প্রবাসী নাতনিকে বাংলা সাহিত্যের প্রতি আগ্রহী করতে প্রদীপ সেনগুপ্তর পপ-আপ বই

তাঁর এই উদ্যোগ নিয়ে তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন শুভা দাস মল্লিক

প্রদীপ সেনগুপ্ত, ছবি : শুভদীপ অধিকারী

ইয়ের পাতা ওল্টালেই একে একে দাঁড়িয়ে পড়ছে হাঁসজারু, বকচ্ছপ, হাতিমি, কিংবা কাঠবুড়ো… চোখের সামনে নড়েচড়ে উঠছে বিছাগল, কুমড়োপড়াশ, প্যাঁচা-প্যাঁচানীরা। মনে হচ্ছে, সুড়সুড়ি দিতে এক্ষুণি বইয়ের পাতা থেকে লম্বা পালক হাতে বেরিয়ে আসবে কাতুকুতু বুড়ো!!!

এই হলো পপ-আপ বইয়ের (Pop-up book) মজা। ইংরেজি ভাষায় এমন কারিকুরির বই প্রকাশ পেলেও বাংলায় চোখে পড়ে না। বাংলা ভাষায় আমাদের বিশ্বমানের সব শিশুসাহিত্য আছে। সেগুলির যদি পপ-আপ সংস্করণ হয়, এই আকালেও তো ছোটোরা নতুন করে বাংলা ভাষায় স্বপ্ন দেখতে পারে! এই জিজ্ঞাসা, এই বোধ থেকেই অসাধ্য সাধন করেছেন বছর আটাত্তরের ‘নবীন’  প্রদীপ সেনগুপ্ত। নাতনিকে বাংলা ভাষার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে নিজে হাতে বাংলা সাহিত্যের পপ-আপ সংস্করণ তৈরি করেছেন দক্ষিণ কলকাতার (আদি বাড়ি জলপাইগুড়ি) অবসরপ্রাপ্ত ভূবিজ্ঞানী। 

আবোল তাবোলের পপ-আপ সংস্করণ হাতে নিয়ে প্রদীপবাবুর নাতনি

এযাবৎকালে বাংলা সাহিত্যে পপ-আপ নিয়ে এরকম কাজ সম্ভবত আর কেউ করেননি। এই পপ-আপ বই তৈরির সফর নিয়ে ইতিমধ্যেই শুভা দাস মল্লিক-এর পরিচালনায় তৈরি হয়েছে একটি তথ্যচিত্র।

সুকুমার রায়ের অসামান্য সৃষ্টি আবোল তাবোল প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯২৩ সালে, প্রকাশের শতবর্ষ উপলক্ষ্যে ২০২৩ সালে আমেরিকা নিবাসী ছোট্ট নাতনির জন্য আবোল তাবোলের পপ-আপ সংস্করণ বানিয়ে ফেলেন প্রদীপবাবু। পপ-আপ বই হল একটি বইয়ের ত্রিমাত্রিক (3D) সংস্করণ। (দ্বিমাত্রিক বললেও অত্যুক্তি হয় না) পাতা উল্টালেই চোখের সামনে দাঁড়িয়ে পড়বে বাড়ি-ঘর, জীব-জন্তু, গাছপালা, কাহিনির চরিত্ররা। বইয়ের পৃষ্ঠায় লেখা লাইনগুলো যেন হয়ে উঠবে জীবন্ত। পাঠককে বিশেষত শিশুদের আকর্ষণ করবে। পপ-আপ করা বেশ ধৈর্যের কাজ। ছবি তৈরি করে, প্রিন্ট করে তারপর কেটে, বিশেষ ভাবে ভাঁজ করেতে হয়। কার্যত সবটাই একা হাতে করেছেন প্রদীপবাবু। 

এযাবৎকালে বাংলা সাহিত্যে পপ-আপ নিয়ে এরকম কাজ সম্ভবত আর কেউ করেননি। এই পপ-আপ বই তৈরির সফর নিয়ে ইতিমধ্যেই শুভা দাস মল্লিক-এর পরিচালনায় তৈরি হয়েছে একটি তথ্যচিত্র। ইতিমধ্যেই সেই ছবি দেখানো হয়েছে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। 

