
৯ নম্বর গল্ফ ক্লাব রোড। রমিতা বিয়ে হয়ে এ-বাড়িতে এসেছে। কানাডা প্রবাসী দিদিকে সে চিঠি লিখছে যে শ্বশুরবাড়ির সবকিছু তার ভালো লাগে। বাপেরবাড়ির সঙ্গে হয়তো অনেক কিছু মেলে না- এখানে পুজোআচ্চা বেশি, বৃহস্পতিবার লক্ষ্মীপুজো, প্রতি পূর্ণিমায় সত্যনারায়ণ, আত্মীয়স্বজন এখানে নিয়মিত আসে, পাড়ায় একে অপরের বারান্দা-জানালা থেকে পাশের বাড়ি দেখা যায়, এ-বাড়ির মেয়েদের সারাদিন বাড়ির কাজ করেই কেটে যায়- কিন্তু রমিতার এখানে মন্দ লাগছে না। বাঙালি বাড়ির অনেক রমিতারই শ্বশুরবাড়ি ভালো লাগত (এবং লাগে) কারণ মানিয়ে নেবার দায়িত্বটা যে শ্বশুরবাড়ি এসেছে কেবল তারই! এখনও সে-ছবি বড়ো একটা বদলায়নি। এই চাপা সংগ্রামের কথাটা খুব স্বাভাবিক ভাবে অনুল্লেখিত থেকে যায়। কিন্তু দৃশ্যটা যখন আরও দীর্ঘ হয় তখন আর সেটা লুকিয়ে রাখা যায় না। ১৯৯২ সালের ২৪ জুন কলকাতার রাস্তায় একটি তথাকথিত শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটে। তাতে কলকাতায় আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। সেই ঘটনা অবলম্বন করে সুচিত্রা ভট্টাচার্য একটি উপন্যাস লিখেছিলেন এবং ঋতুপর্ণ ঘোষ সেই উপন্যাসের ওপর নির্ভর করে তৈরি করেছিলেন ‘দহন’ (১৯৯৭)। সমাজে মেয়েদের ওপর ক্রমাগত চলতে থাকা নানা সহিংসতার এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল এই ‘দহন’। বিভিন্ন বয়সের, স্তরের নারী চরিত্ররা এখানে ভিড় করে এসেছে পিতৃতান্ত্রিক সমাজে তাদের ওপর চলা নানাবিধ হেনস্থা-হিংসার ছবি ফুটিয়ে তুলতে। (আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস)
ষাটের দশক থেকেই রাষ্ট্রপুঞ্জ আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস হিসেবে পালন করে ২৫ নভেম্বর দিনটি। ঘরে, বাইরে, কর্মক্ষেত্রে আজও নারী হেনস্থা-হিংসার শিকার তো বটেই, বহু ক্ষেত্রে ধর্ষিতাও। কী সমাজ আমরা গড়ে তুললাম যে নারীর প্রতি ঘটে চলা প্রাত্যহিক হেনস্থা-হিংসার ঘটনাগুলি আমরা এখনও বন্ধ করতে পারলাম না?
রমিতার জা অর্থাৎ মমতাশঙ্কর যে-চরিত্রটিতে অভিনয় করেছেন, প্রথম থেকে দেখা যায় সে একা। স্বামী দূরে থাকে, বাড়ির কাজ- সে মেয়েকে সামলানো হোক আর অসুস্থ রমিতার সেবা- মোটামুটি সবটা তাকেই করতে হয়। এত বছর এখানে থেকেও শ্বশুরবাড়ি তার আপন হয়নি। সে এটিকে ‘এ-বাড়ি’ আর শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের ‘এ-বাড়ির লোকজন’ বলে উল্লেখ করে। এ-বাড়িতে তার কথার কোনও জোর নেই। থানা থেকে ফোন এসেছিল এটুকু খবরও রমিতাকে দিয়ে সে অপরাধবোধে ভোগে যে শ্বশুরবাড়ির লোক যদি জানতে পারে কথাটা তার মুখ থেকে বেরিয়েছে তবে অস্বস্তিকর পরিবেশের সৃষ্টি হবে। কিংবা অপরাধী রোহিত (রবিরঞ্জন মৈত্র) চরিত্রটির হবু বউ তৃণা (অদিতি চট্টোপাধ্যায়)। রোহিতকে অত্যন্ত ভালোবাসে সে। কিন্তু এঙ্গেজমেন্ট হয়ে যাবার পর যদি জানা যায় তার হবু স্বামী অন্যের বউয়ের শ্লীলতাহানি করেছে তবে সেই ছেলের সঙ্গে কি সারা জীবন থাকা যায়? তবে তৃণা চাইলেই তো আর এঙ্গেজমেন্ট ভাঙা সম্ভব নয়। তৃণার