
বা বা মারা যাওয়ার পরে অজস্র লোক বাড়ি এসে সান্ত্বনা দিয়ে গিয়েছিল। তখনও শীত আসেনি। সদ্য জীবনের বাঁকগুলো বুঝতে শুরু করেছি। আমার চেয়ে সাত বছরের বড়ো দিদি পরিবারে থাকা সত্ত্বেও, গুরুজনেরা আমার কাঁধে দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার নিদান দিয়েই মিলিয়ে গেলেন। বাবা যে চেয়ারে বসতেন, সেই চেয়ারে আমাকে বসিয়ে দেওয়া হল। বলা হল এবার থেকে বাবার সব দায়িত্ব তোমার। কিছু বুঝে ওঠার আগেই শীত চলে এল। ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম ‘পুরুষ’ হওয়া কত কঠিন। পুরুষ যে কতটা শক্ত হতে পারে, টের পেয়েছিলাম সেই রাতে। বাবার সারা শরীরে ঘি মাখাতে মাখাতে একবারের জন্যও বুকটা দুরুদুরু করেনি। মাথা ঘোরেনি। চোখের জল পরেনি। কিন্তু আমি তো কাঁদতে চেয়েছিলাম। কষ্টগুলোকে লঘু করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পারিনি। বাবার দেহ বাড়িতে আসতেই সবাই আমার পাশে দাঁড়িয়ে বলেছিল, ‘বাড়ির সবার দায়িত্ব এবার তোমার’। অদ্ভুত দায়িত্ব ঘিরে ধরেছিল আমাকে। একদিকে চোখের জল আটকে রেখেছি। অন্যদিকে তাঁর শেষ যাত্রার প্রস্তুতি করছি। সেইদিন বুঝেছিলাম ‘পুরুষ’ হওয়া কতটা কঠিন। (আন্তর্জাতিক পুরুষ দিবস)
বাবা মারা যাওয়ার পরেরদিন আরও অনেকে এসেছিলেন। বারবার আমাকেই সব দায়িত্ব মেপে নেওয়ার নিদান দিচ্ছিল সকলে। একবার মনে হয়েছিল জিজ্ঞাসা করি, আমার চেয়ে বড়ো দিদি আছে তো, সে নয় কেন? এটাই কি পিতৃতান্ত্রিক সমাজের কাঠামো?৷
বাবার দেহ শ্মশানে পৌঁছানোর পরে কিছুক্ষণ বোঝার চেষ্টা করছিলাম, আমি কি স্বপ্ন দেখছি? রীতি মেনে বাবার দেহ ছুঁয়ে বসেছিলাম দীর্ঘক্ষণ। বাবার দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম আজকেই কি আমার ‘পুরুষ’ হওয়ার দিন? যে পুরুষ কাঁদে না, যে কোনও পরিস্থিতিতে মাথা ঠান্ডা রাখে। পরিবারের কথা ভাবে। আমি সেই পুরুষ হয়ে উঠেছিলাম হঠাৎ। শ্মশানে পৌঁছে আমার এক বন্ধুকে বলেছিলাম দেবীকে একটা খবর দে। ওর দেশে তখন সকাল। মনে হয়েছিল একমাত্র ওর কাছেই কাঁদতে পারি আমি। কারণ আমি তো পুরুষ। পুরুষরা তো সবার সামনে কাঁদে না। কিন্তু দেবী তো আমার। ওর বুকে মাথা রেখে কাঁদলে কেউ জানতে পারবে না। কিন্তু দেবী সে সুযোগ দেয়নি। পত্রপাট আমার দাবি খারিজ করে সেই মুহূর্তে বলেছিল সাবধানে থেকো, আমার কাজ আছে। আমি ঠান্ডা মাথায় বলেছিলাম ঠিক আছে। এই ঘটনাগুলো আমাকে ‘সুপুরুষ’ করে তুলেছিল। যে মানুষ ভিতরে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেলেও কাঁদে না। ছোটোবেলায় যখন সদ্য প্রেমের মানে বুঝেছি, তখন মনে হয়েছিল মেয়েরা সেই পুরুষকেই পছন্দ করে যে বেশ শক্তিশালী। যে তার প্রেমিকার হাত ধরে রাস্তার বাঁদিকে হেঁটে যায়। তাকে বুকে আগলে রাখে। বাইকের পিছনের সিটে বসিয়ে হুশ করে ছুটে যায় দিকশূন্যপুরে। যৌনতায় যে শাসন করে, সেই তো আসল পুরুষ। কিন্তু সেই সংজ্ঞা যে ঠুনকো, সেইদিন শ্মশানে বসে বুঝতে পেরেছিলাম। আসল পুরুষ তো দায়িত্বের ভারে তৈরি হয়। সেই পুরুষের পেশি আছে কিনা, সে কালো না ফর্সা, রোগা না মোটা ইত্যাদি বিষয়গুলো অগ্রাহ্য। দিনশেষে একজন পুরুষ সবকিছু সহ্য করে হাসি মুখে বাড়ি ফেরে। সে জানতে চায় না, তার জন্য সারা বছরে কোনও বিশেষ দিন আছে কিনা! যে দিন শুধুমাত্র পুরুষদের জন্য উৎসর্গ হবে। অফিসে অফিসে সেলিব্রেট হবে। সমাজ মাধ্যমে শুভেচ্ছার বন্যা বয়ে যাবে। পুরুষরা তো পাথর হয়ে বাঁচে চিরকাল। সন্তান, কৈশোর, যুবক, প্রেমিক, বাবা কত পর্যায় পেরোতে হয় নির্বিঘ্নে। (আন্তর্জাতিক পুরুষ দিবস)