বইয়ের পপ-আপ সংস্করণ প্রসঙ্গে কথা হচ্ছিল প্রদীপবাবুর সঙ্গে। তিনি নিজে লেখালেখি করেন, লেখার সঙ্গে অলংকরণ করেন, ছবি আঁকেন। আদ্যন্ত শিল্পচর্চার সঙ্গে যুক্ত। জানালেন, প্রথম পপ-আপ বই তৈরি করেন ২০১৭ সালে। শিশু সাহিত্য সংসদ থেকে প্রকাশিত ছ’টি বাংলা ছড়াকে নিয়ে ‘ছড়ার ছবি’ নামে একটি পপ-আপ বই তৈরি করেছিলেন। শতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আবোল তাবোল বেছে নিয়েছিলেন। বিদেশি সাহিত্যে, ইংরেজি ভাষায় চল থাকলেও, বাংলা সাহিত্যে পপ-আপ বইয়ের চল একেবারেই নেই। প্রদীপবাবুর মতে, বাংলা বইয়ের প্রকাশকদের এখন পপ-আপ বইয়ের পথে হাঁটা উচিত। বিশেষত ছোটোদের জন্য। তিনি বললেন, “পপ-আপের এখন ভীষণ রকম প্রয়োজন রয়েছে। এর একটা বাজার আছে। ছোটো ছেলেমেয়েরা এখন খুব একটা বাংলা বই পড়ে না। যাঁরা সন্তানদের বাংলা শেখাতে আগ্রহী, তাঁরা পপ-আপ বইয়ের সাহায্য নিতে পারেন। এখানে চাহিদা আছে। প্রবাসী বাঙালিদের কাছেও বাংলা পপ-আপ বইয়ের চাহিদা রয়েছে। ভবিষ্যতে আরও চাহিদা তৈরি হবে। হওয়া উচিত।” 

আজকের যুগের বাচ্চারা; যারা বাংলা সাহিত্য পড়ছে না, বাংলার সাহিত্য-স্রষ্টাদের তৈরি করা কালোত্তীর্ণ চরিত্রদের সঙ্গে যাদের পরিচয়ই ঘটেনি, তাদের উৎসাহী করে তুলবে বাংলা ভাষার পপ-আপ বই, এ বিষয়ে আশাবাদী প্রদীপবাবু। বললেন, “নাতনির বাংলা ভাষা শেখার বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। সে আমেরিকায় থাকে। কিছুদিন হল ভারতে আছে। সেই জায়গা থেকে তাকে বাংলা ভাষায় আগ্রহী করে তুলতেই পপ-আপ বই বানানো। এই পপ-আপ বই, আরও কিছু বইয়ের সাহায্যে সে এখন বাংলা শিখে গেছে। বাংলা পপ-আপ বই ভাষা শিখতে কিছুটা হলেও সাহায্য করেছে ওকে।”

প্রদীপবাবু এখন সুকুমার রায়ের আরেক অনবদ্য সৃষ্টি ‘হ য ব র ল’-র পপ-আপ সংস্করণ তৈরিতে মন দিয়েছেন। এ-ও  জানালেন, এক চিত্রশিল্পী তাঁকে এ কাজে সাহায্য করছেন। বাংলা ভাষায় পপ-আপ বই তৈরির সমস্যার কথাও বললেন তিনি। তাঁর কথায়, এ জাতীয় বইয়ের প্রকাশক পাওয়া খুব কঠিন। তার চেয়েও বড়ো কথা পপ-আপ বই তৈরিতে যে পরিকাঠামো প্রয়োজন তা এখনও গড়ে ওঠেনি এখানে। বললেন, “ছবি প্রিন্ট করা এবং কাটা, এই দুটো কাজ এখানে সম্ভব। কিন্তু ‘অ্যাসেম্বেল’ করায় সমস্যা। এমন প্রশিক্ষিত মানুষ নেই, যাঁরা সেই কাজ করতে পারবেন। পৃথিবীর প্রায় সমস্ত পপ-আপ বই তৈরি হয় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। হংকং, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ইত্যাদি দেশে পপ-আপ বইয়ের ইন্ডাস্ট্রি রয়েছে। হাজার হাজার লোক কাজ করে। বাংলায় তেমনভাবে পপ-আপের ইন্ডাস্ট্রি তৈরি করা হয়তো খুব কঠিন ব্যাপার। যদি কেউ এগিয়ে এসে বিনিয়োগ করতে পারে, হবে। পপ-আপ বইয়ের একটা ভবিষ্যত আছে।” 

পাতা উল্টালেই চোখের সামনে দাঁড়িয়ে পড়বে বাড়ি-ঘর, জীব-জন্তু, গাছপালা, কাহিনির চরিত্ররা। বইয়ের পৃষ্ঠায় লেখা লাইনগুলো যেন হয়ে উঠবে জীবন্ত। পাঠককে বিশেষত শিশুদের আকর্ষণ করবে।

আবোল তাবোলের পপ-আপ সংস্করণে রামগরুড়ের ছানা

বাংলা প্রকাশনাগুলো কেন পপ-আপ বইয়ের দিকে ঝুঁকছে না?