মা-বাবাই তা হতে দিতে চাইছেন না। হয়তো তৃণাকে কেউ মারছে না, বকছে না কিন্তু তার নীতিবোধকে যে সবাই মিলে অগ্রাহ্য করে বুঝিয়ে দিচ্ছে কেবল মেয়ে বলেই তার মতের কোনও মূল্য নেই, তা কি কম হিংস্রতা? এ-দুটি চরিত্র সিনেমার প্রধান দুই চরিত্র রমিতা চৌধুরী (ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত) আর শ্রবণা সরকার (ইন্দ্রাণী হালদার)-এর সঙ্গে খানিক আড়াআড়ি অবস্থানে। হয়তো গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় না প্রাথমিক ভাবে। কিন্তু প্রধান দুটি চরিত্রের ওপর ঘটে চলা হেনস্থা-হিংসার অনেকটা ভার এরা ভাগ করে নেয়। যেখানে রমিতার মা-বাবা-স্বামী কিংবা শ্রবণার মা-বাবা-ভাই আর বয়ফ্রেন্ড তাদের বুঝতে চায় না সেখানে রমিতার জা আর রোহিতের হবু বউ তৃণা দূর থেকে হলেও রমিতা আর শ্রবণার লড়াই উপলব্ধি করে। (আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস)

‘দহন’ ছবির গল্প আমাদের সকলের জানা। রমিতা চৌধুরীকে মেট্রো স্টেশনে শ্লীলতাহানির শিকার হতে হয়। সেই বৃষ্টিভেজা রাতে কেউ এগিয়ে না এলেও শ্রবণা ছুটে গিয়ে গুন্ডা ছেলেগুলোর সঙ্গে প্রায় মারপিট করে রমিতাকে বাঁচায়। রমিতার স্বামী পলাশ (অভিষেক চট্টোপাধ্যায়) তখন অচৈতন্য। কিন্তু এরপর যেসব ঘটনাগুলি ঘটে, যেভাবে রমিতা আর শ্রবণাকে নানাদিক থেকে চাপ দেওয়া হয় শ্লীলতাহানির কথা চেপে যেতে এবং কোনও সাক্ষ্য না দিতে তাতে স্পষ্ট হয় তথাকথিত শিক্ষিত মেয়েরাও পিতৃতান্ত্রিক সমাজের হেনস্থা-হিংসার কাছে কত ঠুনকো, তুচ্ছ! কোনও মূল্য নেই তাদের। তা বলে ঋতুপর্ণ কি শুধু ‘বাস্তবে যেমন হয়’ সেই কথাই তুলে ধরেছেন তাঁর শিল্পে? না, তা নয়। ঋতুপর্ণের এ-ছবি থেকে আমরা বুঝতে পারি মেয়েদের ওপর চলা সহিংসতা কত অনুচ্চকিত অথচ সাংঘাতিক ধারালো হতে পারে। যে রমিতা নতুন বউ হিসেবে সবার চোখের মণি ছিল ওই এক শ্লীলতাহানির জন্য সে হয়ে উঠল পারিবারিক লজ্জা। তাকে ঢেকে, লুকিয়ে রাখতে হয়। বিপত্তারিনির কবজ পরতে বাধ্য করা হয় রমিতাকে, শ্বশুরমশাই রাগতমুখে কথা বলেন, স্বামী ধর্ষণ করে। এত ভাবে অত্যাচারিত হবার পর রমিতার বাবা মেয়েকে বলেন ছোটখাটো বিষয় মানিয়ে নিতে! এমনকি সবাই মিলে রমিতাকে বাধ্য করে আদালতে শ্লীলতাহানির ঘটনা সম্পর্কে মিথ্যাচার করতে। অথচ রমিতা সমৃদ্ধ পরিবারের মেয়ে। (আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস)
একই রকম পরিবারের মেয়ে শ্রবণাও। সেই রাতে সে রমিতাকে বাঁচাতে ছুটে গিয়েছিল বিখ্যাত হবার জন্য নয়। অথচ সকলে তার সাহসের প্রশংসা করে। ওদিকে তার ভাই ছোটন (শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়) আর বয়ফ্রেন্ড তূণীর (সঞ্জীব দাশগুপ্ত) ক্রমাগত তাকে, তার সাহসকে ছোটো করতে থাকে। ছোটন আর তূণীর যে শ্রবণাকে দুঃখ দিতে চায়, তা নয়। এগুলো পিতৃতান্ত্রিক সমাজে তাদের বেড়ে ওঠার উত্তরাধিকার। মেয়েদের বেশি সাহস দেখাতে নেই বলে তাদের বিশ্বাস। শ্রবণার মা-ও খানিকটা সে-পথের পথিক। তিনি প্রথম প্রথম মেয়ের ছবি কাগজে ছাপা হয়েছে বলে বিগলিত হলেও এসবে মেয়ের বেশি