্ঞানকে কাজে লাগিয়েছিলেন। এই প্রসঙ্গে একটি সুন্দর উক্তি করেছিলেন প্রসন্নকুমার। বলেছিলেন, “মন হচ্ছে সুগৃহিণীর মতো। নিজের ভাঁড়ারে যা থাকে সুযোগ মতো তা কাজে লাগাতে পারে।" নিজের অর্জিত সব জ্ঞানকেই কাজে লাগাতে পেরেছিলেন প্রসন্নকুমার। তিনি সরকারি আইনজীবীর কাজ করেছিলেন। ১৮৫০ সালে পারিবারিক সম্পত্তি দেখাশোনার জন্য সে কাজ তিনি ছেড়ে দিয়েছিলেন। গোপীমোহনের মৃত্যুর আগে তাঁর বিয়ে হয় একেবারে হিন্দু নিয়ম মেনে। এরপর তমলুক সল্ট এজেন্টের দেওয়ান হয়েছিলেন। কলকাতার সল্ট বোর্ডের দেওয়ান হিসেবেও নিযুক্ত হয়েছিলেন তিনি। কার টেগোর কোম্পানির কাজও করেছেন। স্বাধীনভাবে সংবাদপত্র পরিচালনা করতেন। ‘রিফর্মার’ পত্রিকায় তাঁর লেখা বেশ বৈপ্লবিক ছিল। পরে সদর দেওয়ানির উকিল হয়েছিলেন এবং অনেক অর্থ উপার্জন করেছিলেন।

প্রসন্নকুমার আধুনিক মনের মানুষ ছিলেন। সেই সময়কার গোঁড়া হিন্দুদের থেকে আলাদা। সতীদাহ প্রথার বিপক্ষে রামমোহন (Raja Rammohan Roy) এবং উইলিয়ম বেন্টিঙ্কের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। পাথুরিয়াঘাটার অন্যান্যরা কিন্তু প্রাচীন কুসংস্কার থেকে বেরোতে পারেননি। প্রসন্নকুমার হিন্দু ব্রাহ্মণ হিসেবে অহংকার বোধ করতেন। ‘পুরাতন প্রসঙ্গ’ বইতে সে অহংকারের উল্লেখ আছে। প্রসন্নকুমারের মনে দ্বন্দ্ব ছিল। একদিকে তিনি রামমোহনের মতো এক ঈশ্বরে বিশ্বাসী ছিলেন। বইপত্রও লিখেছেন অপৌত্তলিক ধর্ম নিয়ে। অন্যদিকে পারিবারিক নিয়ম অগ্রাহ্য করতে পারেননি। প্রসন্নকুমারের প্রতিষ্ঠিত গৃহদেবতার কৃষ্ণের নাম ছিল বাসুদেব। তিনি তথাকথিত ‘রিফর্মার’ ছিলেন। তবু দুর্গাপুজো, গৃহদেবতার উপাসনা, নিজের মায়ের প্রাত্যহিক ব্যবহারের খাটটিকে দেবীর আসন করে দেওয়ার মধ্যে হয়তো তাঁর দ্বিধামুক্ত স্বচ্ছ মনটি প্রকাশিত হয়েছে। তিনি শাস্ত্রে যে কথাটি মানতেন সেটি হল ‘অহং দেবো ন চা ন্যোহস্মি নিত্যমুক্তস্বভাববান’! অর্থাৎ, আমি নিত্য মুক্ত স্বভাববান পরমেশ্বর, আমি অন্য কেহ নই। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর (Debendranath Tagore) প্রসন্নকুমারের এই আচরণ মেনে নিতে পারেননি। হয়তো দুর্বলতাই ভেবেছিলেন। এত বছর পর কে ঠিক, কে ভুল তার মীমাংসা সম্ভব নয়। তবু মনে হয় দেবেন্দ্রনাথ যে পরিমাণে কঠিন ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন, প্রসন্নকুমারের এই উদারতা উপলব্ধি করা তাঁর পক্ষে সহজ ছিল না। ‘রিফর্মার’ পত্রিকায় লিখিত আকারে আরেকটি প্রতিবাদ করেছিলেন প্রসন্নকুমার। মৃত্যুপথযত্রীদের সেই সময় পুণ্য অর্জনের সংস্কারবশত তাদের গঙ্গার ধারে নিয়ে যাওয়া হত। এই অমানুষিক কষ্ট আর মৃত্যুযন্ত্রণার জন্য লড়াই করার তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন প্রসন্নকুমার। কিন্তু তাঁর নিজের আধুনিকমনস্ক দাদা চন্দ্রকুমার যখন নিজে মৃত্যুর সময় গঙ্গাযাত্রা করতে চাইলেন তখন প্রসন্নকুমার বাধা দিতে পারলেন না। প্রসন্নকুমার বুঝেছিলেন প্রকৃত শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতি কুসংস্কারমুক্ত হতে পারে না।

কলকাতার সল্ট বোর্ডের দেওয়ান হিসেবেও নিযুক্ত হয়েছিলেন তিনি। কার টেগোর কোম্পানির কাজও করেছেন। স্বাধীনভাবে সংবাদপত্র পরিচালনা করতেন। ‘রিফর্মার’ পত্রিকায় তাঁর লেখা বেশ বৈপ্লবিক ছিল।

