পালিয়ে ট্রেনে উঠতেই দেশ-ছাড়া চিরতরে

লুকিয়ে ট্রেনে উঠেছি। বৌদি দাদাকে বলল, "ও আমাগো লগে যাউক।"

তখন দুই বাংলা সদ্য ভাগ হয়েছে।

দাদা কলকাতায় থাকত। সেখানেই চাকরি করত। সেবার বিয়ে করতে এল দেশে। দু’দিন খুব ধুমধাম। তারপর দাদা বউ রেখে আবার কলকাতা ফিরে গেল। কলকাতায় দাদার স্থায়ী বাসা নেই। ইতি-উতি মাথা গোঁজে। একা মানুষ, পরিযায়ী পাখি। এখন বউ নিয়ে কলকাতা গেলে থাকবে কোথায়! ঠিক হল সেখানে আগে একটা ঘর ভাড়া করবে দাদা, তারপর এসে বউ নিয়ে যাবে।

আমার বয়স তখন কতই বা? চার কিংবা পাঁচ।

কয়েক মাস পরেই দাদা ফের এল। কলকাতায় বাসা বাড়ি ঠিক হয়ে গেছে। দাদা এবার বউকে নিয়ে যাবে। ঠিক হল, ছোটদিকেও দাদা-বৌদির সঙ্গে কলকাতা পাঠিয়ে দেওয়া হবে। ওখানে ছোটদিকে কোনও একটা ইস্কুলে ভর্তি করে দেবে দাদা। এখানে থাকলে লেখাপড়া কিছু হওয়ার নয়।

‘এখানে’ বলতে অধুনা বাংলাদেশের চাঁদপুরের কাছে একটা বেহদ্দ গ্রাম। দুই বাংলার মাঝখান দিয়ে হঠাৎ কাঁটাতার গজিয়েছে। সেই কাঁটাতার ডিঙিয়ে এপারের মানুষ পোঁটলাপুঁটলি নিয়ে ওপারে চলেও যাচ্ছে। দলে দলে লোক। তখনও পাসপোর্ট নেই। ট্রেন ধরলেই হল। সাধে কি দেশ বদলায় মানুষ! সে গল্প অবশ্য আমার নয়। ঠিক হল দিদিকে কলকাতায় পড়তে পাঠানো হবে।

চাপটা মা’র দিক থেকেই ছিল বেশি। মা-ই আমাকে ও ছোটদিকে পড়াতে বসত। সেই মা-ই দাদাকে বলল, “আমার যা বিদ্যার দৌড়, তা দিয়া ওগোরে আমি বেশি দিন পড়াইতে পারুম না। তোরা ওদের দুজনের একজনরে লইয়া যা।”

ছোটদি আমার চেয়ে বছর তিনেকের বড়। তবে, আমাদের সম্পর্কটা ছিল একেবারে পিঠোপিঠি। ছোটদির আমাকে ফেলে দাদা-বৌদির সঙ্গে একদম যাওয়ার ইচ্ছে নেই। মাকে ছোটদি বলল, “ওরেও আমাদের লগে পাঠাইয়া দেও না মা! অরঅ’তো লেখাপড়া শিখার দরকার।”

আমারও যে লেখাপড়া শেখার দরকার, মা খুব ভালো করেই বোঝে। কিন্তু দাদার কম আয়ের একখানা মাত্র ভাড়া ঘরের সংসারে বেশি বোঝা মা চাপাতে চান না। তাছাড়া, বৌদির বয়সও খুব কম। দু’ দুজনকে একসঙ্গে সামালাবে কী করে? মা তাই ছোটদিকে বোঝায়—“দুই এক বছর যাউক, ও আরেকটু বড় হউক। তারপর নয় অরে কইলকাত্তা পাঠানোর বন্দোবস্ত করা যাইবো। এখন তুই একলাই যা।”

ছোটদির মন আমাকে একা ফেলে চলে যেতে কিছুতেই সায় দেয় না। আর আমি তো স্পষ্ট ঘোষণা করে দিয়েছি—আমি ছোটদিরে ছাইড়্যা একদিনও থাকতে পারুম না। হয় আমারেও পাঠাইয়্যা দাও দাদা-বৌদির লগে। নতুবা ছোটদিরও যাইয়্যা কাম নাই।

বাবা, মা, দাদা কেউ আমাকে পাত্তা দেয় না। খালি বৌদি বললে– “দেন না ওরে আমাদের লগে পাঠাইয়্যা। আমি ঠিক সামলাইতে পারুম।” বাবা ধমকে ওঠেন—“তুমি থামো তো বৌমা। লাই দিলে কুত্তা গাছে ওঠে। তুমি আর অ’রে লাই দিও না।”

