সম্বল ৩০০ টাকা, এক স্কুলশিক্ষকের হাতে জন্ম নেয় পিয়ারলেস

কিংবদন্তি উদ্যোগপতি রাধাশ্যাম রায়

শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে নারায়ণগঞ্জকে বলা হয় প্রাচ্যের ড্যান্ডি। সোনালি পাটের জন্য এই শহরের খ্যাতি বিশ্বজোড়া। তখনও দেশভাগ হয়নি। নারায়ণগঞ্জের বিএম ইউনিয়ন হাইস্কুলে শিক্ষকতা করতেন রাধাশ্যাম রায়। তবে পড়ানোয় খুব একটা উৎসাহ পেতেন না। কিছু বিমা সংস্থার এজেন্টের কাজেও হাত পাকিয়েছিলেন। বিদেশি এক ইনসিওরেন্স কোম্পানিতে আবেদন করলেন চাকরির জন্য। ইন্টারভিউ হল। কিন্তু এরই মধ্যে হঠাৎ তাঁর চিন্তাভাবনা যায় বদলে। সিদ্ধান্ত নিলেন, চাকরির জীবন আর নয়। এবার শুরু করবেন ব্যবসা। 

প্রাচীন এবং মধ্যযুগে ব্যবসা-বাণিজ্যে কত সমৃদ্ধ ছিল বাঙালি, ইতিহাসে তার পরিচয় রয়েছে। ব্রিটিশ আমলে সেই ঐতিহ্য ধ্বংসের মুখে গিয়ে দাঁড়ায় বিদেশি শোষণ-লুণ্ঠন আর চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের দাপটে। কিন্তু বঙ্গসন্তানেরা হেরে যাওয়ার পাত্র নন। আমরা তাই পেয়েছি হেমেন্দ্রমোহন বসু, গৌরমোহন দত্ত, ক্ষীরোদবিহারী চক্রবর্তীর মতো উদ্যোগপতিদের। রাধাশ্যাম রায় তাঁদের মতোই কিংবদন্তি। ব্যবসার কথা যখন তিনি ভাবছিলেন, সম্বল ছিল মাত্র ৩০০ টাকা। তবুও থেমে যাননি। বুকে অদম্য সাহস নিয়ে শুরু করলেন নিজের বিমা সংস্থা। 

সেটা ১৯৩২ সাল। দ্য পিয়ারলেস ইনসিওরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের জন্ম হল। রাধাশ্যাম তখন ৩৩ বছর বয়সের যুবক। পাশে ছিলেন অভিন্নহৃদয় বন্ধু কে কে চট্টোপাধ্যায়। অনেক বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে নতুন সংস্থার সুনাম বাড়তে লাগল। রাধাশ্যাম এরই মধ্যে পিয়ারলেসের সদর দপ্তর কলকাতায় নিয়ে এলেন। সারা দেশে তাঁর ব্যবসা ডালপালা মেলল। স্বল্প সঞ্চয় সংস্থা হিসেবে মানুষের আস্থা অর্জন করল। এখন বিমার সঙ্গে হাসপাতাল, ফিনান্সিয়াল প্রোডাক্ট, হোটেল, আবাসন, পর্যটন – নানা পরিষেবা নিয়ে আমজনতার সামনে হাজির পিয়ারলেস গ্রুপ। বিপন্ন অসহায়দের পাশে দাঁড়িয়ে সবার মন জয় করে নিয়েছেন তাঁরা।

নিজের সংস্থা প্রতিষ্ঠা করার পর ২৮ বছর জীবিত ছিলেন রাধাশ্যাম রায়। তাঁর বড়ো ছেলে ভূদেবকান্তি রায় তারপর ব্যবসার হাল ধরেন। প্রতিপত্তি আরও বাড়ে। ভূদেবকান্তির ছোটো ভাই সুনীলকান্তি রায় বর্তমানে পিয়ারলেসকে নিয়ে এগিয়ে চলেছেন ভবিষ্যতের পথে। সুনীলবাবুর ছেলে জয়ন্ত এবং মেয়ে দেবশ্রীও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আরও উন্নতির লক্ষ্যে আত্মনিয়োগ করেছেন। বাঙালির গর্ব পিয়ারলেসের সুনাম ছড়িয়ে পড়ুক সারা পৃথিবীতে, এই আমাদের কামনা। 

তথ্যঋণ – তমাল বন্দ্যোপাধ্যায়, অভীক মণ্ডল। 

Developed by DXDasia