
শেষ বয়সে রবীন্দ্রনাথ যে কয়জনের সেবা গ্রহণ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে অমিতা একজন
১৩৪৬ সালের ৩ বৈশাখ প্রবীণ রবীন্দ্রনাথ ছন্দে গাঁথা পত্র পাঠাচ্ছেন অমিতা ঠাকুরকে—
মহিষী
তোমার দুটি হাতের সেবা
জানি না মোরে পাঠালো কেবা
যখন হল বেলার অবসান —
দিবস যখন আলোক হারা
তখন এসে সন্ধ্যা তারা
দিয়েছে তারে পরশ সম্মান।
পত্রপ্রেরকের জায়গায় নিজের নাম নয়, রবি ঠাকুর লিখেছিলেন, ‘পরমবিক্রম’! আশ্চর্য হলেও সত্যি। এর অন্তরালে রয়েছে একটি নাটক। রবীন্দ্রনাথেরই লেখা ‘তপতী’। শান্তিনিকেতনে ‘তপতী’ নাটকের অভিনয় হবে। অথচ মহিষীর ভূমিকায় কারো অভিনয় মনে ধরছে না রবীন্দ্রনাথের। ঠিক হল, অভিনয় বন্ধ হয়ে যাবে। এই সময় দিনেন্দ্রনাথের মনে হল অমিতার কথা। অমিতা তখন ঠাকুর পরিবারের অজিনেন্দ্র ঠাকুরের বধূ। জোড়াসাঁকোতে থাকেন। রবীন্দ্রনাথের মনে বেশ সংশয় ছিল, অমিতা ঠাকুর তপতীর ভূমিকায় অভিনয় করতে পারবেন কীনা! বলেছিলেন, ‘ও কি পারবে? এ বেশ শক্ত মেয়ের কাজ।’ নরম সরম মেয়ে অমিতা। কিন্তু অভিনয়টা দাপুটে। তিনমাস রিহার্সালের পর রবীন্দ্রনাথ সাজলেন বিক্রমদেব আর অমিতা মহিষী তপতী। অবনীন্দ্রনাথের স্মৃতিচারণেও সে মুগ্ধতা ধরা আছে। অমিতার তপতী সেজে অগ্নিতে প্রবেশ ভুলতে পারেননি অনেকেই। রবীন্দ্রনাথও। অথচ এই স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয়কেও সমালোচনার কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছিল। নিন্দুকের দল বলেছিলেন, ‘কবি রবীন্দ্রনাথ নিজে রাজার ভূমিকা গ্রহণ করিয়া ভ্রাতুষ্পুত্রবধূকে রানি সাজাইয়া অভিনয় করিয়াছেন।’ রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে সেই সময় অন্যতম অভিযোগ ছিল, চুল দাড়িতে কলপ মাখিয়া কচি সাজিয়া তিনি কখনও কখনও কিশোরী কুমারীদের সঙ্গে অভিনয় করেন। তবে এইসব সমালোচনা ফুৎকারে উড়িয়ে দেবার ক্ষমতা ঠাকুর পরিবারের বরাবর ছিল। তাই এই নাটকের পর থেকে অমিতা ঠাকুর রবীন্দ্রনাথের থেকে পেলেন আদরের ডাক— ‘মহিষী’। রবীন্দ্রনাথ হলেন তাঁর ‘পরমবিক্রম’। আজকের কথকতার কেন্দ্রে রাখি অমিতা ঠাকুরকে।
১৯১১ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি অমিতা ঠাকুরের জন্ম। তাঁর মা লাবণ্যলেখা প্রথম জীবনে ছিলেন বাল্যবিধবা। রবি ঠাকুরের উদ্যোগে লাবণ্যলেখার পুনর্বিবাহ হয় শান্তিনিকেতনের অজিতকুমার চক্রবর্তীর সঙ্গে। তাঁদের মেয়ে অমিতা রবি ঠাকুরের পরম স্নেহের। শিশু অমিতাকে নিয়েই লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, ‘লাবণ্যের মেয়েটি বেশ সুন্দর দেখতে হয়েছে। বেচারা অসুখে ভুগছে কিন্তু তবু তার প্রফুল্লতার অবসান