বাবা বদরাগী মানুষ। তাঁর ওপরে কথা বলার উপায় নেই। অতঃপর বোঁচকাবুচকি বাঁধা শুরু হল।

আমাদের বাড়ির পশ্চিম দিক দিয়ে চলে গেছে রেললাইন। ঘর থেকে রেলগাড়ির যাতায়াত দেখা যায়। স্টেশনটা মাইল খানেক দূরে। দাদা-বৌদি-ছোটদিকে স্টেশন পর্যন্ত পৌঁছে দেবে মকবুল চাচা। আমাদের গ্রামের পিছনের দিকে মুসলমান পাড়ায় থাকে। ওঁর কচি পোলাটার একবার কী একটা জ্বরে যায় যায় অবস্থা হয়েছিল। বাবা কবিরাজ মানুষ। তাঁর ওষুধে পোলাটা প্রাণ ফিরে পাওয়ায় বাবার ওপর মকবুল চাচার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। আমাদের বাড়ির যে কোনও দরকারে চাচা হাজির।

যাওয়ার দিক সকাল থেকে বাড়িতে ভীষণ ব্যস্ততা। বৌদির নতুন সংসার সাজিয়ে তুলতে যা যা প্রয়োজন, সব যাচ্ছে কিনা—তা নিয়ে তুলকালাম চলছে। ছোটদিও তার বইপত্র, জামাকাপড় গোছগাছ করছে। আমার খোঁজখবর কেউ নিচ্ছে না। শুধু ছোটদি এক ফাঁকে আমার পিঠে হাত বুলাইয়া বলে—“কান্দিস না। কান্দিস না। পরের বার দাদা তরে ঠিক লইয়্যা যাইব।”

ছোটদির আহ্লাদে আমার কান্না আরও বেড়ে যায়। বাবা সেই কান্না শুনে গর্জন করে বলে ওঠে—“এক চোবারে গালের সবকটা দাঁত ফালাইয়্যা দিমু তোর। বাইর-অ এইখান থিকা।” আমি ধমক খেয়ে চোখের জল মুছি দু’হাত দিয়ে। ঘর থেকে বেরিয়ে আমাদের ঘরের পিছনের বুড়ো পেয়ারা গাছটার ডালে উঠে বসে থাকি।

‘দুগ্গা দু্গ্গা’ বলে দাদা বৌদিকে যখন আশীর্বাদ করছে মা, তখনও আমার খোঁজ কেউ নেয় না। বোঁচকাবুচকি নিয়ে মকবুল চাচা আগে আগে হাঁটে। তারপর দাদা-বৌদি। ঘোমটা সরিয়ে বৌদি একবার পিছনে মা-বাবার দিকে তাকায়। মা হাত নাড়ে।

পিছনের মাঠ দিয়ে আমি তখন ভোঁ দৌড়…

ট্রেন এসে আমাদের স্টেশনে দু-চার মিনিট দাঁড়ায়। দাদা টিকিট কেটে আনে। মকবুল চাচা ও দাদা মিলে হাতে হাতে কামরায় মালপত্র তোলে। আমি যে কখন গাড়িতে উঠে গেছি কারও নজরে পড়েনি। প্রথমে দেখে মকবুল চাচা। ভূত দেখার মতো চমকে উঠে বলে—“তুই কোনআন থিকা আইলি?”

দাদা তো রেগে কাঁই। এই মারে তো সেই মারে। চিৎকার করে বলে, “মকবুল, অরে কান ধইর‍্যা, নামাইয়্যা দে।”

আমি ততক্ষণে নতুন বৌদির আঁচলের তলায়। বৌদি দাদাকে বলে, “ও যাউক। যাউক আমাগো লগে কইলকাত্তা। তুমি মকবুল ভাইয়ে দিয়া তাড়াতাড়ি একখান টিকিট কাইট্যা আনো।”

দাদার হাত থেকে টাকা নিয়ে মকবুল চাচা টিকিট কাউন্টারের দিকে দৌড়ায়। দাদা চেঁচিয়ে বলে, “হাফ টিকিট কাটিস কিন্তু।”

আমি তখন ছোটদির দিকে তাকিয়ে খিলখিল করে হাসছি। “একা যাইবি নাকি! এত্ত সাহস! হুঁ।”

Developed by DXDasia