
মুর্শিদাবাদ, কৃষ্ণনগর পড়ে গেল পাকিস্তানের ভাগে। আর চন্দননগর তো ফরাসিদের…
লালমুখো ইংরেজদের হাত থেকে স্বাধীন হল দেশ। শুধু স্বাধীনই না, ভাগও হল একইসঙ্গে। দুই বাংলার মাঝখান দিয়েই উঠল কাঁটাতার। এপার-ওপার আলাদা। একই ভাষা, একই জাতি—কিন্তু হয়ে গেল আলাদা দেশ। সাতপুরুষের ভিটে-মাটি ফেলে দলে দলে মানুষ তখনও চিনতে না-শেখা বর্ডার পেরিয়ে চলে আসলেন এপার বাংলায়। তবে, দেশভাগের এই রক্তাক্ত ইতিহাস ছাড়াও আরও বিচিত্র ইতিহাস ছড়িয়ে আছে এই বাংলাতেই। স্বাধীনতার সঙ্গে লেপ্টে থাকা ইতিহাস। একই বঙ্গদেশের সবটা একইসঙ্গে স্বাধীন হয়নি। আবার স্বাধীনতার কিছুদিনের মধ্যেই কোনও অঞ্চলের মানুষদের নাগরিকত্ব বদলেছে ফের। মানচিত্র বদলেছে। ভঙ্গ বঙ্গদেশ সত্যিই রঙ্গে ভরা।

যেমন মুর্শিদাবাদ। পলাশির যুদ্ধ, কোম্পানির শাসনের শুরুয়াত সবই নবাবি বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদের মাটিতে। র্যাডক্লিফের মানচিত্রে এই মুর্শিদাবাদ কিন্তু প্রথমে ছিল না ভারতের ভাগে। ১৯৪৭-এর ১৫ আগস্ট, ভাগ-বাঁটোয়ারায় মুর্শিদাবাদ পড়ল পূর্ব পাকিস্তানে। আর, অধুনা বাংলাদেশের খুলনা পড়ল এপারের ভাগে। ১৫ আগস্ট, সকালে সদর বহরমপুরের ব্যারাকস্কোয়ার মাঠে উত্তোলিত হল পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা। পতাকা তুললেন মুর্শিদাবাদের তৎকালীন আইসিএস অফিসার আই আর খান। মঞ্চে তখন উপস্থিত কংগ্রেস নেতা শ্যামাপদ ভট্টাচার্য, মুসলিম লিগ নেতা কাজেম আলি মির্জা, আরএসপি নেতা নিতাই গুপ্ত প্রমুখ। খুব সানন্দ উপস্থিতি নয় অবশ্য সবার। পরিস্থিতি যথেষ্ট অস্থির। মুর্শিদাবাদের কংগ্রেসি ও বাম নেতারা খুবই অস্বস্তিতে। কী করা উচিত বোঝাই যাচ্ছে না। কিন্তু, পতাকা উত্তোলনের সময় থাকতেই হয় মঞ্চে।
আরো পড়ুন
এপার-ওপার, মধ্যিখানে সাতটি দশক
একইদিনে হাজারদুয়ারিতেও উড়ল পাকিস্তানের পতাকা। মুর্শিদাবাদের নানা জায়গায় পাকিস্তানের পতাকা হাতে মিছিলও বেরোল। কিন্তু জেলার অধিকাংশ অঞ্চলেই তখন থমথমে পরিস্থিতি। এই দেশ-বিভাজনকে মেনে নিতে পারেননি অনেকেই। এই ভাগাভাগির বিরুদ্ধে তৎপরতা শুরু হয়। মুর্শিদাবাদের নবাবদের শেষ বংশধর ওয়াসেফ আলি মির্জাও মুর্শিদাবাদকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করার দাবি তোলেন। এই ওয়াসেফ আলি মির্জাই বছর দশেক আগে তৈরি করেছিলেন হিন্দু মুসলিম ইউনিটি আসোসিয়েশন। দিল্লিতেও তখন মুর্শিদাবাদকে ভারতে যুক্ত করা নিয়ে তৎপরতা চরমে। সুরাহার পথ খুঁজতে প্রস্তাব এল, দুই দেশের মাঝে যত বেশি সম্ভব নদী-বর্ডার রাখা হোক। এক্ষেত্রেও পদ্মাই হোক সীমানা। তাছাড়া, মুর্শিদাবাদের অন্তর্ভুক্ত পদ্মা পাকিস্তানের আওতায় চলে গেলে কলকাতা বন্দর সংকটে পড়বে। তিন দিন তীব্র টানাপোড়েন ও উত্তেজনার মধ্যে দিয়ে চলল মুর্শিদাবাদ নিয়ে বাদ-বিবাদ। শেষপর্যন্ত সিদ্ধান্ত হল, মুর্শিদাবাদ ভারতেই থাকবে। খুলনা যাবে পাকিস্তানে। স্বাধীনতার তিন দিনের মধ্যে ফের বদলালো বাংলা সহ দুই দেশের মানচিত্র। ১৮ আগস্ট সরকারিভাবে মুর্শিদাবাদ অন্তর্ভুক্ত হল ভারতের।
আরও পড়ুন
এক লালমুখো বাঙালি পাদ্রীর গপ্পো
একবার পাকিস্তান, ফের ভারত। মুর্শিদাবাদের মানুষদের মনের অবস্থা যে তখন মোটেই সুখকর না, তা বলাই বাহুল্য। ফের কী হবে, বুঝতে পারছেন না অনেকেই। যাঁরা পাকিস্তানের পতাকা হাতে মিছিল করেছিলেন, মুর্শিদাবাদের পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্তির পক্ষে ছিলেন– তাঁরা হতবাক। তাঁদের দোষ দেওয়াও যায় না। কারণ, গোটা দেশেই তখন এই বিভাজনের অস্থিরতা। উল্টোদিকে যাঁরা ভারতে থাকার পক্ষপাতী—নিশ্চিন্ত হতে পারছেন না তাঁরাও। বড় বেশি অনিশ্চয়তার বিনিময়ে যে স্বাধীনতা আসছে, তাকে বিশ্বাস করতে পারছেন না তখনও। এই অবিশ্বাস, টানাপোড়েন, চাপা অস্থিরতার মধ্যেই ১৮ আগস্ট সেই ব্যারাক স্কোয়ার মাঠেই উড়ল ভারতের পতাকা। ফের সেই পতাকা তুললেন জেলাশাসক আই আর খান। মঞ্চে গান গাইলেন প্রখ্যাত গণসঙ্গীত শিল্পী সুধীন সেন। জেলার পরিস্থিতি তখনও থমথমে। দেশভাগের ক্ষত মুছে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে সময় লেগেছিল বেশ কিছুদিন।