নেই। তাকে নিয়ে আমার দাড়ি সামলানোর শেষ নেই। এমনি বাৎসল্য প্রতিবাৎসল্যে আদানপ্রদান তাঁদের মধ্যে চলে আসছে অমিতার শৈশব থেকেই। আশৈশব শান্তিনিকেতনে, রবীন্দ্রনাথের স্নেহের ছায়ায় সমৃদ্ধ হয়েছিলেন অমিতা। দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে গানের তালিম নিয়েছিলেন। অভিনয় শিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের থেকে। এই মেয়েটি মাত্র ষোলো বছর বয়সে ঠাকুর পরিবারের অংশ হলেন। রবীন্দ্রনাথের বড়োদাদা দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পৌত্র অজীনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে অমিতার বিয়ে হয়। পরম আদরের দুটি মানুষের বিয়েতে রবীন্দ্রনাথ গান লিখেছিলেন— ‘এসো এসো আমার ঘরে এসো’, ‘অনন্তের বাণী তুমি’ ইত্যাদি।
শান্তিনিকেতনের সাংস্কৃতিক আবহাওয়ায় বড়ো হওয়ার কারণে অমিতা অনেক নাটকেই অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু খুব অন্তর্মুখী স্বভাবের কারণে প্রত্যেক অভিনয়ের আগেই সংকোচ এসে ভর করত তাঁর উপর। একবার এই প্রসঙ্গে নন্দিতা কৃপালনিকে লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ— ‘বহু কষ্টে অমিতাকে সুদর্শনার পালায় নামাতে পেরেছি। শেষ পর্যন্তটিকলে হয়।’ ‘নটীর পূজা’-য় মালতির ভূমিকায় অমিতা ছিলেন মোটামুটি স্বচ্ছন্দ। তাঁর মনোহর রূপটিও সকলের নজর কেড়ে নিত। আকন্দ ফুলের মালা জড়ানো চুড়ো করে বাঁধা বেণী, গলায় কুঁচ ফুলের মালা পরা মেয়েটি যখন কান্নায় ভেঙে পড়ত, তখন দর্শক সমব্যথী না হয়ে পারত না। তাদের কানে বাজত অমিতার সংলাপ — ‘যার ডাকে আমার ভাই গেল চলে,যার ডাকে—’, দর্শক অশ্রুসিক্ত হতেন। ‘তপতী’ অভিনয়ও অনেককেই মুগ্ধ করেছিল। অমর্ত্য সেনের মা এই অভিনয় প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘দেশে বিদেশে বহু প্রসিদ্ধ অভিনয় দেখেছি, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের তপতীর মতো অভিনয় আর কোথাও দেখিনি।’
অসাধারণ গান করতেন অমিতা। অথচ একটি মাত্র রেকর্ড — ‘তোমার মোহন রূপে কে রয় ভুলে’! সেটিই সম্পদ হয়ে রয়েছে। অমিতার লেখার হাতটিও ছিল চমৎকার। রবীন্দ্রনাথের কাছের মানুষ হয়েও তাঁকে লেখা দেখাতে অমিতার বড়ো সংকোচ। তবু মা লাবণ্যপ্রভার কথায় রবি ঠাকুরকে লেখা দেখিয়েছিলেন অমিতা। তাঁর কবিতার সহজিয়া ভাষা ছুঁয়ে গিয়েছিল রবীন্দ্রনাথকে। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের উৎসাহে ভরাট হয়ে ওঠে অমিতার কবিতার খাতা। শব্দের টুকরোগুলি যেন সহজ বাঁশির সুর তুলে ছড়িয়ে পড়ত ভুবনডাঙার আশেপাশে —
যবে শুধায় সকলে মোরে, তুমি কি পেয়েছ
কই দেখালে না আজি?