বাবা মারা যাওয়ার পরেরদিন আরও অনেকে এসেছিলেন। বারবার আমাকেই সব দায়িত্ব মেপে নেওয়ার নিদান দিচ্ছিল সকলে। একবার মনে হয়েছিল জিজ্ঞাসা করি, আমার চেয়ে বড়ো দিদি আছে তো, সে নয় কেন? এটাই কি পিতৃতান্ত্রিক সমাজের কাঠামো? কী জানি, আর জিজ্ঞাসা করা হয়নি। ব্যাগ হাতে বাজারে যেতে হয়েছে তারপর থেকে। বাড়ির মহিলারা রাতে বেরোলে তাদের পাশে থাকতে হয়েছে। বাড়ির কারুর কোনও দরকারে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়েছে। নিজের কাজ সামলে বাড়ির জন্য করতে হয়েছে। ছোটোবেলায় আমার দিদি সন্ধের পর বাইরে গেলে, বাড়ি থেকে বলা হত ছোটো ভাইকে সঙ্গে নিতে। কারণ সে পুরুষ। তাই রাতের বেলা ভয় থাকবে না। যদিও আমাকে তখন কেউ একটা ফুঁ দিয়েই উড়িয়ে দিতে পারত। তবুও ছোটো থেকেই বুঝেছিলাম পুরুষ হওয়া বেশ গর্বের বিষয়। কিন্তু যত বসন্তের পাতা ঝরেছে, তত বুঝেছি এই পুরুষ হওয়া প্রায় হিমালয় সমান কঠিন। (আন্তর্জাতিক পুরুষ দিবস)
২০২৪ সালের এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, দেশের প্রায় ১.৪% পুরুষ জীবনে অন্তত একবার যৌন হেনস্থার শিকার হয়েছেন। অন্য একটি সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে, প্রায় ১৮% বিবাহিত পুরুষ জানিয়েছেন তাঁরা দাম্পত্য জীবনে জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ক বা চাপের মুখে পড়েছেন।
‘কী করো? বছরের শেষে দুটো বিদেশ ট্যুরে যেতে পারবে তো? বহুজাতিক সংস্থার চাকরি না করলে কিন্তু আমার মেয়ে তোমাকে বিয়ে করবে না! গত ছয় মাসের ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স দেখাতে পারবে তো?’ এই প্রশ্নগুলো বিয়ের সময়ে খুব সাধারণ বিষয়। এই দেশে এক ছেলের মূল্য বিচার হয় তার উপার্জনের উপর ভিত্তি করে। উপার্জনই ঠিক করে এই সমাজে তাঁর মূল্যটা ঠিক কোথায়! তারপরেও তাকে পরীক্ষা দিতে হয় প্রতিনিয়ত। প্রতিদিন তাকে আদর্শ হওয়ার চেষ্টা করতে হয়। কখন পরিবারের জন্য, কখনও কর্মক্ষেত্রের জন্য- তাকে সবসময় মেপে চলতে হয়। কর্মক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত হেনস্থা সহ্য করে, ট্রেনের গুঁতো খেয়েও হাসি মুখে ফিরতে হয়। ফেরার জন্য ফেরা নয়, উপরন্তু পরিবারের জন্য। জীবনের জন্য। (আন্তর্জাতিক পুরুষ দিবস)
২০২৪ সালের এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, দেশের প্রায় ১.৪% পুরুষ জীবনে অন্তত একবার যৌন হেনস্থার শিকার হয়েছেন। অন্য একটি সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে, প্রায় ১৮% বিবাহিত পুরুষ জানিয়েছেন তাঁরা দাম্পত্য জীবনে জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ক বা চাপের মুখে পড়েছেন। ২১ থেকে ৪৯ বছরের বিবাহিত পুরুষদের মধ্যে প্রায় ৫২.৪% জীবনে কোনও না কোনো ধরনের হিংসার মুখোমুখি হয়েছেন, যার মধ্যে মানসিক, শারীরিক ও যৌন হেনস্থা সবই অন্তর্ভুক্ত। ভারতের আইনব্যবস্থা যেমন ‘Protection of Women from Domestic Violence Act, 2005’, সেখানে পুরুষদের সুরক্ষার বিশেষ বিধান নেই। