
আমার মাস্টার মশাই স্যার সন্ধান দেন উইনস্টন চার্চিল-এর লেখা বইয়ের
সালটি ১৯৯১-৯২ হবে। আমাদের বাড়িতে রিডার্স ডাইজেস্ট নামে বই আসত। সেই বইতে আমি প্রথম দেখতে পেলাম ইংল্যান্ডের বর্তমান রানি এলিজাবেথ ও তাঁর হ্যাজবেন্ড রাজপুত্র চার্লস নাকি সবাই ছবি আঁকেন। ও লেখাটি আমার মনে একটি কৌতূহল তৈরি করে। আমার কাছে রাজা ও রাষ্ট্রনায়ক সকলেই একই স্থানে অবস্থান করে। পৃথিবীর কোন কোন দেশের ছবি আঁকিয়ে রাষ্ট্রনায়কদের আঁকাআঁকি নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করলাম। এইরককম যখন চলছে সেই সময় আমার একটি আর্ট হিস্ট্রির বই থেকে জানতে পাড়লাম যে ব্যারাক শিল্পী পিটার পল রুবেন্স তিনিও একটা অঞ্চলের দায়িত্বে ছিলেন এবং রাজন্যবর্গ ছিলেন। তখন জিনিসটা খুব ভাল লাগল। মনে মনে ঠিক করলাম এটা নিয়ে খোঁজ করব।
তার কিছু আগে থেকেই আমি আনন্দবাজারে নিয়মিত মাসে-দুমাসে কলকাতার করচা লিখি। রবীন্দ্রভারতীর ছাত্র তখন আমি। এই করতে করতে তারপর পড়াশুনা শুরু করলাম। তখন আমার বাবার এক বন্ধু ছিলেন দিল্লির আইএস অফিসার। তিনি বললেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী বিশ্বনাথ প্রতাপসিংহ ছবি আঁকেন। তিনি তাঁর আকা ছবির একটি রিভিউ পেপার কেটে পোস্ট করলেন। আমার মনে আশার আলো দেখা দিল। এইভাবে একে একে বাড়তে থাকল আমার তালিকা। ঘরে বাইরে বন্ধু ও পরিবার মহলে চলত আলোচনা।
ইতিমধ্যে মা বইমেলা থেকে বালঠাকরে-র আকা কার্টুনের ছবি উপহার দিল আমাকে। বইয়ের বেশির ভাগ কার্টুন তৈরি হয়েছে জওহরলাল নেহেরুকে নিয়ে। এরপর বাবা একদিন আমার জন্য নিয়ে এলেন ‘রাজীব বাই সোনিয়া গান্ধী’। ওই বইটিতে রাজীব গান্ধীর করা লিনোকার্ট পেলাম। এবার আমার সংগ্রহ বাড়তে থাকল। একের পর এক ছবি দেখা শুরু হল। তখন আমার মাস্টার মশাই স্যার উইনস্টন চার্চিল-এর লেখা বইয়ের সন্ধান দেন। ‘Painting as a Pastime’ এই বইটি লিখে চার্চিল নোবেল প্রাইজ পান। সেইসময় আমি আরেকটি বিষয় নিয়ে কাজ করছিলাম। বিষয়টি ছিল ‘ছবি চুরি’।
কলকাতার করচা লেখার সূত্রে মানস রায়, যিনি পরবর্তীকালে বিশ্বভারতীর অধ্যাপক হন, তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ হয়। তিনি বিষয়গুলি শুনে খুব খুশি হন, লিখতে বলেন। আমার মনে আছে, দুই বিষয়েই পরপর দু’সপ্তাহে লেখা প্রকাশ পায়। তার মধ্যে ‘রাষ্ট্রনায়কদের আঁকাআঁকি’ নিয়ে লেখাটি প্রকাশ হওয়ার আগে বিজ্ঞাপনও দেওয়া হয়। ততদিনে হিটলার, চার্চিল, বিশ্বনাথপ্রতাপ সিংহ-র ছবি যোগাড় হয়েছে। এবার করলাম কী, সমস্ত দেশের রাষ্ট্রনায়কদের চিঠি পাঠাতে শুরু করলাম।
চিঠির বিষয় ছিল – ‘আপনি ছবি আঁকেন কি না?’
আরও পড়ুন
অবন ঠাকুরের রামলীলা
তখন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী জন মেজর ওঁর সেক্রেটারি-কে চিঠিতে লিখছেন- ‘প্রধানমন্ত্রী আপনাকে ধন্যবাদ জানাতে বলেছনে। এবং বলেছেন Painting is not his matter’. চিঠিটি পাঠানো হয়েছিল ডাউন স্ট্রিট থেকে। চিঠির উত্তর পেয়ে আমার একটাই কথা মনে হয় দুটি দেশের প্রধানমন্ত্রী তাঁদের কাছে ছবি আঁকা ও সৌজন্য দু’রকম। কারণ চার্চিলের কাছে ছবি আঁকাটি বিষয় কিন্তু অন্য জনের কাছে নয়।
আরেকটি ঘটনা ঘটল। বাড়িতে বড় কাপড়ের মোড়া গোটাগোটা অক্ষরে আমার নাম লেখা একটি পার্সেল এল। পার্সেলের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একটা বই নাম ‘রয়াল আর্টিস্ট’। দিল্লির কোনও দূতাবাস থেকে বইটি পাঠিয়েছিল। ব্রিটেনের রাজপরিবারের আঁকা ছবি ও ক্রাফট ছবিও বইটির বিষয়। তথ্য সংগ্রহের জন্য আমি বিভিন্ন দেশের বিমান পরিষেবা সংস্থার কাছে চিঠি পাঠাতে শুরু করলাম। প্রতিটি দেশের বিমান সংস্থা দেশের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ম্যাগাজিন করে থাকে। আমাদের এয়ার ইন্ডিয়ার ম্যাগাজিনের নাম তখন ছিল সোয়াগত’। বর্তমানে এর নাম হয়েছে ‘শুভযাত্রা’। আশার আলো দেখা গেল। থাইবিমান কম্পানি একটি ক্যালেন্ডারের পার্সেল এল আমার বাড়িতে। থাইল্যান্ডের রাজা ভূমিবলের আঁকা ছবি দিয়ে তৈরি হয়েছে এই ক্যালেন্ডার।
এইভাবে বিভিন্ন আদান প্রদানের মাধ্যেমে আত্মপ্রকাশ পেল আমার ‘রাষ্ট্রনায়কের আঁকাআকি’ বইটি। বেশ কয়েকদিন বইটি আউট অফ প্রিন্ট ছিল। ২০১৭ বইমেলায় এই বইটি পুনঃমুদ্রণ করল ‘প্রতিক্ষণ’ প্রকাশনী। আগ্রহী পাঠকরা এই বইটি পাবেন সেইখানেই।