তিনি শিক্ষাবিস্তারে মন দিলেন। কলিকাতা স্কুল সোসাইটি, হিন্দু ফ্রি স্কুল, হিন্দু বেনেভোলেন্ট ইনস্টিটিউশন ইত্যাদির সঙ্গে তাঁর যোগ ছিল। হিন্দু কলেজের অধ্যক্ষ সভার অন্যতম ছিলেন প্রসন্নকুমার। কিন্তু অধ্যক্ষ হিসেবে নিযুক্ত হয়েই তাঁকে কঠিন এক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। তা হল ডিরোজিও-র অপসারণ। প্রসন্নকুমার স্রোতের বিপরীতে হাঁটলেন না। ডিরোজিও-র অপসারণের পক্ষেই তাঁর মত গেল। এই ঘটনাটি বিতর্কিত বটে। কিন্তু প্রসন্নকুমার প্রতিষ্ঠানের পক্ষে মত দিয়েছিলেন। প্রসন্নকুমারের অগুনতি কীর্তির মধ্যে একটি হল বাংলা ভাষায় শিক্ষাপ্রসারের চেষ্টা। হিন্দু কলেজে বাংলা শেখাবার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। বাংলা ভাষায় পাঠ্যপুস্তক লেখার প্রয়োজনীয়তাও উপলব্ধি করেছিলেন। হিন্দু কলেজ প্রাঙ্গণেই শিশুদের পাঠশালা তৈরি হল। উদ্দেশ্য বাংলাভাষায় শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদান। পাঠশালা শুরুর দিনে সাধুভাষায় যে বক্তৃতা দিয়েছিলেন প্রসন্নকুমার, তার প্রশংসা সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল। তবে শেষরক্ষা হয়নি। সরকারি প্রতিবন্ধকতায় পাঠশালা বন্ধ হয়ে যায়। প্রসন্নকুমার প্রজাদরদী জমিদার ছিলেন। তাঁকে ‘রায়তের বন্ধু’ বলা হত। কাঠের পালকি করে ঘুরে বেড়াতেন। প্রজারা তাঁকে চাঁদা তুলে রুপোর পালকি দিতে গিয়েছিল। কারণ তিনি বিনয় করে নিজেকে ‘গরিব জমিদার’ বলেছিলেন। নদীর নাব্যতা বৃদ্ধির জন্য কয়েক লক্ষ টাকা ব্যয় করেছিলেন প্রসন্নকুমার।

ব্যক্তিজীবনে প্রসন্নকুমার সুখী ছিলেন। কনিষ্ঠ সন্তান বলেই মা বাবার স্নেহ একটু অধিক পেয়েছিলেন। স্ত্রী ছিলেন পরমাসুন্দরী। প্রসন্নকুমার মেয়েদের লেখাপড়া শিখিয়েছিলেন। খ্যাতি, যশ, সম্ভ্রম সব পেয়েছিলেন। তবে সন্তানশোক সহ্য করতে হয়েছিল তাঁকে। প্রিয় কন্যা সুরসুন্দরীর মৃত্যুশোক সহ্য করতে হয়েছিল। এছাড়াও আরেকটি শোক এবং পরাজয় তাঁর জন্য অপেক্ষা করেছিল। পুত্র জ্ঞানেন্দ্রমোহন স্ত্রীবিয়োগের পর ধর্মান্তরিত হয়ে যান। প্রসন্নকুমারের হিন্দুত্বের অহংকার ধুলোয় মিশে যায়। বালাসুন্দরী জ্ঞানেন্দ্রমোহনের উৎসাহে ইংরেজি শিখেছিলেন এবং প্রতিমাপূজায় অনীহা প্রকাশ করেন। বাইবেল পড়েন এবং বাইরে বেরোনোর কথাও ভেবেছিলেন। বালাসুন্দরীর অকালমৃত্যু জ্ঞানেন্দ্রমোহনকে দিশেহারা করে এবং তিনি গৃহত্যাগ করে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন। এই দুঃখ প্রসন্নকুমার আজীবন বুকে বয়ে বেরিয়েছেন। মৃত্যুর সময় জ্ঞানেন্দ্রমোহন দুই নাতিকে নাকি পাঠিয়েছিলেন। তাদের দেখে প্রসন্নকুমারের দুই চোখ জলে ভরে যায়। তবু তাদের ইঙ্গিতে চলে যেতে বলেন। প্রিয়পুত্রের সঙ্গে মৃত্যুর সময় আর তাঁর দেখা হয়নি। 

প্রসন্নকুমার দাতা ছিলেন। সমাজসংস্কার মূলক অনেক কাজ তিনি করেছিলেন। পরে প্রসন্নকুমারের মূর্তি নির্মাণ করিয়েছিলেন তাঁর ভাইপো যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর। আগে সেই মূর্তি সেনেট হলে ছিল। এখন রাখা আছে দ্বারভাঙা বিল্ডিংয়ের উত্তরদিকের একতলায়। যেন এক বিষণ্ণ দেবতা। ইতিহাস এই কর্মীপুরুষকে সেভাবে মনে রাখেনি। তবে তাঁর বাসভূমির কাছাকাছি এলাকা নাপতেহাটার নাম এখন হয়েছে প্রসন্নকুমার ঠাকুর স্ট্রিট। ঠাকুরবাড়ির গল্পের শেষ নেই। এইবাড়ির সদস্যদের জীবনও ছিল বিচিত্র। প্রসন্নকুমার তাঁর বিপুল কর্মকাণ্ডের আড়ালে আজও আছেন। শুধু সময়ের ধূলি সরিয়ে কৌতূহলী দৃষ্টির প্রয়োজন।

সহায়ক গ্রন্থঃ
ঠাকুরবাড়ির বাহিরমহল, চিত্রা দেব

Developed by DXDasia