মৌন নতমুখে থাকি, কী দেব উত্তর —
কী পেয়েছি আমি?
অন্তহীন পাওয়া সে যে ঋতুতে ঋতুতে
বর্ণে গানে বিচিত্রিতা মাঝে,
শূন্য পাত্র পূর্ণ করি রাখে সে সদাই
তাই মোর দুঃখ কিছুই নাই।
অমিতার প্রবন্ধও ছিল অন্যরকম সুন্দর। রবীন্দ্রনাথের অভিনয় বিষয়ে অনেক কথা জানা যায় অমিতার প্রবন্ধ পড়ে। তাঁর প্রবন্ধ থেকেই জানা যায় রবি ঠাকুর অভিনয়ের সময় বিভিন্ন কণ্ঠে কথা বলতে পারতেন। যেখানে যেমন দরকার। আবার সহ অভিনেতাদের কণ্ঠস্বরের উপরও খুব গুরুত্ব দিতেন রবীন্দ্রনাথ। মাইক ছিল না তখন। তাই গলার জোরে শেষ সারিতে বসে থাকা দর্শকের কাছে পৌঁছে যাওয়ার তাগিদ ছিল অভিনেতার। রবীন্দ্রনাথও প্রবীন বয়সে কণ্ঠে সেই দাপটটাই রাখতেন।
অমিতা রবীন্দ্রনাথের পছন্দের মানুষ ছিলেন। শেষ বয়সে প্রতিমা দেবী ছাড়া আর যে কয়জনের সেবা গ্রহণ করেছিলেন, তাদের মধ্যে অমিতা একজন। রোগশয্যায় কবির সেবা তো করেছিলেন, সেই সঙ্গে অসুস্থ রবীন্দ্রনাথের মুখের স্বাদ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন পাঁঠার মাংসের হালকা ঝোল রেঁধে। এরপর রবীন্দ্রনাথ খানিক সুস্থ হয়ে কালিম্পং গেলেন আর মুক্তকণ্ঠে সকলকে বলতেন, নাতবউয়ের মতো রান্না খুব কমজনেই পারেন। এরপর আবার অসুস্থ হওয়ায় কালিম্পং থেকে কলকাতা জোড়াসাঁকোতে নিয়ে আসা হয়েছিল রবীন্দ্রনাথকে। এই সময় টানা দুমাস যাঁরা তাঁর সেবা করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে অমিতা অন্যতম। কবির মনের মতো সেবকও ছিলেন অমিতা। কোমল স্পর্শ, ইঙ্গিতেই সব বুঝে নেওয়ার ক্ষমতা, কল্পনাপ্রবণতা, হাতের কাজের দক্ষতা এবং কবির রহস্যালাপের সমঝদার — এই সব নিয়ে অমিতা রবীন্দ্রনাথকে যত্ন করে করেছিলেন। ‘রোগশয্যায়’ বইয়ের উৎসর্গপত্রে দুটি নারীর উল্লেখ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ—
রোগের সৌভাগ্য নিয়ে তাঁর আবির্ভাব
দেখেছিনু যে দুটি নারীর
স্নিগ্ধ নিরাময় রূপে
রেখে গেনু তাদের উদ্দেশে
অপটু লেখনির প্রথম শিথিল ছন্দমালা।
এই শব্দের স্নেহ পেয়েছিলেন যে দুটি নারী তাঁদের একজন নন্দিতা কৃপালনি আর অন্যজন অমিতা ঠাকুর।
অমিতা ঠাকুরের লেখা ‘ঠাকুরবাড়ির রান্না’ এবং ‘বাইশে শ্রাবণ’ বইদুটি আজও বিখ্যাত। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিলিট উপাধি পেয়েছিলেন এই বিদূষী নারী, ঠাকুরবাড়ির একটি অন্তর্মুখী রত্ন।
সহায়ক বইঃ
ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল, চিত্রা দেব