জড়িয়ে-পড়াকে তির্যক দৃষ্টিতেই দেখতে শুরু করেন তিনি। এমনকি তূণীর পর্যন্ত তার বিদেশযাত্রার জন্য স্বার্থপরের মত শ্রবণাকে সব কিছু থেকে সরে আসতে বলে। থানাতে, আদালতে যেতে মানা করে। তবে গার্হস্থ্য হিংসার নাগপাশ কেটে বেরোবার চেষ্টা করলেও আদালতে শ্রবণার রেহাই হয় না। বিরোধীপক্ষের উকিল তার চরিত্র নিয়ে কটাক্ষ করে কারণ সেদিন রাত্রে দুজন পুরুষ সহযাত্রীর সঙ্গে সে এক অটোয় যাচ্ছিল! অপরাধীদের জামার রং চিনতে পারা নিয়ে তাকে বর্ণান্ধ বলা হয় এবং রমিতার শ্লীলতাহানির সময় তার কোনও গোপন অঙ্গে কোনও পুরুষের ছোঁয়া লেগেছে কি না তাও জিজ্ঞাসা করা হয়! (আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস)
‘দহন’ তৈরি হয়েছিল আজ থেকে ২৮ বছর আগে। সমস্ত রাষ্ট্রীয় যন্ত্র দিয়ে নারীকে ঘেরাটোপে রাখার সংস্কৃতি কি ধ্বংস হয়েছে আজও? কিন্তু উপায়ের প্রশ্নটাও তো তুলতে হবে। কী করলে এই পিতৃতন্ত্রের এই সহিংসতা থামানো যেতে পারে? একমাত্র নারীর সঙ্গে নারী জোট বাঁধলে তা সম্ভবপর।
হেনস্থা-হিংসার প্রকার ভেদ অনেক। দৈহিক আঘাতের পাশাপাশি শব্দ, বাক্য, ঘৃণা, পারস্পরিক ব্যবহার- নানা কিছু দিয়ে একজন মানুষকে অত্যাচার করা যায়। মেয়েদের ওপর এই অত্যাচার, এই সহিংসতার ঘটনা আজও অনেক বেশি ঘটে। এবং তার জন্য শিক্ষিত কিংবা অশিক্ষিত সমাজ অথবা উন্নত-অনুন্নত দেশ কোনও ব্যাপার নয়। নারীদের ওপর প্রতি মুহূর্তে সারা বিশ্বে ঘটে চলা সহিংসতার ব্যাপারে সব ধরনের রাষ্ট্র ও সমাজই প্রায় এক। সে-কারণে ষাটের দশক থেকেই রাষ্ট্রপুঞ্জ আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস (International Day for the Elimination of Violence against Women) হিসেবে পালন করে ২৫ নভেম্বর দিনটি। ঘরে, বাইরে, কর্মক্ষেত্রে আজও নারী হেনস্থা-হিংসার শিকার তো বটেই, বহু ক্ষেত্রে ধর্ষিতাও। কী সমাজ আমরা গড়ে তুললাম যে নারীর প্রতি ঘটে চলা প্রাত্যহিক হেনস্থা-হিংসার ঘটনাগুলি আমরা এখনও বন্ধ করতে পারলাম না?
বাঙালি সমাজেও দৃশ্যটা বদলায়নি। ‘দহন’ তৈরি হয়েছিল আজ থেকে ২৮ বছর আগে। সমস্ত রাষ্ট্রীয় যন্ত্র দিয়ে নারীকে ঘেরাটোপে রাখার সংস্কৃতি কি ধ্বংস হয়েছে আজও? কিন্তু উপায়ের প্রশ্নটাও তো তুলতে হবে। কী করলে এই পিতৃতন্ত্রের এই সহিংসতা থামানো যেতে পারে? একমাত্র নারীর সঙ্গে নারী জোট বাঁধলে তা সম্ভবপর। রমিতা মাঝে মাঝেই শ্রবণার বাড়িতে ফোন করত। অন্য কেউ ধরত বলে কথা বলত না। সেই ঘটনার পর রমিতা আর শ্রবণার কখনও কোনও বাক্যবিনিময় হয়নি। আদালতে দেখা হলেও তাদের একে অপরের থেকে দূরে রাখা হয়েছিল। পিতৃতন্ত্র এটাই চায়। কিন্তু একটি মেয়ের ওপর চলা কণামাত্র অত্যাচার প্রতিটি মেয়েকে ভাগ করে নিতে হবে। সহচরীরা সবাই হাতে হাতে ধরি ধরিতে অভ্যস্ত না হলে অচলায়তন ভেঙে ফেলার স্বপ্ন অধরা থেকে যাবে।
‘দহন’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত ও ইন্দ্রাণী হালদার যুগ্মভাবে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন তাও একই সিনেমার জন্য, যা জাতীয় পুরস্কারের ইতিহাসে ছিল প্রথম।
