একবার দুর্গাপুজোর ছুটি কাটাতে শিবরাম গেলেন বিভূতিভুষণের ঘাটশিলার বাড়ি, তারপর…

আধ্যাত্মিকতা, পরলোকচর্চা, পুনর্জন্ম নিয়ে অনেক কথা হয়েছিল শিবরাম-বিভূতি’র

নিজেকে অতি ক্ষুদ্র করে দেখানোর যে সহজাত প্রচেষ্টা শিবরামের ছিল, তার পাশেই তিনি এ-ও লিখে রাখছেন যে, “আমার জীবন আমার যত কাহিনির মধ্যেই বিধৃত, বিবৃত। তার মধ্যেই তারা ধরা পড়েছে, ধরা রয়েছে। খুঁজে পেতে সমঝে নিতে হবে।” কিংবদন্তিতুল্য বিনয় তাঁকে যেন অনেক বেশি কাছের মানুষ করে তুলেছিল। বিনয়ের মধ্যেই তিনি খেলা করেছেন শব্দ নিয়ে, তৈরি করেছেন হেঁয়ালির খাসমহল, সৃষ্টি করেছেন অভিনব কৌতুক। কিন্তু সেই বিনয় কখনোই স্পষ্টবাদিতা থেকে সরে গিয়ে নয়। নিজেকে বরাবর ক্ষুদ্র প্রতিপন্ন করতে চাওয়া, কিন্তু পরক্ষণেই তাঁর গভীর বিষয়-ভাবনা চমকিত করে পাঠক-শ্রোতাকে। সেরকমই একটি ঘটনা…

একবার দুর্গাপুজোর সময় শিবরাম গেলেন বিভূতিভুষণের ঘাটশিলার বাড়ি। পুজোর ছুটি ওখানেই কাটাবেন এমন ইচ্ছে।

গিয়ে দেখেন বেশ স্বাস্থ্যবান একটি বাচ্চাকে কোলে নিয়ে বিভূতিভুষণ বাগানে ঘুরছেন। শিবরাম বুঝলেন, শিশুটি বিভূতিরই। জিজ্ঞসা করলেন, ‘‘তা আপনার ঘাড়ে কি সেই ফেরবার টিকিট?’’

‘‘একদম ঠিক ধরেছ। ওর নাম দিয়েছি কাজল। ওর মাধ্যমেই তো আবার আমাকে ফিরতে হবে।’’

বিভূতিভুষণের সেই পারলৌকিক বিশ্বাস যে কতটা তীব্র ছিল, বারেবারে টের পেয়েছেন শিবরাম নিজে। মৃত্যুর কিছু দিন আগে এক শ্মশানে নিজের মৃতদেহকে নাকি নিজের চোখে দেখতে পেয়েছিলেন বিভূতিভুষণ। সে-ঘটনাও জানতেন শিবরাম। আর মৃত্যুর পর? সে এক অদ্ভুত ব্যাপার!একদিন রিপন কলেজের বেশ কিছু ছেলে এসে শিবরামকে জানালেন, ‘‘আমরা এই বছর বিভূতিভূষণের জন্মদিন পালন করব, আপনাকে সভাপতি হতে হবে।’’

‘‘বেশ হব। কিন্তু অতিথি সৎকারের ব্যবস্থা থাকবে তো? মানে একটু ভাল মন্দ।’’

‘‘হ্যাঁ হ্যাঁ অবশ্যই। স্বয়ং বিভূতিবাবুও আসবেন ওইদিন।’’

‘‘মানে? উনি আবার কী করে আসবেন? উনি তো পরপারে।’’ শিবরাম অবাক!

‘‘আজ্ঞে উনি আমাদের ত্রিকোণ চক্রে মাঝেমাঝেই আসেন। আমরা প্ল্যানচেট করে ডেকে আনি তাঁকে। কথাবার্তাও হয়।’’

‘‘বলো কি! তা জীবিত আর কাকে কাকে ডাকছ ওইদিন?’’

ছেলেরা বলল, ‘‘ভেবেছিলাম অনেককেই ডাকব, কিন্তু শেষ প্ল্যানচেটে বিভূতিবাবুই বললেন যাকেই ডাকো, কেউই আসবেন না।’’

‘‘তার মানে পরলোকে গিয়ে উনি তাঁর লেখকবন্ধুদের ভালোমতই চিনেছেন। বেশ বেশ।’’

‘‘সেইজন্যই আমরা আপনার কাছে এলাম। আপনি অন্তত যাবেন আশা করি।’’

‘‘হ্যাঁ যাব বইকী। খাবার দাবারের ব্যবস্থা রাখবে বলছ যখন!’’

কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওইদিন সেখানে গিয়েও যাননি শিবরাম। বাড়ির দরজা পর্যন্ত পৌঁছে ফিরে এসেছিলেন। এই বিষয়ে শিবরামের যুক্তি ছিল, বিভূতিবাবু যখন ভেবেই নিয়েছেন তাঁর জন্মদিনে কোনও বন্ধু আসবেন না, তখন তাঁর সেই বিশ্বাসে আঘাত করা ঠিক নয়। আর দ্বিতীয়ত সেই যে পঞ্চাশ টাকা ধার রয়ে গিয়েছিল সেটা এখন যদি তার অনুগত ভক্তদের মধ্যে বলে ফেলেন, সে ভারী লজ্জার ব্যাপার হবে। তাই বিদেহী বিভূতিবাবুর সঙ্গে দেখা করার চেয়ে স্বদেহে ফিরে আসাটাই ঢের ভাল বলে মনে করলেন শিবরাম!

শিবরামের রস-বৈচিত্র্যের প্রতি এই শ্রদ্ধা-আনত বিস্ময়টি প্রকাশ করেছিলেন স্বয়ং সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, যিনি কিনা তরুণ বয়সে শিবরামের ‘আকাশ দেখতে রাস্তায় চিৎপাত হয়ে শুয়ে থাকার’ অকৃত্রিম বাউণ্ডুলেপনার সাক্ষী থেকেছিলেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কথার প্রসঙ্গ ধরেই বলতে হয়, শিবরামের লেখনীর এই যে বৈচিত্র্য, তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের পরিসরেও তো সেই বৈচিত্র্যের অভাব কিছু নেই। সমালোচকরা বলেন, এই বৈচিত্র্যময় জীবন সত্ত্বেও সেই জীবনকে পাঠকের কাছে আত্মপ্রচারের ঢঙে তুলে ধরার চেষ্টা করেননি। ‘বিধাতার চেয়ে বড়ো’ কবিতায় লিখে গিয়েছিলেন- “এই সাধ জাগে মোর সব স্বপ্ন ছেয়ে-/ আমি বড়ো হই, যদি তুমি বড়ো হও মোর চেয়ে।” সর্বদাই অন্যকে নিজের চেয়ে বড়ো ভাবতে চাওয়ার আকাঙ্ক্ষা যেন বড়ো স্বাভাবিক ছিল শিবরামের পক্ষে।

তথ্যসূত্রঃ

বঙ্গদর্শন আর্কাইভ

আনন্দবাজার পত্রিকা

 

 

Developed by DXDasia