সিডনির রাজপথে কলকাতার অ্যাম্বাসাডার ট্যাক্সি

জেমস রবিনসনের উদ্যোগ

বাংলার খানদানি পরিবার এবং বণিকদের মধ্যে গাড়ির প্রতি ভালোবাসা দেখা যায় কয়েকশো বছর ধরেই। আর কলকাতার রাস্তায় এক সময় রাজত্ব করত হিন্দুস্তান অ্যাম্বাসাডার গাড়ি, যাদের ডাকা হত কিংস অফ ইন্ডিয়ান রোডস নামে। কলকাতার রসগোল্লা এবং রবীন্দ্রসংগীত যেমন জনপ্রিয়, বিশ্বের নানা প্রান্তের বাঙালিরা এই হলুদ কিংবা হলুদ-কালো গাড়ি তেমনই ভালোবাসেন। শহরের রাস্তায় এমন শত শত ট্যাক্সি চোখে পড়ত এক সময়ে।

সিডনিতে অ্যাম্বাসাডারের সঙ্গে লেখক 

ব্রিটেনের মরিস অক্সফোর্ড সিরিজ ৩-এর ওপর ভিত্তি করে হিন্দুস্তান মোটরস ১৯৫৬ সালে অ্যাম্বাসাডারের মডেল বানায়। ভারতে প্রথম তৈরি হয় ১৯৫৭ সালে। দশকের পর দশক উপমহাদেশে রাজত্ব করেছে অ্যাম্বাসাডার। প্রচুর মানুষকে ড্রাইভার হিসেবে নিয়োগ করা হয়। কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয় গাড়ি শিল্পে। ট্যাক্সি হয়ে ওঠে সহজলভ্য। ওলা-উবের ছিল না তখন। যদিও কলকাতায় সেই ১৯০৭-তে ট্যাক্সি পরিষেবা চালু হয়েছিল, ১৯৬২ নাগাদ অ্যাম্বাসাডারই হয়ে ওঠে ট্যাক্সির প্রচলিত মডেল। বিশেষ করে বিহার ও পাঞ্জাব থেকে বহু মানুষ ড্রাইভারের কাজ করতে আসতেন। ২০১৭ সালে ইতিহাস গড়ল কলকাতা, যাত্রা শুরু করলেন প্রথম মহিলা ট্যাক্সি ড্রাইভার। 

কলকাতার ট্যাক্সি ভারতের গৌরব। তাকে বিশ্বের দরবারে নতুন ঔজ্জ্বল্য নিয়ে তুলে ধরেছে জেমসের উদ্যোগ। ভারতীয় সংস্কৃতি অস্ট্রেলিয়ায় প্রাণ ফিরে পাবে কলকাতার ট্যাক্সির দৌলতে এবং আশা করি স্থায়ী হবে।

 

কলকাতার অ্যাম্বাসাডার ট্যাক্সি যেমন আরামদায়ক, তেমনি সহজেই দেখভাল করা যায়। যথেষ্ঠ মজবুতও। এখনও বর্ষাকালে জলকাদার রাস্তায় মুশকিল আসান করে অ্যাম্বাসাডার। গ্রীষ্মে জানলা খুলে মজা উপভোগ করতে ভালোবাসেন অনেকে। শীতকালেও অ্যাম্বাসাডার বেশ আরামের। এমনকি কলকাতার ঐতিহ্যের অংশ হয়ে গিয়েছে এই গাড়ি। ১৯৮১ সালের ‘৩৬ চৌরঙ্গী লেন’ ছবিতে হলুদ অ্যাম্বাসাডারের দৃশ্য নিশ্চয়ই সবার মনে আছে। অ্যাম্বাসাডার করে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের আশেপাশে ঘুরে বেড়ানোর রোমাঞ্চ কলকাতাবাসী মাত্রই অনুভব করেছেন।

 

২০১৩ সালে বিবিসি অটোমোবাইল শো টপ গিয়ার কলকাতার অ্যাম্বাসাডার ট্যাক্সিকে বিশ্বের সেরা ট্যাক্সি বলে ঘোষণা করে। তাঁদের মতে, “ভারতের প্রায় চিরস্থায়ী হিন্দুস্তান অ্যাম্বাসাডারের সঙ্গে লন্ডনের কালো ট্যাক্সির কোনো তুলনাই চলে না”। সাড়া বিশ্বের নজর কেড়েছিল এই ঘটনা। জেমস রবিনসনও কলকাতার একটি ট্যাক্সি কিনে ফেলেন। জেমসের কোম্পানি ‘ব্ল্যাক ক্যাব সেন্ট্রাল’-এর সিডনি হেরিটেজ ট্যাক্সিদের মধ্যে ‘কলকাতা ট্যাক্সি’-ও স্থান পায়।

 

জেমস চাইছেন লন্ডন, নিউ ইয়র্ক, মেক্সিকো সিটি ছাড়াও কলকাতা ট্যাক্সিও থাকবে তাঁর বাহনদের মধ্যে। লন্ডন ট্যাক্সি ইতিমধ্যেই সিডনির রাস্তায় চলা শুরু করেছে। এবার কলকাতা ট্যাক্সিও যোগ হতে চলেছে। জেমসের স্বপ্ন সফল হওয়ার মুখে। ক্যাম্পবেল টাউন, লিভারপুর এবং প্যারামাটার মতো সিডনির শহরতলি অঞ্চলের বহু মানুষের মনে কলকাতা ট্যাক্সিতে আগ্রহ তৈরি করেছেন তিনি। এইসব জায়গায় প্রচুর ভারতীর বাস। জন্মদিনের অনুষ্ঠান কিংবা শুধুমাত্র মজার জন্য কলকাতার নস্টালজিক ট্যাক্সিতে ভ্রমণের আয়োজন করতে চান জেমস। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া, মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন, এনএসডাব্লু বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে কথা বলেছেন, যাতে বিনামূল্যে ট্রিপের ব্যবস্থা করা যায়। কলকাতার ট্যাক্সি ভারতের গৌরব। তাকে বিশ্বের দরবারে নতুন ঔজ্জ্বল্য নিয়ে তুলে ধরেছে জেমসের উদ্যোগ। ভারতীয় সংস্কৃতি অস্ট্রেলিয়ায় প্রাণ ফিরে পাবে কলকাতার ট্যাক্সির দৌলতে এবং আশা করি স্থায়ী হবে। 
 

Developed by DXDasia