একই ইতিহাস কৃষ্ণনগর, রানাঘাট সহ অধুনা নদীয়া জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলেরও। স্বাধীনতার পরের তিন দিন এই অঞ্চলের মানুষদের ঠাঁই হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানে। ১৮ আগস্ট ফের ঠিকানা বদল থুড়ি রাষ্ট্রবদল। কৃষ্ণনগর বা রানাঘাটের মানুষদের কাছে ১৮ আগস্টের এই দিন ‘ভারতভুক্তি দিবস’। স্বাধীনতা দিবসের অনিশ্চয়তা কাটিয়ে নিশ্চিন্ত হওয়ার দাওয়াই।
স্বাধীনতা পাওয়ার পরেও এপার-ওপার মিলিয়ে একাধিক জেলার মানুষের নাগরিকত্ব মাত্র তিন দিনের মধ্যে বদলাল ২ বার। এখনকার কোনও পাঠক এই ইতিহাসের ভিতরে খুঁজে পাবেন টানটান রোমাঞ্চের গন্ধ। কিন্তু, সেই রোমাঞ্চের আড়ালেই যে ট্রাজেডি মিশে, ইতিহাসের বালি সরিয়ে সেই নোনাজলের খোঁজ আর করব না আমরা? দেশের সংজ্ঞাটাই গুলিয়ে যায় না বারবার ‘দেশ’ বদলালে? মানচিত্র বদলালে? পদ্মার ওপারে যে গ্রামে জ্ঞাতিদের বাড়িতে ডাক পড়ত কোজাগরীর দিন, সেখানে চাইলেই আর যাওয়া যায় না। ওটা অন্য দেশ। কোমলগান্ধারের সেই দৃশ্য মনে পড়ে? লালগোলার পদ্মার ওপারে বাংলাদেশ। কতগুলো ছিন্নমূল মানুষ তোলপাড় করে খুঁজছে ফেলে আসা দেশ, শিকড়। হয়ত ওপার থেকেও কেউ কেউ সজল চোখে দেখছে তাদের। আরও একদল ভিটেহীন। সীমানা তাদেরও শিকড় কেটেছে।

যাহোক, এই লেখায় দেশভাগের সে ইতিহাস আর না টানাই ভালো। কথা হচ্ছিল একই বঙ্গদেশের একাধিক স্বাধীনতার গল্প নিয়ে। মুর্শিদাবাদ ছাড়াও এই ইতিহাস আর একটি অঞ্চলেরও আছে। সেও গঙ্গারই পাশে একটি খুদে অঞ্চল। জেলা মোটেও নয়। চন্দননগর। ফরাসি উপনিবেশ চন্দনগর ছিল ব্রিটিশ-বাংলার মধ্যে একটুকরো ফ্রান্স। শোনা যায়, অনেক স্বদেশি, বিপ্লবীরা নাকি ব্রিটিশদের হাত থেকে বাঁচতে গঙ্গা পেরিয়ে পালিয়ে যেতেন চন্দননগরে। ভারত ব্রিটিশদের হাত থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার পর ফরাসিরাও বুঝে যায়, তাদের উপনিবেশও টিকবে না। ১৯৪৮-এর জুনে ফরাসি সরকার চন্দননগরে একটি গণভোট আয়োজন করে। সেখানে ৯৭% মানুষ স্বাধীন ভারতে অন্তর্ভুক্তির পক্ষে রায় দেন। ‘স্বাধীনতার’ প্রক্রিয়া শুরু হয় ১৯৫০ থেকে। ১৯৫৫ সালের ২ অক্টোবর চন্দননগর পশ্চিমবঙ্গের অংশ হয়। ফরাসি উপনিবেশের তকমা মুছে স্বাধীন চন্দননগর তখন স্বাধীন ভারতের অংশ।
বঙ্গদেশের ইতিহাস এমনই। ভারতের নির্ণায়ক পরাধীনতার সূত্রপাত যে বাংলার মাটি থেকে, সেই বাংলাই স্বাধীনতাকে পরম বিস্ময়ে আবিষ্কার করেছে বারবার। পাঞ্জাব ছাড়া স্বাধীনতার এত মূল্যও চোকায়নি আর কেউ। শরণার্থী, উদ্বাস্তু, অনুপ্রবেশকারীর তকমা দেগে দেওয়ার কাঁটাও চিরকালীন সমস্যা হয়ে উঠেছে এই ভূখণ্ডের। এরই পাশাপাশি স্বাধীনতার উদ্বেল মুহূর্তকে চেটেপুটেও নিয়েছে সে। বাংলার ইতিহাস এমনই। ভঙ্গের মধ্যেই রঙ্গে ভরা। আগেই বলছিলাম যে…