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই পুরুষরা হেনস্থার অভিযোগ জানান না বা জানালেও তা আইনি বা প্রশাসনিকভাবে নথিবদ্ধ হয় না। সমাজে পুরুষের প্রতি ভুক্তভোগী হিসেবে সহানুভূতির ঘাটতি এবং সামাজিক লজ্জাবোধও এই নীরবতার বড়ো কারণ। তাই ভারতের প্রেক্ষাপটে পুরুষদের যৌন হেনস্থা একটি গভীর কিন্তু অদৃশ্য বাস্তবতা—যার পূর্ণাঙ্গ তথ্য ও আলোচনার প্রয়োজন আজও প্রবলভাবে অনুভূত। ভারতে POSH আইনটি মূলত নারীদের সুরক্ষার জন্য গঠিত হয়েছিল, কারণ ঐতিহাসিকভাবে কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থার প্রধান ভুক্তভোগী ছিলেন নারীরা। দীর্ঘদিন ধরে সমাজে নারীর বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা ও বৈষম্যকে একটি সাংগঠনিক সমস্যা হিসেবে দেখা হয়েছে। ১৯৯৭ সালের বিশাখা মামলার রায় ছিল এই পরিবর্তনের সূচনা। সেই রায়ের ভিত্তিতেই ২০১৩ সালে কার্যকর হয় The Sexual Harassment of Women at Workplace (Prevention, Prohibition and Redressal) Act, সংক্ষেপে POSH Act। (আন্তর্জাতিক পুরুষ দিবস)
কর্পোরেট, মিডিয়া, স্বাস্থ্যসেবা বা শিক্ষা ক্ষেত্র—সব জায়গাতেই অনেক পুরুষ আজ যৌন হেনস্থার শিকার হচ্ছেন, কিন্তু তাঁদের জন্য কোনও পৃথক বা জেন্ডার-নিউট্রাল আইন নেই। সেই নিয়ে কোনও আন্দোলন নেই, সমাজমাধ্যমে লেখালেখি নেই, হ্যাশট্যাগ নেই।
আইনটির মূল লক্ষ্য ছিল কর্মক্ষেত্রে নারীদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও সমান পরিবেশ নিশ্চিত করা। তবে এই আইনে পুরুষদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এর অন্যতম কারণ, আইন প্রণয়নের সময় সমাজে পুরুষ ভুক্তভোগীর ধারণা তেমনভাবে স্বীকৃতি পায়নি। যৌন হেনস্থা তখনও নারী নির্যাতন-এর অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল, ফলে পুরুষদের জন্য আলাদা সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে ভাবা হয়নি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি বদলেছে। কর্পোরেট, মিডিয়া, স্বাস্থ্যসেবা বা শিক্ষা ক্ষেত্র—সব জায়গাতেই অনেক পুরুষ আজ যৌন হেনস্থার শিকার হচ্ছেন, কিন্তু তাঁদের জন্য কোনও পৃথক বা জেন্ডার-নিউট্রাল আইন নেই। সেই নিয়ে কোনও আন্দোলন নেই, সমাজমাধ্যমে লেখালেখি নেই, হ্যাশট্যাগ নেই। তবুও পুরুষ মানুষ হাসিমুখে কাটিয়ে দিচ্ছে একটা জীবন। একহাতে পরিবার, অন্যহাতে উপার্জন। রোদ, ঝড়, বৃষ্টি উপেক্ষা করে সে এগিয়ে যায়। বাবার ছেড়ে যাওয়া চেয়ারে বসে পড়ে। প্রেম ভাঙলেও হাসি মুখে মেনে নিতে হয়। সমাজের কাঠামোতে উপার্জনের মাপকাঠি বাড়িয়ে তোলার লড়াই চালায় প্রতিদিন। সেই পুরুষ কাঁদতে চাইলেও পারে না। কিন্তু সকলের সামনে হাউহাউ করে কাঁদার অধিকার তো তারও আছে। ব্যথা পেলে ব্যথা প্রকাশ করার অধিকার তো তারও আছে। ঘরে পুত্রসন্তান এলে যে আনন্দ উদযাপন করা হয় , সে তো আসলে দায়িত্বের ভারে তৈরি হওয়া আগামী পুরুষের জন্য। যে তার বংশপরিচয় এগিয়ে নিয়ে যাবে। একটি পুরুষের জন্ম হলেই তার জন্য দায়িত্বের হিসেব তৈরি হয়ে যায় প্রথম দিন থেকে। পুরুষ হওয়া তো হিমালয় সমান কঠিন, পুরুষ হওয়া হিমালয় সমান গর্বের।
_______________
*মতামত লেখকের নিজস্ব