প্রদীপবাবুর মতে, “বাংলার প্রকাশকেরা হয়তো ভরসা পাচ্ছেন না। বিক্রির ক্ষেত্রে সম্প্রতি একটা ‘মোমেনটাম’  পেয়েছে বাংলা বই। বাংলা বইয়ের বিক্রি একটা সময় ভীষণ কমে গিয়েছিল। এখন বিক্রি হচ্ছে। দামি বইও বিক্রি হচ্ছে। খুব সাধারণ মানের একটা পপ-আপ বইয়ের দাম হাজার টাকার নিচে রাখা সম্ভব নয়। একটু ভালো করতে গেলেই দাম পড়ে যাচ্ছে দেড়-দু'হাজার টাকা। এত দাম দিয়ে কিনতে পারার সামর্থ্য বাঙালির আছে? তাঁরা রেস্তোরাঁয় গিয়ে এই পরিমাণ টাকা খরচ করবে কিন্তু বই কিনবে কি? এটা নিয়ে এখনও প্রকাশকদের মধ্যে সংশয় রয়ে গেছে।” 

এ ব্যাপারে বাংলা প্রকাশকদের কী মত? 

শতাব্দী প্রাচীন প্রকাশনা সংস্থা ডিএম লাইব্রেরি পাবলিশার অ্যান্ড বুকসেলার-র অন্যতম কর্ণধার অরিত্রগোপাল মজুমদার বলছিলেন, “কেউ একটা পপ-আপ বই নিয়ে এলেই ভাবতে হবে কোথায় বাঁধাই কারবো! কেমনভাবে এই ধরনের বই বাঁধা হয়, ছবি ভাঁজ করা হয়, তা অনেকেই জানেন না। প্রশিক্ষিত, দক্ষ, অভিজ্ঞ বাঁধাইকর্মীর অভাব একটা বড়ো কারণ, তাই হয়তো প্রকাশকেরা ঝুঁকি নিতে চান না। প্রকাশকদের ইচ্ছের অভাবও রয়েছে।” 

আরও বলছিলেন, “পপ-আপ বই ছাপার কথা উঠলেই, প্রথমে শুনতে হবে রঙিন বই! অনেক খরচ।” বলাবাহুল্য, উৎপাদন খরচ বাড়লে বইয়ের দামও বাড়াতে হবে। সেক্ষেত্রে বইয়ের দাম যা দাঁড়াবে, তাতে বিক্রি হওয়া কঠিন হয়ে যাবে।” এছাড়া কিছু কিছু ক্ষেত্রে হাল আমলের বই-শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের অজ্ঞতাও বাংলায় পপ-আপ বই তৈরির অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে, এমনই মত অরিত্রর। পাশাপাশি ছোটোবেলায় পড়া পপ-আপ বইয়ের স্মৃতিও ভাগ করে নেন অরিত্র। যদিও সে’সব পপ-আপ বই ছিল ইংরেজি ভাষায় লেখা বিভিন্ন ‘ফেয়ারি টেল’। প্রসঙ্গত, অরিত্রর বাবা ডিএম লাইব্রেরি পাবলিশার অ্যান্ড বুকসেলার-র কর্ণধার আশিসগোপাল মজুমদার জানাচ্ছিলেন, শৈশবে তিনি বেশ কিছু বাংলা পপ-আপ বই পড়েছিলেন।

একটি কর্মশালায় প্রদীপবাবুর প্রশিক্ষণে নিজেদের বানানো পপ-আপ কার্ড হাতে খুদেরা 

সময়ের সঙ্গে সব কিছু পাল্টায়। সময়ের দাবি মেনে প্রেক্ষিত বিচার করে প্রাসঙ্গিক থাকাটাই মূলমন্ত্র। কে বলতে পারে, হয়তো পপ-আপ বই-ই হয়ে উঠবে শিশু সাহিত্যের ভবিষ্যৎ! প্রদীপবাবু সর্বতভাবে চেষ্টা করছেন বাংলা ভাষায় পপ-আপ বইকে জনপ্রিয় করার। পপ-আপ নিয়ে ছোটো ও বড়োদের নিয়ে কর্মশালার আয়োজনও করেছেন। জানালেন, এক প্রকাশনা আগ্রহও প্রকাশ করেছে। অদূর ভবিষ্যতে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান প্রসারের জন্য এক ‘এনজিও’-র সঙ্গে যৌথভাবে পপ-আপ বই তৈরি করবেন। আগামীতেও এই কাজ চালিয়ে করে যেতে চান।

Developed by DXDasia