
এসএসকেএম হাসপাতালে তিন জনের দেহে প্রতিস্থাপিত হল ১৩ বছর বয়সী মধুস্মিতার লিভার, কিডনি এবং কর্নিয়া
টেলিভিশন খুললেই মৃত্যু, দুর্ঘটনা, সংঘর্ষ, আত্মহত্যার খবর দেখে যাঁরা বিরক্ত হয়ে রিমোট টিপে চ্যানেল বদলে দেন, তাঁরাও নীরবে দেখেছেন এই খবর, মনে মনে কুর্নিশ জানিয়েছেন ১৩ বছরের মুধুস্মিতা বায়েন আর তার বাবা-মাকে। রবিবার রাতে ৮৬ কিলোমিটার বেগে যে অ্যাম্বুলেন্স দুর্গাপুর থেকে কলকাতায় এল, গ্রিন করিডোরের ফাঁকা রাস্তা দিয়ে, তার ভিতরে ছিল মধুস্মিতার কিডনি, লিভার, কর্নিয়া। দেশের চতুর্থ কনিষ্ঠ অঙ্গদাতা হিসেবে ১৩ বছরের মধুস্মিতার নাম বাংলার অঙ্গ প্রতিস্থাপন চিকিৎসার ইতিহাসে লেখা থাকবে। কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালে তিন জনের দেহে প্রতিস্থাপিত হবে মধুস্মিতার লিভার, কিডনি এবং কর্নিয়া।
একসময়ে স্বেচ্ছা রক্তদানকে উৎসাহ দিতে সরকার এবং বিভিন্ন সংস্থাকে বহু বছর ধরে বহু বিজ্ঞাপন দিতে হয়েছিল বহু অর্থ ব্যয় করে। মরণোত্তর অঙ্গদান কিন্তু মানুষের সমর্থন পাচ্ছে অনেক দ্রুত। পাচ্ছে আরও বোঝা গেল, যখন দেখা গেল রবিবার সন্ধ্যায় দুর্গাপুর মিশন হাসপাতাল ছেয়ে গেল মানুষে। তাঁরা সবাই এসেছিলেন মধুস্মিতার বাবা-মায়ের এই সাহসী সিদ্ধান্তকে নমস্কার জানাতে। এই একটি ক্ষেত্রে অন্তত বলা যায়, টেলিভিশন এবং সোশ্যাল নেটওয়ার্কের ভূমিকা খুবই সদর্থক। যাঁরা মিশন হাসপাতালে রবিবার এসে জড়ো হয়েছিলেন, তাঁরা প্রায় সবাই এসেছিলেন সোশ্যাল নেটওয়ার্কে বা টিভিতে খবর দেখে। আর এই কাজ সফল করতে পুলিশের ভূমিকাও বিরাট। সাড়ে সাতটার একটু পরে অঙ্গ নিয়ে দুর্গাপুর থেকে রওনা হল অ্যাম্বুলেন্স। তখন কয়েকশো পুলিশের প্রায় দশটি মোবাইল টিম বুদবুদ পর্যন্ত জাতীয় সড়কের দায়িত্বে। বিভিন্ন রাস্তার মোড় বন্ধ, যাতে অ্যাম্বুলেন্সকে কোথাও দাঁড়িয়ে পড়তে না হয়। সময় তখন মহা মূল্যবান। ফাঁকা করে রাখা বিভিন্ন টোল প্লাজার ভিআইপি লেন দিয়ে অ্যাম্বুলেন্স ছুটেছে ৮০-৯০ কিলোমিটার গতিতে। এইভাবেই হুগলি পার হয়ে ৬ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে বিদ্যাসাগর সেতু হয়ে অ্যাম্বুলেন্স এসএসকেএম-এ পৌঁছল যখন তখন সাড়ে ন’টা সবে বেজেছে। দু’ঘণ্টারও কিছুটা কম সময়ে ১৭২ কিলোমিটারের দৌড়ও এক বড় সাফল্য। যদিও আমরা কেউই খোঁজ নিয়ে জানতে পারিনি অ্যাম্বুলেন্স চালকের নাম। তাঁকেও কলকাতার কুর্নিশ।
বেশ কয়েক মাস আগে হোয়াটস অ্যাপে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল। সেখানে এক বৃদ্ধা মা এক তরুণের বুকে কান রেখে শুনছিলেন সেই তরুণের বুকে প্রতিস্থাপন করা তাঁর মৃত সন্তানের হার্টের শব্দ। চোখে জল ঝরে পড়ছিল সেই বৃদ্ধার। এইভাবেই আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের ছোঁয়ায় নিহত প্রিয় জন বেঁচে থাকছেন আজ, অন্য কোথাও, অন্য কারও শরীরে। ‘তখন কে বলে গো সেই প্রভাতে নেই আমি….’।
